১৬ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এক দেবশিশুর জন্মদিনে

  • এম. নজরুল ইসলাম

বয়স তখন ছিল কাঁচা, হালকা দেহখানা

ছিল পাখির মতো, শুধু ছিল না তার ডানা।

-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (ছেলেবেলা)

কাঁচা বয়সই ছিল তার। দুই চোখে ছিল অপার বিস্ময়। মায়াভরা মুখ সবার দৃষ্টি কাড়ত। পরিবারটি রাজনৈতিক। দেশের রাজনীতির কেন্দ্র। কাজেই দিন-রাত সেখানে মানুষের আনাগোনা লেগেই থাকত। সেই বাড়ির যে শিশুটি সবার আদর কেড়ে নিয়েছিল তার নাম শেখ রাসেল। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের কনিষ্ঠ সন্তান। পরিবারের কনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে সবার আদরকাড়া এই শিশুটির কি কোন স্বপ্ন ছিল? সকালের সূর্যোদয় কি কোন বার্তা পাঠাত তাকে? সন্ধ্যার পশ্চিমাকাশ কেন আবির মাখে, এমন প্রশ্ন কি কোনদিন উঁকি দিয়েছে তার মনে? এসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা নেই। এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগেই তো ঘাতকের নির্মম বুলেট কেড়ে নিয়েছে তাকে, যাকে কল্পনা করা যেতে পারে এক দেবশিশুর সঙ্গে। কি দোষ ছিল তার? একরত্তি শিশু, জাগতিক কোন বোধ যাকে ছুঁয়ে যায়নি তাকে কেন ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হলো? এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। যে বয়সে আপন ভুবনে রাজা হয়ে থাকার কথা তার সেই বয়সে তাকে পরপারে পাড়ি জমাতে হলো।

ঢাকার ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র শেখ রাসেল। নিয়মিত ক্লাসে পাওয়া যেত তাকে। সমবয়সী বন্ধুদের সঙ্গে তার সদ্ভাব ছিল না এ কথা কেউ বলতে পারবে না। স্কুলের শিক্ষক থেকে শুরু করে গৃহশিক্ষক সবারই পছন্দের শিশুটিকে আর কোথাও দেখতে পাওয়া যায় না। ধারণা করা যেতে পারে, রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করে আজকের বাংলাদেশে কিছু না কিছু ভূমিকা রাখার সুযোগ হয়ত তৈরি হতো তার জন্য। কিন্তু ফুল ফোটার আগেই তো হত্যা করা হয়েছে।

বাবার রাজনৈতিক ব্যস্ততা, পরবর্তীতে দেশ গঠনে মনোনিবেশ- এ সবই তো তার খুব কাছ থেকে দেখা। বঙ্গবন্ধু যখন দেশের প্রধানমন্ত্রী, তখন জাপানী চিত্র পরিচালক নাগিসা ওশিমা বাংলাদেশে এসেছিলেন তার ওপর একটি প্রামাণ্য চিত্র তৈরি করতে। একান্ত সাক্ষাতকারে তিনি বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন শিশু রাসেলের কথা। নাগিসা ওশিমা দেখতেন শিশুটি সব সময় তার বাবার পাশে পাশে থাকে। এটাই ছিল তাঁর প্রশ্ন- শিশুটি কেন কাছে কাছে থাকে? বঙ্গবন্ধু ঠাট্টা করেই জবাব দিয়েছিলেন, ‘ওর মনে বোধ হয় এমন ভয় আছে, কখন সে তার বাবাকে হারিয়ে ফেলে।’ বাবাকে হারিয়েছে শেখ রাসেল। মা, ভাই, ভাবিদের হারিয়েছে। নিজেও হারিয়ে গেছে কোন দূরলোকে! সেই অনন্তলোক থেকে কেউ কোনদিন ফেরে না। শুধু কিছু স্মৃতি রয়ে গেছে তার দুই বোনের মনের গহীন কোণে, যে স্মৃতি তাঁরা বয়ে বেড়াবেন আজীবন। তাঁদের হৃদয়ের সেই গভীর ক্ষত কোনদিন জানবে না কেউ। কেউ জানবে না ছোট ভাইটির জন্য দুই বোনের গোপন অশ্রু বিসর্জনের কথা। ছোট ভাইয়ের জন্য বোনের মনে স্নেহ ও ভালবাসার যে ফল্গুধারা তা বাইরের কেউ বুঝতে পারে না। হয়ত এখনও ধানম-ির ৩২ নম্বরের বাড়িতে গেলে শেখ হাসিনা কিংবা শেখ রেহানার চোখে ভেসে ওঠে সেই মায়াভরা মুখ, সেই দুষ্টুমিভরা চাহনি। কিন্তু বোনের বাড়িয়ে দেয়া হাতে ধরা দেয় না ছোট ভাইটি আর। তাকে আর বুকে তুলে নেয়া হয় না। শুধু বুকের ভেতরে থাকা কষ্টগুলো ঝরে পড়ে দুই চোখ বেয়ে অশ্রু হয়ে।

ছোট এই ভাইটিকে নিয়ে দুই বোনের কি কোন স্বপ্ন ছিল? এটা তো নিশ্চিত, ছোট ভাইটির নিত্য আবদার ছিল তাঁদের কাছে। সব শিশুর জন্য পরিবারের সদস্যদের একটি পরিকল্পনা থাকে। থাকে স্বপ্ন। পরিকল্পনা ছিল এই শিশুর পরিবারটিরও, ছিল স্বপ্ন। দুই বোন, তিন ভাইয়ের সংসারে বোনের সন্তানরা ছাড়াও নতুন দুই অতিথিও এসেছেন- শেখ কামাল ও শেখ জামালের স্ত্রী। শেখ রাসেলের দুই ভাবি। তাদের সঙ্গে কেমন ছিল তার সম্পর্ক? ছেলেবেলা গ্রন্থের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বালক নামে একটি কবিতায় লিখেছেন, ‘জুটেছি বৌদিদির কাছে ইংরেজী পাঠ ছেড়ে,/মুখখানিতে ঘের দেওয়া তাঁর শাড়িটি লালপেড়ে।/চুরি করে চাবির গোছা লুকিয়ে ফুলের টবে/স্নেহের রাগে রাগিয়ে দিতেম নানান উপদ্রবে।’ শেখ রাসেল কি তার ভাবিদের এভাবে স্নেহের রাগে রাগিয়ে দিতে পারঙ্গম ছিল?

এসব অনেক প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা নেই। আমরা জানি এক কালরাতের কাহিনী। বাংলা ও বাঙালীর ইতিহাসের এক কলঙ্কময় দিনকে আমরা জানি, যেদিন পুব আকাশে উঠেছিল রক্তমাখা সূর্য। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। চারদিকে তখন কেবলই গুলির শব্দ। ঘাতকের গুলিতে প্রাণ দিয়েছেন বাড়ির সব সদস্য। শিশু রাসেল যেতে চেয়েছিল তার মমতাময়ী মায়ের কাছে। তাকে হত্যা করা হবে না এই অভয় চেয়েছিল সে। কিন্তু অবুঝ শিশু বোঝেনি ঘাতকের হৃদয়ে মায়া থাকে না। নির্মমতার শিকার হতে হয় তাকে। কি অপরাধ ছিল শিশু রাসেলের? জাতির জনকের সন্তান- এই কি তার অপরাধ?

আজ সেই দেবশিশু রাসেলের জন্মদিন। আজকের সব ফুল ফুটেছে শুধু তার জন্য। পাখিদের কণ্ঠে আজ রাসেলের গান। আজ পুবের আকাশ কি রাসেলের রক্তের রঙে লাল! দুই বোনের জন্য আজকের দিনটি অন্যরকম। একজন ঢাকায়, অন্যজন লন্ডনে বসে কি অবগাহন করবেন রাসেলের স্মৃতির সরোবরে। সবার অলক্ষ্যে রাসেল এসে কি ঝাঁপিয়ে পড়বে বোনদের কোলে? কপালে চুমুর রেখা এঁকে দিয়ে বোনই হয়ত বলবেন, ‘হ্যাপি বার্থ ডে রাসেল’!

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট হারিয়ে যাওয়া দেবশিশু- শুভ জন্মদিন। আজকের ভোরের বাতাসে ছড়িয়ে দিলাম আমাদের শুভেচ্ছা। আজকের সব ফুল ফুটেছে তোমার জন্য, তুমি কি দেখতে পাচ্ছ?

লেখক : অস্ট্রিয়া প্রবাসী মানবাধিকার কর্মী, লেখক ও সাংবাদিক

nayrul@gmx.at