২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কৃষিতে সম্ভাবনাময় বরিশাল

শংকর লাল দাশ

বরিশাল বরাবরই ‘শস্যভা-ার’ হিসেবে পরিচিত। এখানকার উৎপাদিত কৃষিপণ্য অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি সারাদেশের চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। কৃষিপণ্য রফতানিতেও বরিশাল রয়েছে শীর্ষে। কৃষিভিত্তিক শিল্প কারখানা স্থাপনে অপার সম্ভাবনা থাকলেও তা কাজে লাগানো হয়নি। এতে কৃষিপণ্য উৎপাদনকারী প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষক যেমন পাচ্ছেন না যথাযথ মূল্য, তেমনি নানামুখী সমস্যায় হাবুডুবু খাচ্ছেন এ অঞ্চলের লাখো কৃষক।

নদ-নদী, খাল-বিল ও অনুকূল আবহাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে বরিশাল ধান উৎপাদনে ব্রিটিশ আমল থেকে শীর্ষস্থান দখল করে আছে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এখানকার উৎপাদিত উদ্ধৃত্ত ধান কমবেশি সারাদেশের চাহিদা মিটিয়ে আসছে। সরকারী নানা উদ্যোগ-আয়োজনেও বাড়ছে ধানের উৎপাদন। বরিশাল বিভাগের ৬ জেলায় নিট ফসলের জমি রয়েছে ৭ লাখ ২০ হাজার হেক্টরেরও বেশি। এতে গড়ে প্রতিবছর প্রায় ২৩ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদিত হয়। অথচ অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্যের চাহিদা রয়েছে ১৬ লাখ মেট্রিক টনের মতো। অর্থাৎ প্রায় প্রতিবছর গড়ে ৭ লাখ টনের মতো বাড়তি ধান উৎপাদিত হচ্ছে, যা দেশের চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। উৎপাদনে শীর্ষে থাকলেও বরিশাল অঞ্চলে নেই প্রয়োজনীয় চাল প্রক্রিয়াকরণ শিল্প অর্থাৎ অটো রাইস মিল। ফলে এখানকার ধান শীত মৌসুমে প্রক্রিয়াকরণের জন্য দেশের নানা প্রান্তে বিশেষ করে মুন্সীগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হচ্ছে। এতে লাভবান হচ্ছে কেবলমাত্র মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়া, পরিবহন ও উত্তরাঞ্চলের অটো রাইস মিল মালিকরা। এখানকার কৃষক পাচ্ছেন না ন্যায্যমূল্য। এমনকি এ অঞ্চলে নেই ধান সংরক্ষণেরও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা।

ধানের মতো বরিশাল অঞ্চলের পেয়ারা, তরমুজ, মিষ্টিআলু এবং আমড়া উৎপাদনের দিক দিয়ে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছে। বরিশালের তিন জেলার ৫৬টি গ্রামেই প্রতিবছর কয়েক লাখ টন পেয়ারা উৎপাদন হয়। যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকলেও পেয়ারাভিত্তিক শিল্প স্থাপনে নেই কোন ধরনের উদ্যোগ। ১৯৮২ সালে পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি উপজেলার বিসিক শিল্প নগরীতে জেলি তৈরির একটি উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে সে উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। এরপর থেকে আর কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। একইভাবে তরমুজ, মিষ্টিআলু ও আমড়ার মতো কৃষিপণ্য দিয়েও উন্নতমানের খাবার তৈরির নানা প্রযুক্তি থাকলেও বরিশাল অঞ্চলে এসবের ব্যবহার নেই। প্রতিবছর শুধু পরিবহন সঙ্কট জটিলতায় কয়েক হাজার মেট্রিক টন তরমুজ পচে যায়। আমড়া এবং মিষ্টিআলুরও ব্যাপক অপচয় ঘটে। ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরের পরে সরকারী-বেসরকারী কয়েকটি প্রতিষ্ঠান-সংস্থার আগ্রহে বরিশাল অঞ্চলে সূর্যমুখী ফুলের আবাদ শুরু হয়। কৃষক ক্রমেই সূর্যমুখী আবাদে আগ্রহী হয়ে উঠছে। কিন্তু সূর্যমুখীর বীজ থেকে তেল উৎপাদনে অদ্যাবধি প্রয়োজনীয় এবং পর্যাপ্ত কল-কারখানা গড়ে ওঠেনি। সূর্যমুখীর বীজ নিয়ে কৃষক এক জায়গা থেকে ছুটছে আরেক জায়গায়। এতে বাড়ছে অর্থ ও শ্রমক্ষয়। কেবলমাত্র কারখানার অভাবে কৃষক সূর্যমুখীর আবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে, এমন আশঙ্কা ক্রমে জোরালো হয়ে উঠছে।

গত এক দশকে পটুয়াখালী অঞ্চলে গোলআলুর চাষ এতটাই বেড়েছে, যা আশাতীত। কিন্তু কোল্ডস্টোরেজ বা হিমাগার না থাকায় উৎপাদিত আলু নিয়ে চাষীদের চরম বিপাকে পড়তে হচ্ছে। আলু নিয়ে চাষীদের হিমাগারের জন্য ছুটতে হচ্ছে দেশের নানা প্রান্তে। হিমাগার যথেষ্ট লাভজনক হওয়া সত্ত্বেও এ অঞ্চলে আজ পর্যন্ত তা স্থাপনে নেয়া হয়নি কোন ধরনের উদ্যোগ। বরিশাল অঞ্চলে প্রতিবছর প্রচুর পরিমাণ নারিকেল ও সুপারি উৎপাদিত হয়। পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি উপজেলায় নারিকেলের ছোবড়ানির্ভর কিছু কুঠির শিল্প গড়ে উঠলেও বিভাগের অন্য কোন জেলায় তা নেই। এক সময়ে বরিশাল অঞ্চল থেকে সুদূর চীনে প্রচুর পরিমাণ সুপারি রফতানি হতো। অথচ এ দুটি কৃষিপণ্য এখন অনেকটাই অবহেলিত।

বরিশাল অঞ্চলে কৃষি ও মৎস্যভিত্তিক রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল প্রতিষ্ঠা জরুরী হয়ে পড়েছে জাতীয় স্বার্থেই। গত ২০০২ সালে এ ধরনের একটি উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও পরবর্তীতে সে পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। অথচ বরিশাল অঞ্চলে এ ধরনের একটি ইপিজেড স্থাপন করা হলে তা দেশের রফতানি খাতকে আরও সমৃদ্ধ করা ছাড়াও গোটা দক্ষিণাঞ্চলের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় এক মাইলফলক হয়ে উঠতে পারত। বরিশাল অঞ্চলে একাধিক ইপিজেডসহ কৃষিভিত্তিক শিল্প-কারখানা স্থাপনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। সে সম্ভাবনা কাজে লাগানো গেলে এ অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি কৃষকের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটবে। অর্থপ্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষেরও ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটবে।