১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সরকারী হাসপাতালে ভর্তি হয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে অনেক রোগী ॥ শুধু নামেই বিনামূল্যে চিকিৎসা

  • দালালদের মাধ্যমে অর্থ লুট ও সীমাহীন হয়রানি

নিখিল মানখিন ॥ বিনামূল্যের চিকিৎসায় ফি দিতে হয় সরকারী হাসপাতালে। জরুরী বিভাগ থেকে রোগীশয্যা পর্যন্ত পৌঁছার চিকিৎসা ব্যয় (ট্রলিম্যান ও শয্যা যোগানদাতা) লিখিত থাকে না। শয্যায় ওঠার পর চলে পরীক্ষা নিরীক্ষার খেলা। প্রকৃতপক্ষে পরীক্ষা নিরীক্ষার ক্ষেত্রে কোন ফি নেই। ইউজার ফি আদায়ের নামে এখানে রোগীদের ফি প্রদানে বাধ্য করা হয়েছে। অনেক পরীক্ষা বাইরে গিয়ে করাতে হয়। উচ্চ মূল্যের ওষুধ এবং চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশনে লেখা কোম্পানির ওষুধ সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে পাওয়া না গেলেই রোগীদের বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হয়। শুধু চিকিৎসককে এবং রোগীর খাবারের ক্ষেত্রে কোন টাকা দিতে হয় না। তবে চুক্তিবদ্ধ বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষার জন্য রোগী পাঠিয়ে সরকারী হাসপাতালে ফ্রি রোগী দেখার টাকা উঠিয়ে নেন অনেক চিকিৎসক। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পরীক্ষা নিরীক্ষা করাতে নিয়ে যেতে ট্রলিম্যানদের টাকা দিতে হয়। অধিকাংশ রোগীর ক্ষেত্রেই ফ্রি বেড বলে কিছু নেই। টাকা ও তদ্বির না হলে ফ্রি বেড পাওয়া যায় না। সার্জারি ও আইসিইউ রোগী হলে তো খরচের শেষ নেই। এভাবে পদে পদে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ খরচ মেটাতে গিয়ে সরকারী ফ্রি চিকিৎসা যেন সাধারণ মানুষের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সরকারী স্বাস্থ্যসেবার একটি বড় অংশই জনগণকে বহন করতে হচ্ছে। আর দালালদের মাধ্যমে অর্থ লুট ও সীমাহীন হয়রানি সরকারী হাসপাতালের স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরকার ৯৫ শতাংশ ব্যয় বহন করে থাকে ॥ স্বাস্থ্য অধিদফতর জানায়, সরকারী হাসপাতালে চিকিৎসার ক্ষেত্রে ৯৫ শতাংশ ব্যয় সরকার বহন করে থাকে। সরকারী হাসপাতালে ৭০ শতাংশ বেড বিনামূল্যের এবং ৩০ শতাংশ বেডের জন্য সামান্য ভাড়া নির্ধারিত আছে। এছাড়া রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে রোগীকে স্বল্প পরিমাণ ইউজার ফি বহন করতে হয়। ভাড়ায় বেডে থেকে এবং ইউজার ফি প্রদানের মাধ্যমে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা নিলেও কোন রোগীর মোট খরচের ১৫ শতাংশের বেশি ব্যয় হওয়ার কথা নয়।

সরকারী হাসপাতালে একজন রোগীর আউটডোরে চিকিৎসা নিতে খরচ হয় ১০ টাকা আর ভর্তি হতে ১৫ টাকা। ভর্তির পর থাকা খাওয়া ও চিকিৎসার সব ব্যয় সরকারই বহন করে থাকে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) অধ্যাপক মোঃ ডাঃ সামিউল ইসলাম সাদি জনকণ্ঠকে জানান, দেশের স্বাস্থ্য সেক্টরের অবকাঠামো বিভাগীয় পর্যায় থেকে গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত। কেন্দ্র থেকে নাড়া দিলে স্বল্প সময়েই সারাদেশের স্বাস্থ্য সেক্টরের চিত্র পাওয়া সম্ভব। ইউনিয়ন পর্যায়ে ৩১টি হাসপাতালে মোট ৪৯০টি রোগী শয্যা রয়েছে। এ পর্যায়ে বিনা টাকায় নরমাল ডেলিভারি, মেডিসিন এবং সার্জারির সাধারণ সেবাসমূহ প্রদান করা হয়। উপজেলা পর্যায়ের ৪৬৫টি হাসপাতালে মোট রোগীশয্যার সংখ্যা প্রায় ১৮ হাজার ৩০১টি। এ পর্যায়ে বিনা টাকায় মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি ও প্রসূতিসেবা এবং বেসিক অর্থোপেডিক, চোখ, নাক-কান-গলা ও হৃদরোগের সেবার ব্যবস্থা রয়েছে। এ ছাড়া ১৩২টি উপজেলা হাসপাতালে ২৪/৭ সমন্বিত প্রসূতিসেবা এবং সকল হাসপাতালে নবজাতক ও অপুষ্টিজনিত চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হয়। জেলা পর্যায়ের ৬৪টি হাসপাতালে মোট রোগীশয্যার সংখ্যা ১০ হাজার ৩০০টি। এ পর্যায়ে বিনা টাকায় মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি ও প্রসূতিসেবা এবং অর্থোপেডিক, চোখ, নাক-কান-গলা, হৃদরোগসেবা প্রদান করা হয়। বর্তমানে দেশে ২০টি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল চালু রয়েছে। বাকিগুলো নির্মাণাধীন। পর্যায়ে মোট রোগীশয্যার সংখ্যা ১২ হাজার ৫৭৩টি। এখানে সব বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা, সিসিইউ ও আইসিইউ সেবার ব্যবস্থা রয়েছে। ১৫টি বিশেষায়িত হাসপাতালে রোগীশয্যার সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৮৮৪টি। এসব হাসপাতালে সকল বিশেষায়িত সেবা প্রদান করা হয়। যক্ষ্মা ও ফুসফুসের রোগের চিকিৎসা দিতে সারাদেশের ১৩ হাসপাতালে রয়েছে প্রায় ৮১৬টি রোগীশয্যা এবং সংক্রামক ব্যাধি, কুষ্ঠ ও অন্যান্য রোগের জন্য ১৪টি হাসপাতালে ৬১৫টি রোগীশয্যা রয়েছে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করতে সারাদেশে রয়েছে ১২ হাজার ৫৮৪টি কমিউনিটি ক্লিনিক, ১ হাজার ২৭৫টি ইউনিয়ন সাব সেন্টার এবং রয়েছে ৮৭টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র। দেশের সব মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, সব বিশেষায়িত হাসপাতাল এবং ৭টি জেলা হাসপাতালে মোট ২০৯টি আইসিইউ বেড রয়েছে। সকল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতাল, বিশেষায়িত হাসপাতালসমূহ এবং ১২টি জেলা হাসপাতালে সিসিইউ চিকিৎসা সুবিধা রয়েছে। ক্যান্সার রোগীর সুচিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে সব মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউটে। সকল হাসপাতালে ওষুধ ও অন্যান্য সামগ্রী বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়। এই মুহূর্তে কোন ঘাটতি নেই। জীবনরক্ষাকারী সব প্রকারের ওষুধ সরকারীভাবে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। বিভিন্ন সরকারী হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রসমূহের ওষুধের চাহিদা এবং সেই অনুযায়ী ওষুধের সরবরাহ ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতর বরাবর ওষুধের তালিকা ও বাজেট পেশ করেন সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রসমূহের কর্মকর্তারা। তারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ক্রয় পদ্ধতি অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় ওষুধসমূহ ক্রয় করে থাকেন। জীবন রক্ষাকারী কোন ওষুধ যাতে বাদ না পড়ে সেদিকে বিশেষ নজর রাখা হয়। কোন চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে কত প্রকারের ওষুধ লাগবে তা মূলত সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার পরিধির ওপর নির্ভর করে। সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের প্রয়োজন ও আবেদন অনুযায়ী ওষুধ সরবরাহে কোন ঘাটতি নেই বলে জানান অধ্যাপক মোঃ ডাঃ সামিউল ইসলাম সাদি।

সরেজমিন ॥ সরেজমিন ঘুরে আরও দেখা গেছে, শুধু বেসরকারী নয়, সরকারী হাসপাতালেও চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন রোগীরা। অথচ সরকারী হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার অধিকার দেশের প্রতিটি নাগরিকের। সরকারী হাসপাতালে কিছু ওষুধ, বেড ও অপারেশন বিনামূল্যে পাওয়া গেলেও দামী ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা সবকিছুতেই অনেক টাকা খরচ করতে হচ্ছে রোগীদের। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় গরিব মানুষ। বিনা পয়সায় রোগ সারানোর আশায় সরকারী হাসপাতালে এসে তারা ভর্তি হওয়ার পর নিরুপায় হয়ে সহায় সম্বল পর্যন্ত বিক্রি করছেন। জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালে হার্টের সমস্যা নিয়ে ভর্তি হন রাজধানীর রামপুরা বনশ্রীর দরিদ্র ইউসুফ আলী (৫১)। পরীক্ষা নিরীক্ষার পর তিনটি রিং বসানোর পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার লাখ টাকা খরচ হবে বলে তারা রোগীর লোকজনকে জানিয়ে দেন। পরীক্ষা নিরীক্ষা ও ওষুধের পেছনে সাতদিনে তার চিকিৎসা খরচ ১৫ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়। রিং বসানোর টাকা না থাকায় শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা অসমাপ্ত রেখে হাসপাতাল ত্যাগ করেন ইউসুফ আলী। তিনি জনকণ্ঠকে জানান, রিং বসানোর খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, হাসপাতালে ফ্রি রিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে পরিচালকের বিশেষ অনুমতি লাগে।

সব রোগীর কপালে জোটে না। টাকা ও তদ্বির লাগে। তিনি আরও জানান, একেকজন রোগীর হার্টের রিং বসাতে কিংবা ওপেন হার্ট সার্জারিতে ব্যয় হয় ৫০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত। এর আগে এনজিওগ্রাম পরীক্ষায় খরচ হয় ৫ হাজার টাকা। এর মধ্যে ওষুধ ৩ হাজার এবং পরীক্ষা ফি ২ হাজার টাকা। পরীক্ষা ফি মওকুফের সুযোগ থাকলেও দেখানো হয় অনেক নিয়মকানুন। ফলে বিরক্ত হয়ে বেশিরভাগ রোগীই ফ্রি রিংয়ের জন্য আবেদন করেন না বলে জানান ইউসুফ আলী। ব্রেস্ট ক্যান্সারে আক্রান্ত সাজেদা বেগম (৪৫) ভর্তি হন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। দশদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর কেমো ও রেডিও থেরাপির প্যাকেজ নিয়ে হাসপাতাল ত্যাগ করেন তিনি। এই দু’ধরনের থেরাপির পেছনে তার কাছ থেকে নেয়া হয় প্রায় এক লাখ টাকা। শেষ পর্যন্ত তিনি মারা যান। সড়ক দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হয়ে একই হাসপাতালে ভর্তি হন ময়মনসিংহের ভালুকা থানার মল্লিকবাড়ী গ্রামের ইসমাইল হোসেন (৩৮)। বিশদিন হাসপাতালে থাকার পর হাসপাতাল থেকে যখন ছাড়া পেলেন, তত দিনে তার পরিবারের খরচের পরিমাণ দেড় লাখ টাকা। অথচ এখানে ফ্রি চিকিৎসা পাওয়ার কথা তার। কিন্তু বাস্তব ঘটনা হলো হাসপাতালের চিকিৎসার টাকা যোগান দিতে গিয়ে আক্ষরিক অর্থেই জমিজমা বিক্রি করতে হলো রোগীর পরিবারকে। রাজধানীর মিটফোর্ড হাসপাতালে স্ত্রীরোগ বিভাগে ভর্তি এক রোগিণীর জরায়ুর অস্ত্রোপচার প্রয়োজন ছিল। ওষুধ এবং বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ মিলিয়ে খরচ হলো আট হাজার টাকা। একই হাসপাতালে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত এক তরুণকে ৫টি আইভি স্যালাইন দিতে হয়েছিল। তিনটি স্যালাইন দেয়ার পরে হাসপাতাল-কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিলেন, স্যালাইন বাইরে থেকে কিনতে হবে। শুধু স্যালাইন নয়, কিনতে হয়েছিল জরুরী কিছু ওষুধপত্রও। মোঃ বুলবুল (৩৪) এর দুটি ভাল্বই নষ্ট। রাজধানীর শেরেবাংলা নগর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। অপারেশনের জন্য ভাল্ব ও অক্সিজেনেটর যন্ত্র ওই হাসপাতালে বরাদ্দ থাকলেও ২৫ হাজার টাকায় কিনতে হয় তাকে। এগুলো ছাড়াও ওষুধ কিনতে লাগে আরও ৩০ হাজার টাকা। পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ তো হিসাবের বাইরে রয়ে গেছে। সব মিলিয়ে তার প্রায় ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়। জীবন বাঁচাতে মাসে শতকরা ২০ টাকা সুদে টাকা নিয়ে এখন অসহায় হয়ে পড়েছেন দরিদ্র মোঃ বাবুল।

সরকারী হাসপাতালে কেবল হৃদরোগই নয়, ক্যান্সার, কিডনি, লিভারসহ অধিকাংশ রোগের চিকিৎসার পেছনেই বেশ অর্থ ব্যয় করতে হয়। পরীক্ষা ফিও বেশি। একটি সিটিস্ক্যান ও এমআরআই করাতে লাগে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা। হতদরিদ্র রোগীদের বিনামূল্যে পরীক্ষাগুলোর সুযোগ থাকলেও অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। যত গরিব রোগীই হোক না কেন, ওই পরীক্ষাগুলো করাতে ভর্তি হতে হয়। এরপর রেডিওলজি বিভাগে পরীক্ষার সিরিয়াল পেতে অপেক্ষা করতে হয় ১৫ থেকে ২০ দিন। সরকারী হাসপাতালে ক্যান্সার চিকিৎসারও ব্যয় অনেক। এ খরচ বহন দুঃসাধ্য হওয়ায় বিনা চিকিৎসাতেই মারা যান গরিব ও দুস্থরা। অবশ্য কেউ কেউ ধার-কর্জ করে চিকিৎসা করান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন জামিলা খাতুন তাদেরই একজন। তার স্বামী শানচালক। দা-বঁটি ধার করে সংসার চালান। স্ত্রীর ক্যান্সার চিকিৎসায় ৪০ হাজার টাকা ধার করেছেন। চোয়ালের ক্যান্সাার সারাতে ২১ দিন পর পর ছয়টি কেমোথেরাপি দিতে হবে। সব ওষুধই বাইরের ফার্মেসি থেকে কিনতে হয়েছে।

ইউজার ফি এর নামে টাকা আদায় ॥ চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে প্রায় এক দশক পর্যন্ত দেশে স্বাস্থ্যসেবা ছিল বিনামূল্যে। কিন্তু আশির দশকে তৎকালীন সামরিক শাসক সরকারী হাসপাতালে ইউজার ফি নির্ধারণ করে। ফলে তখন থেকেই ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা পেতে সাধারণ মানুষকে পকেট থেকে ব্যয় করতে হতো। দিন দিন বাড়তে থাকে ইউজার ফি বা আউট অব পকেট। এর আরেকটা কারণ দুর্নীতি। এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সরকারী হাসপাতালে নামমাত্র খরচে চিকিৎসাসেবা পাওয়া যায় দাবি করেন অধ্যাপক মোঃ ডাঃ সামিউল ইসলাম সাদি তিনি জানান, অপারেশন, সিসিইউ, আইসিসিইউ ও ডায়ালাইসিস সেবার ক্ষেত্রে কোন টাকা নেয়া যাবে না। তবে বেশ কিছু পরীক্ষা করাতে স্বল্প ফি নেয়া হয়। এক্ষেত্রেও সরকারী ফি বেসরকারী হাসপাতালের ফি’র তুলনায় অনেক কম। সরকারী হাসপাতালে করোনারি এনজিওগ্রামে ২ হাজার টাকা, সিটিস্ক্যানে ২ হাজার টাকা, এমআরআই ৩ হাজার টাকা, ইসিজি ৮০ টাকা, ইকোকার্ডিওগ্রাম ২০০ টাকা, এক্স-রে ২০০ টাকা, আল্ট্রাসনোগ্রাম ৩০০ টাকা, কার্ডিয়াকক্যাথ ২ হাজার টাকা, ইউরিন ৩০ টাকা এবং রক্তের হিমোগ্লোবিন, টোটাল কাউন্ট করাতে লাগে মাত্র ১০০ টাকা। নিয়মের বাইরে গিয়ে অর্থ আদায় করা হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান অধ্যাপক মোঃ ডাঃ সামিউল ইসলাম সাদি। এভাবে ইউজার ফি’র নামে অর্থ আদায় অব্যাহত রয়েছে, যা আইনগত সিদ্ধ বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের কর্মকর্তারা।

বাংলাদেশ স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের সদস্য এবং বিএমএর সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডাঃ আবদুল মতিন বলেন, স্বাস্থ্য খাতে জনসাধারণকে যে বিপুল ব্যয় করতে হয় তার প্রধান কারণ দুর্নীতি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ন্যূনতম চিকিৎসা ব্যয় ১২ ডলার নির্ধারণ করলেও এদেশে জন প্রতি চিকিৎসা ব্যয় করা হয় ৭ ডলার। আর এই ন্যূনতম বরাদ্দের প্রধান অংশটা ব্যয় হয় স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেছনে এবং অবকাঠামো উন্নয়নে। এ ছাড়া ওষুধ ক্রয় থেকে শুরু করে যন্ত্রপাতি বা চিকিৎসা আনুষঙ্গিক সব পর্যায়েই বড় ধরনের দুর্নীতি হয়ে থাকে। ফলে চিকিৎসার ব্যয়ভার রোগীকেই বহন করতে হয়। দুর্নীতি বন্ধ করতে না পারলে এবং প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ ছাড়া এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়

চিকিৎসা ব্যয় জরিপ ॥ আন্তর্জাতিক উদরাময় রোগ গবেষণা কেন্দ্র- আইসিডিডিআরবি, হেলথ ইকোনমিকস এ্যান্ড ফাইন্যান্সিং রিসার্চ গ্রুপের সমন্বয়কারী ড. জাহাঙ্গীর এ এম খান জানান, সম্প্রতি বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা, বাংলাদেশ সরকার ও শ্রীলঙ্কার একটি সংস্থার সমন্বয়ে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে বিভিন্ন কারণে নিঃস্ব হয়ে পড়া মানুষের প্রায় ২০ শতাংশ চিকিৎসা খরচ যোগান দিতে গিয়ে নিঃস্ব হয়েছে। বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে সর্বশেষ এক গবেষণা অনুসারে দেশের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ৪ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে। চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে দেশের সীমিত আয়ের মানুষ। আয়ের তুলনায় অনেকগুণ বেশি বেড়েছে চিকিৎসা ব্যয়। এই ব্যয়ের শতকরা ৬২ ভাগ নিজেদেরই বহন করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষদের। জটিল রোগের চিকিৎসা করাতে গিয়ে মধ্যবিত্তরা দরিদ্র এবং দরিদ্ররা হয়ে যাচ্ছে নিঃস্ব। অনেক ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য সমস্যা যেন দরিদ্রদের নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এ কারণেই দরিদ্র অনেক মানুষ অকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। আইসিডিডিআরবির গবেষক ড. জাহাঙ্গীর এ এম খান জানান, রাষ্ট্র বা সরকারের ওপর দেশের নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দায় থাকলেও বাস্তবে নাগরিকদের চিকিৎসার পেছনে সরকারের খরচ থাকে মাত্র ২৬ শতাংশ। এ ছাড়া ৮ শতাংশ আসে দাতাদের কাছ থেকে, মাত্র ১ শতাংশ করে দেয়া হয় প্রাইভেট ও এনজিও খাত থেকে। পাশাপাশি পাইলট আকারে শুরু হওয়া বীমা থেকে এ খাতে সুবিধার হার এখনও ১ শতাংশের নিচে। তবে কমিউনিটি স্বাস্থ্য বীমা এ ক্ষেত্রে কার্যকর একটি পদক্ষেপ হয়ে উঠতে পারে, যাতে করে মানুষ নিজের সাধ্যমতো আয় থেকে একটি নির্দিষ্ট হারে টাকা চিকিৎসার জন্য অংশীদার ভিত্তিতে জমা রাখতে পারে।

বাংলাদেশ সরকারের ২০১০ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিটি গরিব পরিবারে চিকিৎসা খরচের ৬৯ শতাংশ আসে আয় থেকে, ২১ শতাংশ আসে জমানো টাকা থেকে, ৪ শতাংশ আসে জমিজমা বিক্রি করে, ১১ শতাংশ চলে ধারদেনা করে, ৭ শতাংশ চলে মানুষের কাছ থেকে সাহায্য বা চাঁদা নিয়ে, ৩ শতাংশ আসে অন্যান্য প্রক্রিয়ায়।