২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ধর্মান্ধতায় থাকলে হবে না, সকলের কথা শুনতে হবে

  • সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের জাতীয় সম্মেলনে খায়রুল হক

বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার ॥ আইন কমিশনের চেয়ারম্যান এবং সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক বলেছেন, যে উদ্দেশ্য নিয়ে আমাদের ত্রিশ লাখ লোক শহীদ হয়েছেন, চার লাখ মা-বোন তাদের সম্ভ্রম হারিয়েছেন- সেই শোষণমুক্ত বাংলাদেশ গঠনের জন্য আমাদের কাজ করতে হবে। আমাদের ধর্মান্ধতায় থাকলে হবে না, এই দেশ সকলের জন্য। সকলের কথা শুনতে হবে। এখানে সকলেই যার যার ধর্ম পালন করতে পারবে। এমনকি যিনি ধর্ম মানেন না, দেশটি কিন্তু তারও। মহান আল্লাহ কিন্তু তাকেও খাওয়াচ্ছেন, পরাচ্ছেন- সে কথাগুলো আমাদের মনে রাখতে হবে। শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) মিলনায়তনে সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম-মুক্তিযুদ্ধ ’৭১-এর চতুর্থ জাতীয় সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে সম্মেলনের উদ্বোধন করা হয়। পরে জাতীয় সঙ্গীত, পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ, উদ্বোধনী সঙ্গীত ও শহীদদের স্মরণে শোক প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। সম্মেলনে দেশের ৫৮টি জেলা, বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানের ৬৮টি কমিটির ৭০০ জন প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন।

সম্মেলনের দ্বিতীয় পর্বে সংগঠনটির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল (অব) কেএম শফিউল্লাহ বীরউত্তম আবারও চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। কমিটির সভাপতিম-লীতে রয়েছেন- সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল (অব) সি আর দত্ত বীরউত্তম, লে. কর্নেল (অব) আবু ওসমান চৌধুরী এবং মেজর (অব) রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম। এছাড়া লেখক ও সাংবাদিক মুক্তিযোদ্ধা হারুন হাবিব আবারও মহাসচিব নির্বাচিত হন।

সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বে বক্তব্য রাখেন- সংগঠনটির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব) কেএম শফিউল্লাহ বীরউত্তম, মহাসচিব সাংবাদিক হারুন হাবীব, পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের সভাপতি বিচারপতি এএফএম মেজবাহ উদ্দীন, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ, ইসলামী চিন্তাবিদ ও ইক্বরা সভাপতি মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ, সংগঠনের ভাইস চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আবু ওসমান চৌধুরী, ঢাবির উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক নাসরিন আহমাদ প্রমুখ।

এ সময় এবিএম খায়রুল হক বলেন, শুধু যুদ্ধাপরাধী নয়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যে কোন অপরাধীরই শাস্তি হওয়া বাঞ্ছনীয়। আইনের ছাত্র হিসেবে আমি বৈশ্বিক পরিস্থিতিতেই এটা বিবেচনা করি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ এখনও চলমান। যে উদ্দেশ্য নিয়ে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম, তা শুধু বই বা সংবিধানেই রয়ে গেছে। তার বাস্তবায়ন আমাদের করতেই হবে।

তিনি বলেন, হাইকোর্টের একটা রায় ছিল ১৬ ডিসেম্বর যে জায়গায় পাকিস্তানী সৈন্যরা আত্মসমর্পণ করেছিল সে জায়গাটি সংরক্ষণের জন্য। সেখানে স্বাধীনতা চত্বর তৈরি করার নির্দেশনা ছিল। কিন্তু হাইকোর্টের সে রায়টি এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। আপনারা যারা মুক্তিযোদ্ধা আছেন এ কাজকে বাস্তবায়ন করতে একসঙ্গে কাজ করবেন।

তিনি আরও বলেন, যে যখন পারে তখনই বাঙালী জাতিকে ছোট করার চেষ্টা করে। কিন্তু বাঙালীরাই দুটি রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছে। ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান কিন্তু বাঙালীরাই সৃষ্টি করেছিল, যা আমরা অনেকেই ভুলে গেছি। এছাড়া পরবর্তীকালে এ জাতি তৈরি করেছে বাংলাদেশ। ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু একটি অনুষ্ঠানে বলেছিলেন পূর্ব-পাকিস্তানের নতুন নাম হবে বাংলাদেশ। তখনও কিন্তু আমরা বুঝতে পারিনি তার মনে কী কাজ করছিল। তিনি তখন থেকেই দেশকে স্বাধীন করার জন্য কাজ শুরু করেছিলেন। এখানেই একজন রাজনীতিবিদ ও স্টেটসম্যানের মধ্যে পার্থক্য। একজন রাজনীতিবিদ জনগণের বক্তব্যকে তুলে ধরেন আর একজন স্টেটসম্যান তার মতকে জনগণের মধ্য দিয়ে তুলে ধরেন। নিজের মতাদর্শকে জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারেন। সমগ্র বাংলাদেশের স্বাধীনতা বাঙালী জাতির আলাদা কৃষ্টি-সংস্কৃতি থাকার বিষয়টি বঙ্গবন্ধুই আমাদের শিখিয়েছেন। এ কারণেই তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সংবাদ পাঠক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক নাসরিন আহমাদ বলেন, যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল, তারা কোনকিছু পাওয়ার আশায় যায়নি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি সামান্য সুযোগের জন্য এখন অনেকে নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা বলে দাবি করে। মুক্তিযোদ্ধাদের দায়িত্ব হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাসকে তুলে ধরা এবং এর বাস্তবায়ন করা। নতুন করে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা না করে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের তালিকা করে তাদের বিচারের আওতায় আনা জরুরী বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সভাপতির বক্তব্যে সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের চেয়ারম্যান কেএম সফিউল্লাহ বীরউত্তম বলেন, শুধু কিছু যুদ্ধাপরাধীর বিচার করলে হবে না, তারা দেশের কোন কোন জায়গায় ঢুকে পড়েছে সেখান থেকে খুঁজে বের করে বিচারের আওতায় আনতে হবে।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সাবেক চেয়ারম্যান, শোলাকিয়ার ঈদ জামাতের ইমাম মাওলানা ফরীদউদদীন মাসঊদ জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধের দাবি জানিয়ে বলেন, দুয়েকজন যুদ্ধাপরাধীকে ফাঁসি দিলেই হবে না, জামায়াতকে অবিলম্বে নিষিদ্ধ করতে হবে। তারা ইসলামের নাম করে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, এখন তারা ইসলামের নামে রাজনীতি করে। যদিও ধর্মের এমন রাজনৈতিক ব্যবহার ইসলামের পরিপন্থী।

সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের নেতৃত্বে শফিউল্লাহ, হারুন ॥ বিডিনিউজ জানায়, মুক্তিযুদ্ধে এস-ফোর্সের অধিনায়ক ও সাবেক সেনাপ্রধান কেএম শফিউল্লাহ সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামে নতুন কমিটির চেয়ারম্যান এবং সাংবাদিক হারুন হাবীব মহাসচিব নির্বাচিত হয়েছেন। শনিবার সংগঠনের চতুর্থ জাতীয় কনভেনশনে ৩৯ সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করেন নির্বাচন কমিশনার অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু ওসমান চৌধুরী।

বিকেলে কনভেনশনের দ্বিতীয় অধিবেশনে কমিটি ঘোষণা করেন আবু ওসমান চৌধুরী। তিনি নিজেও নতুন কমিটির সভাপতিমণ্ডলীতে রয়েছেন। আরও রয়েছেন সেক্টর কমান্ডার অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল সিআর দত্ত বীর উত্তম ও অবসরপ্রাপ্ত মেজর রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম।

সহ-সভাপতি হয়েছেন- অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল হারুন অর রশীদ বীরপ্রতীক, সাবেক এডিশনাল আইজিপি মোঃ নুরুল আলম, স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ম. হামিদ, মুক্তিযুদ্ধে টাঙ্গাইল বাহিনীর উপ-প্রধান আনোয়ারুল আলম ও অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ডাঃ মোহাম্মদ শাহজাহান। যুগ্ম মহাসচিব হয়েছেনÑ অবসরপ্রাপ্ত মেজর জিয়াউদ্দিন আহমেদ ও অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ পাটোয়ারী। অধ্যাপক ডাঃ এম মনসুর আহমেদ অর্থ সম্পাদক, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল একে মোহাম্মদ আলী সিকদার সাংগঠনিক সম্পাদক ও মোঃ মোশাররফ হোসেন সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক হয়েছেন।