২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চিংড়ি শিল্পে বিপর্যয়

  • বাবুল সরদার

‘এবার মরার পালা পড়িছে, দেনা দেব না খাব- কিছুই বুঝে উঠতি পারতিছি নে। ছল-মাইয়ের লেখাপড়া তো দূরি থাক, বাইচে থাহাই কষ্ট, ঘরবাড়ি ছাইড়ে চইলে যায়া ছাড়া আর কোন উপায় দেহি না...।’ চলতি বছর ‘সাদা সোনা’ খ্যাত বাগদা চিংড়ির দাম অস্বাভাবিক কমে যাওয়ায় দিশেহারা চিংড়ি চাষী রুহুল আমিন শেখ এভাবে হাপিত্যেশ করেছেন। বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার ঝনঝনিয়া গ্রামে তার বাড়ি। বাড়ির কাছে গাববুনিয়া বিলে সাড়ে তিন বিঘার চিংড়ি ঘের তার। নিজের এক বিঘা, আর দুই বিঘা ভাড়া নিয়ে চিংড়ি ঘের করেছেন খরচ হয়েছে প্রায় দেড় লাখ টাকা। এনজিও থেকে এক লাখ টাকা লোন নিয়েছেন। ওই চিংড়ি ঘের আর বাড়িতে ৩ কাঠার বাগান আয়ের একমাত্র উপায়। তাই পড়েছেন বিপাকে। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘ভাইরাসের কারণে প্রথমদিকে সব মাছ মরে যায়। দুই-তিনবার পোনা ছাড়ার পর এখন কিছু মাছ হইছে। কিন্তু দাম খুব কম। খরচের অর্ধেক টাকাও ওঠবে না।’ রুহুল আমিনের মতো মোড়েলগঞ্জের জিউধরা ইউনিয়নের চিংড়ি চাষী বৃদ্ধ অতুল ম-ল বলেন, ‘প্রথম দুই-তিন গোন কোন মাছ পাইনি। সব মরে গেছে। এহন যা হইছে, তার দাম নেই। গেলবার যে চিংড়ি বেচিছি এক হাজার টাকায়, এবার তার দাম অর্ধেক।’ এরকম পরিস্থিতি সব চিংড়ি চাষীর।

এবার বাজারে বাগদা চিংড়ির দাম কেজিতে ৪শ’ টাকা পর্যন্ত কমেছে। বাগদা চিংড়ির বাজার দর বর্তমানে ১৫ গ্রেড ১০০০ টাকা, যা তিন মাস আগে ছিল ১৩০০ টাকা, ২০ গ্রেড ৯০০ টাকা, যা আগে ছিল ১২০০ টাকা, ৩০ গ্রেড ৬০০ টাকা, যা আগে ছিল ৮৫০ টাকা, ৪৪ গ্রেড ৪০০ টাকা, যা আগে ছিল ৬০০ টাকা এবং ৬৬ গ্রেড ২০০ টাকা, যা আগে ছিল ৪৫০ টাকা। গত তিন মাস ধরে বাগদা চিংড়ির এই অবস্থা চলছে বলে ব্যবসায়ীরা জানান। দাম কমে যাওয়ায় ডিপো মালিকরা নগদ অর্থে চিংড়ি কিনতে চাচ্ছেন না। দ্রুত পচনশীল হওয়ায় চাষীরা বাকিতে চিংড়ি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। উভয় সঙ্কটে চিংড়ি চাষীরা দিশেহারা। ফলে বৈদেশিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ চিংড়ি শিল্পে বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। একাধিক ডিপো মালিক চাষীদের কাছ থেকে বাকিতে চিংড়ি কেনার কথা স্বীকার করেছেন। রফতানি কমে যাওয়ায় কোম্পানি মাছ কিনতে চায় না, তাই তারা বাকিতে মাছ কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।

বাংলাদেশ হিমায়িত খাদ্য রফতানিকারক এ্যাসোসিয়েশন (বিএফএফইএ) দাবি করেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে বাগদা চিংড়ির দাম ও চাহিদা কমে যাওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। কবে নাগাদ চিংড়ির বাজার স্বাভাবিক হবে তা নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। বাগেরহাট জেলা চিংড়ি চাষী সমিতির সভাপতি ফকির মহিতুল ইসলাম বলেন, ‘দেশের সিংহভাগ চিংড়ি উৎপাদন হয় বাগেরহাটে। এই জেলার সত্তর ভাগ মানুষ এ পেশায় জড়িত। এ বছর মৌসুমের শুরুতে চিংড়ি ঘেরে মড়ক মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে। ঘের মালিকরা এই ভাইরাসের প্রকোপ কাটিয়ে উঠে নতুন পোনা ছাড়েন। ভাল-মন্দ মিলিয়ে উৎপাদন হয়। প্রথমদিকে বাজারে মোটামুটি ভাল দাম ছিল। কিন্তু তিন মাস আগে হঠাৎ করে দাম অস্বাভাবিক কমে যায়। ফলে চাষীরা মহাবিপাকে পড়েছে।’ বাগেরহাটের চিংড়ি চাষের এ চিত্র গোটা দক্ষিণাঞ্চলের হাজার হাজার চিংড়ি চাষীর। মান্ধাতা আমলের চাষ পদ্ধতি, মড়ক, ফলন কম, মূল্য হ্রাসসহ নানা সমস্যায় তারা বিপর্যস্ত। দেনাগ্রস্ত চিংড়ি চাষীরা আহাজারি করছেন।

চিংড়ি শিল্পের বর্তমান সঙ্কট কাটানোর জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ না করলে এ খাতটি হুমকির মুখে পড়ে যাবে। সাদা সোনাকে রক্ষা করতে হলে, চাষীদের মুখে হাসি ফোটাতে হলে সরকারের উচিত এখনই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা।