২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

যতদিন উপভোগ করব-খেলব

যতদিন উপভোগ করব-খেলব
  • দাবার রানীখ্যাত রানী হামিদ

রুমেল খান ॥ ‘যতদিন মাথা চলবে, হাত চলবে, সুস্থতা থাকবে, আর আনন্দ লাগবে, ততদিনই খেলে যাব।’ যদি বলি কথাগুলো সৈয়দা জসিমুন্নেসা খাতুনের, তাহলে বাজি ধরে বলতে পারি- কেউই চিনবেন না তাকে। তবে যদি বলি তিনি বাংলাদেশের প্রথম মহিলা আন্তর্জাতিক দাবা মাস্টার, তার ডাকনাম রানী, বিয়ের পর নিজের ডাকনামের সঙ্গে যোগ করেন স্বামীর ‘হামিদ’ নামটি ... তাহলে নিশ্চয়ই চিনে ফেলবেন? ১৯৮৫ সালে ফিদে আন্তর্জাতিক মহিলা মাস্টার খেতাব পাওয়া এবং তিনবার ব্রিটিশ মহিলা দাবা প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়া ‘বাংলাদেশের দাবার রানী’ খ্যাত তিনিই হচ্ছেন রানী হামিদ।

ভাল সংগঠকের অভাব, সঠিক পরিকল্পনা, দাবার প্রতি মেয়েদের অনীহা, পৃষ্ঠপোষকতার অভাব- এগুলোর কারণেই আরেকজন রানী হামিদের আবির্ভাব ঘটেনি বলে মনে করেন ৭১ বছর বয়সী রানী হামিদ। তাই বলে তিনি হতাশ নন, ‘নারায়ণগঞ্জ থেকে বেশ কিছু মেয়ে দাবায় উঠে আসছে, যা সত্যিই আশাব্যঞ্জক। মেয়েগুলো খেলার জন্য ভাল সুযোগ-সুবিধা পেলে এবং লেগে থাকলে অবশ্যই অনেক দূর যাবে।’

প্রয়াত এবং জনপ্রিয় কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আপনি কেন লেখেন? তিনি জবাব দিয়েছিলেন, ‘নিজের আনন্দের জন্য লিখি।’ রানী হামিদের উত্তরটাও অনেকটা সেরকম, ‘দাবা খেলি মনের আনন্দে। এখন যারা খেলছে, তারা যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা ও প্রশিক্ষণ পাচ্ছে, খেলা শুরুর সময় তার সিকিভাগও পাইনি। তারা তো আমার চেয়েও অনেক মেধাবী। আমি শুরু করার পর পাঁচ বছর লেগেছে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য পেতে, এখন যেটা নতুনরা শুরুতেই পাচ্ছে।’

নিজের সময়ে খুব বেশি ভাল দাবাড়ু বা প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় স্বীয় দাবা দক্ষতা বৃদ্ধিতে অনেক সমস্যা হয়েছে রানীর, ‘ড. আকমল হোসেন ছাড়া আমার সময়ে ভাল দাবাড়ুই ছিল না। তার সঙ্গে খেলে নিজের খেলার মান বাড়াতে হয়েছিল আমাকে। আর এখনকার দাবাড়ুরা প্রচুর খেলছে, তারা মানসম্পন্ন একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে খেলছে, এটা তাদের প্লাস পয়েন্ট।’

শুধুই দাবার প্রতি আনন্দের জন্য নয়, সাংসারিক কোন চাপ না থাকা, স্বামী প্রয়াত এমএ হামিদের অকুণ্ঠ সমর্থন এবং পরে সন্তানদের (এদের একজন কায়সার হামিদ ছিলেন আশির দশকের প্রবল জনপ্রিয় জাতীয় ফুটবলার) উৎসাহও রানী হামিদকে লম্বা সময় দাবায় থাকতে সাহায্য করেছে। দাবা খেলাটা তিনি শুরু করেছিলেন স্কুলজীবন থেকেই। তার ভাষায়, ‘মজার ব্যাপার হচ্ছে, তখন মেয়েরা সুযোগ-সুবিধা কম পেলেও দাবায় তারা আসতো প্রচুর। অথচ এখন ঠিক তার উল্টোটাই ঘটছে!’

রানী মনে করেন, এ প্রজন্মের শিশুদের দাবা খেলার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে। এজন্য আমির আলী রানার মতো আগ্রহী দাবা সংগঠকদের এবং ওয়ালটনের মতো পৃষ্ঠপোষকদের আরও বেশি করে আর্থিক সহায়তা করা উচিত। সেই সঙ্গে মহিলা দাবাড়ুদের জন্য আলাদা বাজেটও হওয়া দরকার।

এদেশে দাবাকে এখনও পেশা হিসেবে নেয়ার মতো প্রেক্ষাপট সেভাবে তৈরি হয়নি। যেসব দাবা টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হয়, সেগুলোতে খুব কমই আর্থিক পুরস্কার দেয়া হয়। দিলেও পরিমাণটা থাকে খুবই নগণ্য। এ নিয়ে আক্ষেপ করেন রানী। তিনি বলেন, ‘যখন বিমানের হয়ে খেলতাম, তখন তারা কোন আর্থিক সুবিধা না দিলেও আমার যাতায়াত ভাড়া এবং বিদেশ খেলতে গেলে বিমান টিকেট দিত। এটা তো এখনকার মেয়েরা পায় না।’ এজন্য দাবা ফেডারেশনকেও আংশিক দায়ী করেন তিনি, ‘এ অবস্থার জন্য ফেডারেশন দায় এড়াতে পারে না। তবে তাদের পুরোপুরি দোষ দেব না। শ্যুটিং ফেডারেশনের মতো তাদের যদি আয়ের আলাদা কোন উৎস থাকতো, তাহলে নিশ্চয়ই তারা এ দিকটা দেখতো।’

এই প্রজন্মের অনেক মহিলা দাবাড়ুরই আদর্শই হচ্ছেন রানী হামিদ। তারা চায় রানী হামিদের মতো হতে। এ ব্যাপারে রানীর সহাস্য প্রতিক্রিয়া, ‘ভাল লাগলো শুনে। তবে ওরা আমার মতো হবে কেন? আমি তো চাই ওরা আমাকেও ছাড়িয়ে যাক। তাহলে দেশের মহিলা দাবা অনেক উন্নতি করবে, এটাই প্রত্যাশা করি।’

জাতীয় দাবায় ২১ বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন রানী হামিদ। এটা বিশ্ব রেকর্ড। কিন্তু দাবা ফেডারেশনের অদক্ষতা, অনীহায় এটি গিনেজ বুকে এখনও অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি পীড়া দেয় রানীকে, ‘জানি না আমার এ কৃতিত্ব কোনদিনও গিনেজ বুকে উঠবে কি না!’

গত জুলাইয়ে ভারতে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ দাবা চ্যাম্পিয়নশিপের সিনিয়র বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হওয়াটা রানীর দাবা সুদীর্ঘ ক্যারিয়ারের সর্বশেষ সাফল্য। এটি নিয়ে অনেক তৃপ্ত তিনি, ‘এই বয়সেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলে সাফল্য পেয়েছি। এটা আমার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। এতে আরও খেলে যাবার প্রেরণা পেয়েছি।’

বাংলাদেশের মহিলা দাবার উন্নয়নে ১৯৮৫ সাল থেকেই কাজ করছেন রানী। ‘মহিলা দাবা সমিতি’র প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি তিনি। মাঝে অবশ্য কয়েক বছর বন্ধ থাকার পর ২০০০ সাল থেকে আবারও সচল হয়েছে সংগঠনটির কার্যক্রম। জাতীয় দাবাড়ু জাহানারা হক রুনু এর সাধারণ সম্পাদক। আরেক জাতীয় দাবাড়ু মাহমুদা হক চৌধুরী মলি সংগঠনের জন্য প্রায়ই আর্থিক সহায়তা করেন বলে জানান রানী হামিদ। তিনি বলেন, ‘এই সংগঠনের কাজ হচ্ছে যেসব মেয়ে ভাল দাবাড়ু, অথচ কোন ক্লাব পায় না, তাদের বিভিন্নভাবে সাহায্য করা। একটা পর্যায় পর্যন্ত তারা যেন উন্নতি করতে পারে। এজন্য অবশ্যই প্রয়োজন ভাল প্রশিক্ষণের। আমরা অবশ্য কোচিং করাচ্ছি না।’

পুরুষ দাবায় এখন গ্র্যান্ডমাস্টারের সংখ্যাটা পাঁচ। আর মহিলাদের বেলায় সংখ্যাটা শূন্য। কবে দেখা যাবে দেশের প্রথম মহিলা গ্র্যান্ডমাস্টারকে? ‘এখন মহিলা দাবার যে অবস্থা, তাতে তো আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে কাউকে দেখছি না। লিজা সম্ভাবনাময়ী। কিন্তু ওতো রেটিং সেভাবে বাড়াতে পারছে না। তবে আমি আশাবাদী- দেরিতে হলেও একদিন অবশ্যই মহিলা গ্র্যান্ডমাস্টারের সন্ধান পাব আমরা।’

রানী হামিদের এই প্রত্যাশা সফল হোক, এটাই দাবাপ্রেমীদের নিগূঢ় প্রত্যাশা।