২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কিলিং মিশন বাস্তবায়নে ছিল বিএনপি নেতা সোহেল

  • দুই বিদেশী হত্যা

স্টাফ রিপোর্টার ॥ সরকারবিরোধী নোংরা রাজনীতির অংশ হিসেবেই বিএনপি-জামায়াতের মদদে দুই বিদেশী হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটে। কিলিং মিশন বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করেন স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি ও ঢাকা মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা। সোহেলসহ তার সহযোগীরা যাতে বিদেশে পালিয়ে যেতে না পারে এ জন্য বাংলাদেশের সব বিমানবন্দর ও সীমান্ত পয়েন্টগুলোতে ছবিসহ ওয়্যারলেস মেসেজ পাঠানো হয়েছে। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ও সে দেশটির জাতীয় তদন্ত সংস্থাকে (এনআইএ) বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। দেশটি প্রয়োজনীয় সহায়তা করার আশ্বাস দিয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত পয়েন্টগুলোতে বাড়তি নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সীমান্ত পয়েন্টে দায়িত্বরতদের দুই দেশের তরফ থেকেই বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে নির্দেশ জারি করা হয়েছে।

হত্যাকা-ের তথ্য যাতে প্রকাশ না হয়, এজন্য যুবদলের তিন দক্ষ শূটারকে দিয়ে গুলশানে ইতালীয় নাগরিক সিজার তাভেলাকে হত্যা করা হয়। আর রংপুরে যুবদল ও ছাত্রশিবির যৌথভাবে জাপানী নাগরিক হোশি কুনিওকে হত্যা করে। সিজার হত্যায় যুবদলের শূটার জুয়েলসহ বেশ কয়েকজনকে আটক করার কথা জানা গেলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ ব্যাপারে মুখ খোলেনি। জাপানী নাগরিক হত্যায় গ্রেফতারকৃতদের জেরা চলছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ জানুয়ারি থেকে টানা প্রায় তিন মাসের দেশব্যাপী বিএনপি-জামায়াতের ডাকা অবরোধ-হরতাল কর্মসূচী ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই তারা মরিয়া হয়েছিল। তারা বড় ধরনের নাশকতার সুযোগ খুঁজছিল। গত ২৮ সেপ্টেম্বর নাশকতার অভিযোগে অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় ক্রিকেট দল পূর্ব-নির্ধারিত বাংলাদেশ সফর বাতিল ঘোষণা করার সুযোগটিকে কাজে লাগাতে মরিয়া হয়ে উঠে তারা। সফর বাতিল ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গুলশানে ইতালীয় নাগরিক সিজার তাভেলাকে ফিল্মি স্টাইলে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়। এমন ঘটনার পরপরই একই কায়দায় গত ৩ অক্টোবর রংপুরে জাপানী নাগরিক হোশি কুনিওকে হত্যা করা হয়।

সূত্র বলছে, হত্যাকারীদের টার্গেট ছিল বিদেশী। সেক্ষেত্রে গুলশানে প্রথম টার্গেটের শিকার হয় সিজার। তিনি পরিস্থিতির শিকার মাত্র। সিজারের জায়গায় অন্যকোন বিদেশী থাকলেও একই পরিণতি হতো। সিজার হত্যাকা-কে আলোচনায় নিয়ে আসতে হত্যাকারীরা স্থান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নরের সরকারী বাসভবনের পাশের রাস্তাটিকে বেছে নেয়। যাতে সহজেই দেশ-বিদেশে হত্যাকা-ের ঘটনাটি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। স্বাভাবিক কারণেই একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গবর্নরের বাড়ির পাশে বিদেশী হত্যাকা- দেশ-বিদেশের মিডিয়ায় ঝড় তুলে। এছাড়া ওই এলাকায় অনেক বিদেশী হরদম যাতায়াত করে থাকে। পাশাপাশি হত্যাকা- চালানোর পর পলায়নের রাস্তাও তুলনামূলক সহজ। নানাদিক পর্যালোচনা শেষে হত্যাকারীরা ওই জায়গাটি নির্ধারণ করে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনকণ্ঠকে জানিয়েছেন, ইতালীয় নাগরিক সিজার তাভেলা ও জাপানী নাগরিক হোশি কুনিও সরকারবিরোধী বিএনপি-জামায়াতের নোংরা রাজনীতির শিকার মাত্র। সরকারবিরোধীরা বাংলাদেশকে জঙ্গীরাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের কাছে তুলে ধরে কূটনৈতিকভাবে চাপে রাখতেই দুই বিদেশীকে হত্যা করেছে। এর সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতের হাইকমান্ড সরাসরি জড়িত। হত্যাকা-ের ঘটনাটি ঘটায় বিএনপি-জামায়াতের অঙ্গ-সংগঠনের দক্ষ শূটাররা। হত্যাকা- সফল করতে মোটা অঙ্কের টাকার লেনদেন হয়। বিএনপি-জামায়াতের দলীয় হাইকমান্ডের নির্দেশে হাবিব-উন-নবী খান সোহেলের সার্বিক তত্ত্বাবধানে হত্যাকা- দুটি সংঘটিত হয়। নির্দেশনা আসে লন্ডন থেকে। হাবিব-উন-নবী খান সোহেল বর্তমানে আত্মগোপনে। তাকে হন্যে হয়ে খোঁজা হচ্ছে। তার ও শূটারদের ছবিসহ বিমানবন্দর এবং সীমান্ত পয়েন্টগুলোতে ওয়্যারলেস ম্যাসেজ পাঠানো হয়েছে। সীমান্তে টহল জোরদার করা হয়েছে। সীমান্তে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকাদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। বিষয়টি ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ ও এনআইএ’কে অবহিত করা হয়েছে। এ ব্যাপারে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সঙ্গে সর্বক্ষণিক যোগাযোগ অব্যাহত আছে। ভারতের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ ব্যাপারে বাংলাদেশকে সার্বিক সহযোগিতা করবে বলে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) সূত্রে জানা গেছে।

তদন্তকারীরা বলছেন, রংপুরে জাপানী নাগরিক খুনে যোগসূত্র থাকার তথ্যের সূত্র ধরে সোহেলের ছোটভাই রাশেদ-উন-নবী খান বিপ্লবকে গ্রেফতার করা হয়। জাপানী নাগরিক খুনের সঙ্গে রংপুর জেলা মৎস্যজীবী দলের আহ্বায়ক কামাল হোসেনের যোগসূত্র থাকার বিষয়েও তদন্ত চলছে। কারণ কামাল হোসেনের বড়ভাই হুমায়ুন কবির হীরার সঙ্গে রংপুরে একটি ঘাসের খামারের ব্যবসা করতেন নিহত জাপানী নাগরিক। কামাল হোসেনের হদিস জানা যায়নি। কামাল হোসেন ঘটনার দিন যে কোন দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা প্রকাশ করে জাপানীর সঙ্গে খামারে যেতে তার ভাই হীরাকে নিষেধ করেছিলেন। এজন্য ঘটনার দিন ওই জাপানী রিক্সায় করে খামারে যাচ্ছিলেন। স্থানীয় রিক্সাচালক মুন্নাফের কাছে নিজের ফোন নম্বরও লিখে দিয়েছিলেন হীরা। যেন জরুরী প্রয়োজনে রিক্সাচালক হীরার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।

হীরা ও তার ছোটভাই তিতাসকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে সূত্রগুলো বলছে, কানাডা থেকে দুই দফায় ৫২ লাখ এবং ৩৭ লাখ টাকা হীরার নামে আসে। হীরা ৯ লাখ টাকা তুলে নেয়। মৎস্যজীবী দলের নেতা কামাল হোসেনকে ভবিষ্যতে বড় পদ-পদবির প্রলোভন দিয়েছিলেন হাবিব-উন-নবী খান সোহেল। এজন্য তাকে যে কোন একজন বিদেশীকে হত্যার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সে অনুযায়ী কামাল হোসেনই মুখোশ পরিহিত কিলারদের দিয়ে জাপানী নাগরিককে খুন করান। জাপানী নাগরিক হত্যায় হীরা ও তিতাসকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।

জিজ্ঞাসাবাদে ইতালীয় নাগরিক সিজার তাভেলা হত্যার নানা তথ্য বেরিয়ে আসছে। সিজারকেও একই কায়দায় একটি মোটরসাইকেলে করে তিন খুনী পরপর ৩টি গুলি চালিয়ে হত্যা করে। তিন খুনীই শনাক্ত হয়েছে। শূটাররা সবাই যুবদলের দক্ষ গুলিবর্ষণকারী ও খুনী। তাদের শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন তদন্তকারীরা। গ্রেফতারের জন্য অভিযান চলছে। সিজার হত্যার নেপথ্যেও বিএনপি নেতা সোহেল বলে তদন্তে বেরিয়ে এসেছে।

এ ব্যাপারে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উত্তর বিভাগের উপকমিশনার শেখ নাজমুল আলম জনকণ্ঠকে বলেন, তদন্ত চলছে; প্রকৃত হত্যাকারীদের গ্রেফতারে চেষ্টা অব্যাহত আছে।

প্রসঙ্গত, আজ দুপুরে ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার মোঃ আছাদুজ্জামান মিয়া সার্বজনীন শারদীয় দুর্গোৎসবের নিরাপত্তা বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনের ডাক দিয়েছেন। সংবাদ সম্মেলনে দুই বিদেশী হত্যার অগ্রগতির বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে পারেন তিনি।

তদন্তের বিষয়ে র‌্যাবের ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ জনকণ্ঠকে বলেন, হত্যাকারীদের গ্রেফতারে চেষ্টা চলছে। বাংলাদেশকে জঙ্গীরাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের কাছে তুলে ধরে কূটনৈতিকভাবে চাপে রাখতেই দুই বিদেশীকে কোন বিশেষ গোষ্ঠী হত্যা করতে পারে।