২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নৌপথের উন্নয়ন

স্বাধীনতার পর দেশে এ যাবতকাল ২০ হাজার কিলোমিটারের উর্ধে নৌপথ হারিয়ে গেছে বলে বছর তিনেক আগে এক পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়। এই হারিয়ে যাওয়ার পরিমাণ এ ক’বছরে বেড়েছে বৈ কমেনি তা সহজেই অনুমেয়। নদীমাতৃক দেশে এ পরিসংখ্যান শুধু অনাকাক্সিক্ষতই নয়, আশঙ্কারও জন্ম দেয় বৈকি। এ কথা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না যে, নদীকেই কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে সভ্যতার অবকাঠামোগুলো। যে কারণে নদীর তীরসমূহেই বেশি বন্দর, হাট-বাজার, নগর ও শিল্প-কলকারখানা বিরাজমান। পাশাপাশি নৌপথই হয়ে উঠেছে দেশের অন্যতম প্রধান যোগাযোগের মাধ্যম। এ মাধ্যমে যাতায়াত সহজ ও খরচ কম বলে যাত্রী ও পণ্য বহনে নৌপথের বাহন বিশেষত নৌকা, লঞ্চ, স্টিমার, কার্গো এখনও সমানভাবে জনপ্রিয়। একই সঙ্গে নদীপথ ও নৌবন্দর দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে রাখছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

নৌপথের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা দিনের পর দিন যেভাবে বাড়ছে, সেভাবে নদীপথ তো বাড়ছেই না বরং ঘটছে বিপরীত ঘটনা। দু’ভাবে এ নদীপথ ক্রমান্বয়ে কমছে। প্রথমত প্রাকৃতিক, দ্বিতীয়ত মানবসৃষ্ট। প্রাকৃতিক কারণের মধ্যে নদীর ভাঙ্গন, অন্তঃসলীলায় গতিপথ পরিবর্তন, বন্যায় পলি ও বালি জমে কিংবা ডুবোচর সৃষ্টি, নাব্য হারিয়ে গভীরতা কমে মৃতপ্রায় হওয়ার ফলে নদীপথের আয়তন ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। অন্যদিকে মানবসৃষ্ট কারণগুলোর মধ্যে উল্লেখ করা যেতে পারেÑ প্রথমত অবৈধভাবে নদী দখল, নদীতে মাছের ঘেরে বাঁশ ও ডালপালার মাধ্যমে কচুরিপানা জমানো, অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণ ইত্যাদি। এসবের ফলে নদীর পানি প্রবাহের স্বাভাবিক গতি হচ্ছে ব্যাহত, নদী যাচ্ছে মরে, আবার গতিপথ ভিন্ন পথে গিয়ে হ্রাস পাচ্ছে আয়তন। নদীতে মাছের ঘের দেয়ার কোন আইনগত ভিত্তি নেই। ঘেরের ফলে পানি দূষিত হয়ে পরিবেশের ওপরও ফেলছে বিরূপ প্রভাব। ছোট বড় সব নদীর ক্ষেত্রেই কমবেশি এমন বাস্তবতা ভাবিয়ে তোলার মতো। প্রায় আট শ’ নদ-নদী ২৪ হাজার ১৪০ কিলোমিটার জায়গাজুড়ে জালের মতো বিস্তৃত রয়েছে। এর মধ্যে নৌপথের বর্তমান আয়তন বর্ষা মৌসুমে ৬ হাজার ও শুষ্ক মৌসুমে ৩ হাজার ৮শ’ কিলোমিটারের মতো। যা ক্রমহ্রাসমান। অথচ ১৯৯৮ সালে ছিল এর পরিমাণ যথাক্রমে ৮ ও ৫ হাজার কিলোমিটার। এ চিত্র নদীপথের দৈন্যেরই বহির্প্রকাশ। এমন বাস্তবতা নদীপ্রধান কোন দেশে কাম্য হতে পারে না। এ ব্যাপারে সরকারও উদ্বিগ্ন। সেটা প্রকাশ পেয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায়। নদীপথের এমন দুর্দশা কাটাতে সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে তাতে আশা করা যায় এমন নেতিবাচক পরিস্থিতির অবসান ঘটবে। একনেক সভায় নৌপথকে নাব্য রাখতে ও নির্বিঘœ করতে সরকার ২০টি ড্রেজার সহায়ক যন্ত্রপাতি এবং সরঞ্জামাদি সংগ্রহ নামের একটি প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে। এই সভায় ২ হাজার ৪৮ কোটি টাকা অনুমোদিত হয়। এ থেকেই আশা করা যায় নৌপথের উন্নয়নে সরকার আন্তরিক। একই যাত্রায় হারিয়ে যাওয়া নদী ও নৌপথও উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সচেষ্ট হবে বলে প্রত্যাশা। এ উদ্যোগ জাতীয় উন্নয়নের ধারায় শামিল হলো বৈকি।

মনে রাখা দরকার কোন প্রকল্পই সরকারের একার পক্ষে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। নদী ও নৌপথ যেহেতু আমাদের আর্থসামাজিক জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে, সেটাকে স্বাভাবিক ও নির্বিঘœ রাখার দায়িত্ব সবার। শুধু অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে শতভাগ সাফল্য আসবে এমনটা আশা করা যায় না। এর সঙ্গে দরকার জনসম্পৃক্ততা। জনসচেতনতাই পারে যে কোন পরিকল্পনা বা প্রকল্পকে সাফল্যের দিকে এগিয়ে নিতে।