২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নিরাপত্তা বাড়ানোয় কূটনীতিকদের স্বস্তি

তৌহিদুর রহমান ॥ ইতালি ও জাপানের দুই নাগরিক হত্যার পরিপ্রেক্ষিতে বিদেশী কূটনীতিকদের মধ্যে আগে নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও এখন আর তা নেই। সরকার থেকে বিভিন্ন স্তরে নিরাপত্তা বাড়ানোর পরে এখন তারা স্বস্তিবোধ করছেন। ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতরাও এই স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ভারত ও মালয়েশিয়ার কূটনীতিকরা জানিয়েছেন নিরাপত্তা নিয়ে তাদের এখন কোন শঙ্কা নেই। এদিকে বিভিন্ন দেশের ভ্রমণ সতর্কবার্তা দেয়ার পরেও বাংলাদেশে বিদেশী নাগরিকদের ভ্রমণে কোন প্রভাব পড়েনি।

ইতালি ও জাপানের দুই নাগরিককে হত্যার পরে ঢাকার বিদেশী কূটনীতিকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়। তাদের উদ্বেগ নিরসনে সরকার থেকে দুই দফায় বিদেশী কূটনীতিকদের ডেকে ব্রিফ করা হয়। সে সময় বিদেশী কূটনীতিকরা নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ করে। কূটনীতিকদের অনুরোধে সাড়া দিয়ে সরকার থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করায় এখন তারা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।

বিদেশী কূটনীতিকদের নিরাপত্তা নিয়ে তৎপর থাকার কারণে বাংলাদেশের প্রশাসন বিশেষ করে পুলিশ বাহিনীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত স্টিফেন্স মার্শা ব্লুম বার্নিকাট। তিনি বুধবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে গত দুই সপ্তাহের হুমকির মুখেও বিদেশীদের নিরাপদ রাখার জন্য বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীকে ধন্যবাদ জানান। এদিকে বাংলাদেশে কোন ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা উড়িয়ে দিয়েছেন রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার নিকোলায়েভ। বিদেশী দুই নাগরিক হত্যাকে একটি সাধারণ সন্ত্রাসী ঘটনা হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে তিনি বলেছেন, দু’ফোঁটা পানিকে কোনভাবেই বৃষ্টি বলা ঠিক নয়। দুই বিদেশী হত্যাকা-ে রাশিয়াও উদ্বিগ্ন। তবে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন শান্ত ও সুন্দর পরিবেশ বিরাজ করছে বলেও মনে করেন রাষ্ট্রদূত।

দুই বিদেশী নাগরিক হত্যার ঘটনায় প্রতিবেশী দেশ ভারত ভীত নয় বলে জানিয়েছে। ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশনের সহকারী হাইকমিশনার সন্দ্বীপ মিত্র জানিয়েছেন, বাংলাদেশে দুই একজন বিদেশী নাগরিক নিহত বা আহত হওয়ার ঘটনায় ভারতবাসী হিসেবে আমরা ভীত নই। কেননা আমরা মনে করি, বাংলাদেশ ভারতের বন্ধু রাষ্ট্র। আর আমরা এদেশের বন্ধুদের মধ্যেই রয়েছি। এদিকে চীনের রাষ্ট্রদূত মা মিং চিয়াং আগেই জানিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশে কোন ধরনের ভ্রমণ সতর্কবার্তা দেয়ার পরিকল্পনাই চীনের নেই।

কূটনৈতিক সূত্র জানায়, এক সপ্তাহের ব্যবধানে দুই বিদেশী নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনায় প্রথমে ঢাকার বিদেশী কূটনীতিকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছিল। বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকে তাদের নাগরিকদের জন্য সতর্কবার্তাও জারি করা হয়েছিল। তবে সরকার থেকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার ও দোষীদের গ্রেফতারে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ার ফলে তাদের মধ্যে এখন স্বস্তি ফিরে এসেছে। তারা এখন আর নিরাপত্তাহীনতা বোধ করছেন না।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বিদেশী নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নেয়া হয়। এসব পদক্ষেপের মধ্যে ছিল ঢাকার কূটনৈতিক জোন ও সারাদেশে নিরাপত্তা জোরদার। দেশের বিভিন্ন স্থানে চেক পোস্ট, গাড়ি তল্লাশি টিম ও মোবাইল টিম বাড়ানো, কূটনৈতিক জোনে সাধারণ পোশাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষী সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি, বিদেশী নাগরিকদের আবাসিক এলাকা ও কর্মস্থল, বিনোদন ক্ষেত্রে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। একই সঙ্গে তাদের চলাচলের জন্য বিভিন্ন রুটে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়। এসব পদক্ষেপের ফলে কূটনীতিকদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে।

এদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকে ভ্রমণ সতর্ক বার্তা দেয়ার পরেও বাংলাদেশ ভ্রমণে নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। আগের মতোই বিদেশীরা বাংলাদেশে আসছেন। তাদের আসা ও যাওয়া খুবই স্বাভাবিক রয়েছে। ইতালির নাগরিক সিজার তাভেলা খুন হওয়ার আগে ২৫ সেপ্টেম্বর ঢাকায় আসেন ৭০৩ জন বিদেশী নাগরিক। ২৬ সেপ্টেম্বর আসেন এক হাজার ২২২ জন, ২৭ সেপ্টেম্বর আসেন এক হাজার ৫১৫ জন বিদেশী নাগরিক। আর তাভেলা হত্যার পরে ২৯ সেপ্টেম্বর আসেন এক হাজার ৭৪৯ জন, ৩০ সেপ্টেম্বর আসেন এক হাজার ৬২৬ জন বিদেশী নাগরিক। এদিকে জাপানী নাগরিক হত্যার পরে ৪ অক্টোবর ঢাকায় আসেন, এক হাজার ৮৫০ জন, ৫ অক্টোবর আসেন এক হাজার ৯৫৭ জন, ৬ অক্টোবর আসেন এক হাজার ৯৫৬ জন বিদেশী নাগরিক। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিদেশী নাগরিকরা আগে যেমন বাংলাদেশ ভ্রমণে আসতেন, এখনও সেভাবেই বাংলাদেশে আসছেন। বিদেশী নাগরিকদের আসা যাওয়ার চিত্র পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানা যায়।

বেশ কয়েকটি দেশের পক্ষ থেকে ভ্রমণ সতর্ক বার্তা জারির পরেও বাংলাদেশে বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলের সফর অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে ভ্রমণ সতর্কবার্তা জারি করা দেশের মধ্যে অন্যতম ছিল যুক্তরাজ্য। তবে ভ্রমণ সতর্ক বার্তার মধ্যেই যুক্তরাজ্যের উচ্চ পর্যায়ের বাণিজ্যিক প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর করেছেন। যুক্তরাজ্যের উড়োজাহাজ ইঞ্জিন নির্মার্তা কোম্পানি রোলস রয়েস ও দেশটির স্ট্যান্ডার্ড চার্টাড ব্যাংকের প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর করেছেন। এর আগে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের কনজারভেটিভ পার্টির চার এমপি ঢাকা সফর করেন। তারা বাংলাদেশকে নিরাপদ হিসেবেও অভিহিত করেন।

বাংলাদেশে নিরাপত্তা নিয়ে মালয়েশিয়া চিন্তিত নয় বলে জানিয়েছে মালয়েশিয়া। বাংলাদেশে নিযুক্ত মালয়েশিয়ান হাইকমিশনার নরলিন ওথমেন জানিয়েছেন বাংলাদেশের নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে মালয়েশিয়া চিন্তিত নয়। এমনকি আমরা কোন ভ্রমণ সতর্কতাও ইস্যু করিনি। আমরা এদেশে স্বাভাবিকভাবেই চলাফেরা করছি। এছাড়া গত বৃহস্পতিবার থেকে রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে চতুর্থ ‘শোকেজ মালয়েশিয়া’-শীর্ষক প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। শনিবার এই প্রদর্শনী নির্বিঘেœ শেষ হয়েছে। বিভিন্ন দেশ থেকে মালয়েশিয়ার প্রতিনিধিরা এতে যোগ দেন। মালয়েশিয়া এক্সার্টানাল ট্রেড ডেভলাপমেন্ট কর্পোরেশন, মালয়েশিয়া সাউথ সাউথ এ্যাসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশের বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্ট ও বাংলাদেশ ইকনোমিক জোন অথরিটি যৌথভাবে এ শোকেজের আয়োজন করে।

এদিকে দুই বিদেশী নাগরিক হত্যার ঘটনায় কোন দেশের সঙ্গেই বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি ঘটবে না বলে মনে করছেন ঢাকার কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে জাপানী নাগরিক হত্যায় বাংলাদেশ-জাপানের ঐতিহাসিক সম্পর্কেও কোন প্রভাব পড়বে না। ইতালি ও জাপানের দুই নাগরিক হত্যার পর বাংলাদেশের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের সম্পর্কে কোন প্রভাব ফেলবে কি-না জানতে চাইলে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ওয়ালিউর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, দুই বিদেশী নাগরিক হত্যার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সঙ্গে কোন দেশেরই কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি ঘটবে না। বিশেষ করে জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের যে ঐতিহাসিক সম্পর্কের বন্ধন রয়েছে, তাতে কোন প্রভাব পড়বে না।

ইতালি ও জাপানের দুই নাগরিক হত্যার বিষয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কে প্রভাব পড়বে কি-না জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন জনকণ্ঠকে বলেন, এই ঘটনায় বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার কোন সুযোগ নেই। এই ঘটনার সঙ্গে এখানের সাধারণ জনগণের কোন সম্পর্ক নেই। তিনি বলেন, দুই বিদেশী হত্যার ঘটনায় দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। তা না হলে এসব দেশের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক চাপ বাড়বে। কূটনৈতিক চাপমুক্ত থাকতে হলে দ্রুত বিচার করতে হবে।

উল্লেখ্য, গত ৩ অক্টোবর রংপুরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন জাপানের নাগরিক কুনিও হোশি। এর আগে ২৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর গুলশানে সিজার তাভেলা গুলি করে হত্যা করা হয়। তিনি আইসিসিও কো-অপারেশন নামে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রুফ (প্রফিটেবল অপরচ্যুনিটিজ ফর ফুড সিকিউরিটি) কর্মসূচীর প্রকল্প ব্যবস্থাপক ছিলেন। আন্তর্জাতিক জঙ্গী সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) এ হামলার দায় স্বীকার করেছে বলে জঙ্গী হুমকি পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট ‘সাইট ইন্টিলিজেন্স গ্রুপ’ জানিয়েছে। তবে আইএসের এই দাবির সত্যতা নেই বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

নির্বাচিত সংবাদ