২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দেশের প্রথম আইটি পার্কের যাত্রা শুরু আজ

দেশের প্রথম আইটি পার্কের যাত্রা শুরু আজ
  • জনতা টাওয়ারে এ পার্কের উদ্বোধন করলেন সজীব ওয়াজেদ জয়

ফিরোজ মান্না ॥ বহু প্রতীক্ষার পর-অবশেষে স্বপ্ন পূরণ। স্বপ্ন এখন সত্যি, যাত্রা শুরু সফ্টওয়্যার টেকনোলজি পার্কের। দেশের প্রথম সফ্টওয়্যার টেকনোলজি পার্কের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। রবিবার আগারগাঁওয়ে বিসিসি ভবন থেকে তিনি এই পার্কের উদ্বোধন করেন। রাজধানীর কাওরানবাজারে অবস্থিত ১২ তলার এ ভবনটি জনতা টাওয়ার নামে পরিচিত বলে পুরো নামকরণ করা হযেছে ‘জনতা টাওয়ার সফ্টওয়্যার টেকনোলজি পার্ক’। এই পার্কে শুধুই সফ্টওয়্যার নিয়েই কাজ হবে। ইতোমধ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠান সফ্টওয়্যার তৈরি ও রফতানির কাজ শুরু করেছে। তারা আবার কালিয়কৈরে হাইটেক পার্কে প্লট নিয়ে নিজেদের শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারবেন। সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, কাওরানবাজারের এই পার্কে বর্তমানে তিনটি প্রতিষ্ঠান তাদের কাজ শুরু করেছে। ভবনের দুই তলায় স্কোয়ার, ৭ তলায় আইটি সফ্ট মিলিনিয়াম ইনফরমেশন সলিউশন লিমিটেড ও ভবনের ১১ তলায় কম্পিউটার সোর্স নামের প্রতিষ্ঠান চালু হয়েছে। ভবনের বাকি তলাগুলো বরাদ্দ পাওয়ার জন্য তথ্য প্রযুক্তি বিভাগে ৫০টির বেশি ছোট বড় প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছে। তাদের অল্পদিনের মধ্যে স্পেস বরাদ্দ দেয়া হবে। ৪ তলায় রয়েছে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একটি কার্যালয়। ভবনের ৫ তলায় রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি নিষ্পত্তি কমিশনের চেয়ারম্যানের কার্যালয়। তবে এখানে অবস্থিত আইটি সফ্ট মিলিনিয়াম ইনফরমেশন সলিউশন লিমিটেডের ম্যানেজার এসএম সাহিদুল হাসান বলেন, এই অফিসগুলো অল্পদিনের মধ্যে উঠে যাবে। তখন গোটা ভবনে সফ্টওয়্যার শিল্প স্থান হবে।

রবিবার সকালে আগাঁরগাওয়ে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি) অডিটোরিয়ামে সফ্টওয়্যার পার্ক উপলক্ষে ‘অপারেশনাল লঞ্চিং অব দ্য ফার্স্ট সফ্টওয়্যার টেকনোলোজি পার্ক ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এই অনুষ্ঠানে বসেই প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় পার্কটির উদ্বোধন করেন। এ সময় তিনি বলেন, দেশের প্রথম টেকনোলজি পার্কের যাত্রা শুরু আজ থেকে। এতদিন এটা ছিল স্বপ্ন। এখন এটি বাস্তব। দেশের তথ্য প্রযুক্তির সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান হিসেবে জনতা টাওয়ার সফ্টওয়্যার টেকনোলজি পার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। গত এক বছরে দেশে তথ্য প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। আমরা জনসেবার জন্য ২৫ হাজার সরকারী ওয়েবসাইট তৈরি করেছি। ৩ হাজার ৫টি কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। ইউনিয়ন পর্যন্ত ইন্টারনেট পৌঁছে দেয়ার কাজের প্রথম ধাপ শেষের পথে। মানুষের কাছে সহজে ইন্টারনেট পৌঁছে দেয়ার জন্য যে সব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তার অনেক কিছুই এখন বাস্তব। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে হাইটেক পার্কের একটি ব্লকের নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে। জনগণের সাইবার সিকিউরিটি দেয়ার জন্য হেল্পলাইন স্থাপন করা হয়েছে। তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়ন না হলে দেশের উন্নয়ন রোধ হবে। কারণ বর্তমান বিশ্ব এখন তথ্য প্রযুক্তির দ্বারাই এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদেরও সেই জায়গায় যেতে হবে।

তিনি বলেন, বর্তমানে টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তির কল্যাণে বদলে গেছে মানুষের জীবনযাত্রা। দৈনন্দিন জীবনে তথ্য প্রযুক্তি বড় একটি জায়গা করে নিয়েছে। যোগাযোগ, পড়াশুনা, কেনাকাটা, ব্যাংকিং, স্বাস্থ্যসেবা, অফিস আদালতের কাজকর্ম, বিনোদন, ব্যবসা-বাণিজ্য সব ক্ষেত্রেই এই মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। তথ্য প্রযুক্তির সুফল দেশের মানুষ ভালভাবেই নিচ্ছে। ঘরে বসে থেকে সরকারী বেসরকারী শতাধিক সেবা পাচ্ছে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এটি এনেছে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। সরকারের যেসব মেগা প্রকল্প রয়েছে এর মধ্যে কালিয়াকৈরে হাইটেক পার্ক নির্মাণ, একই স্থানে টিয়ারফোর ডাটা সেন্টার স্থাপন, যশোরে আইটি পার্ক স্থাপন, রাজধানীর মহাখালীতে আইটি ভিলেজ, রাজশাহীতে বরেন্দ্র সিলিকট সিটি, সিলেটে ইলেক্ট্রনিক্স সিটি, আইসিটি সেক্টরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও এ সেক্টরে রফতানি বহুমুখী করা, জেলা পর্যায়ে পাবলিক নেটওয়ার্ক স্থাপন, আউট সোর্সিংয়ে দক্ষ জনবল সৃষ্টি, জেলা পর্যায়ে হাইটেক পার্ক, সফ্টওয়্যার টেকনোলজি পার্ক, আইটি ভিলেজ স্থাপন করার প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। যার মাধ্যমে একদিকে তথ্য প্রযুক্তির উন্নত সেবা গ্রহণ করতে পারবে সাধারণ মানুষ। অন্যদিকে, এসব প্রকল্পে বিপুল পরিমাণ দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ হবে। সৃষ্টি হবে কয়েক লাখ কর্মসংস্থান। আইটি পার্ক দেশের আইটি খাতকে সমৃদ্ধ ও এ খাতে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আগ্রহী করতে যশোরে ২৪১ কোটি টাকা ব্যয়ে সফ্টওয়্যার টেকনোলজি পার্ক স্থাপন করছে সরকার। ২০১৬ সালের মধ্যে এ কাজ শেষ করবে সরকার। কালিয়াকৈর হাইটেক পার্কে ডেভেলপার নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। যশোর হাইটেক পার্কের ১ম পর্যায়ের কাজ আগামী মার্চে শেষ হবে। হাইটেক পার্কগুলো স্থাপনের মাধ্যমে আগামী চার বছরে ৭০ হাজার দক্ষ জনশক্তির কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

তথ্য প্রযুক্তি বিভাগ জানিয়েছে, টিয়ার ফোর সার্টিফায়েড ন্যাশনাল ডাটা সেন্টার নামে একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এটি বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ১৯৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশ্বের ৫ম বৃহত্তম এই ডাটা সেন্টারে চায়নিজ এক্সিম ব্যাংকের ১৫৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং বাংলাদেশ সরকারের ৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। এই ডাটা সেন্টারটি ব্যাংক, গবেষণা কেন্দ্র, সরকার এবং অন্যান্য বাণিজ্য সংস্থার গোপনীয়, গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর তথ্য সংরক্ষণ করা হবে। ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে দুর্গম এলাকায় ইউনিয়ন তথ্য ও সেবা কেন্দ্র, ৩০ কোটি টাকায় এস্টাবলিশমেন্ট অব সাসেক ইনফরমেশন হাইওয়ে, ২২ কোটিতে বেসিক আইসিটি স্কিল ট্রান্সফার, ২৫ কোটিতে উপজেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ল্যাব, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের দু’জন শিক্ষার্থীকে ল্যাপটপ প্রদান, ২৮২ কোটি টাকায়, পাবলিক নেটওয়ার্ক স্থাপন (বাংলা গভনেট), ৫৭১ কোটি টাকায় আইসিটি সেক্টরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও রফতানি বাড়াতে পাবলিক সেক্টর আধুনিকীকরণ, এক হাজার ৩৩৪ কোটি টাকায় ইনফো সরকার প্রকল্প বাস্তবায়ন, ১৮১ কোটি টাকায় আউটসোর্সিংয়ের জন্য দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টি, ৩০০ কোটি টাকায় ২ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপনসহ আরও অনেক প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নের কাজ চলছে।

রবিবার সফ্টওয়্যার টেকনোলজি পার্ক উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের সভাপতিত্বে তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তারা এবং এ খাতের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য আশির দশকের শেষ দিকে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় তার স্ত্রী রওশন এরশাদের মালিকানার মেসার্স জনতা পাবলিশার্স জনতা টাওয়ার নির্মাণ শুরু করা হয়। সে সময়ে শুধু এর অবকাঠামোর কাজ শেষ হয়েছিল। এরশাদের পতন হলে নানা অনিয়ম দুর্নীতির দায়ে আদালত এটি বাজেয়াপ্ত করে দেয়। এরপর ২০১০ সালের ৩ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ডিজিটাল বাংলাদেশ টাস্কফোর্সের প্রথম সভায় জনতা টাওয়ারকে দেশের প্রথম সফ্টওয়্যার পার্ক হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়। এই সিদ্ধান্তেরও অনেক প্রায় ৫ বছর পরে পার্কটির যাত্রা শুরু হলো।