২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কাল মহাসপ্তমী ষষ্ঠী পুজোর মধ্য দিয়ে আজ শুরু শারদোৎসব

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ বোধন শেষে আজ সোমবার ষষ্ঠীপুজোর মধ্য দিয়ে সূচনা ঘটছে বাঙালীর শারদোৎসব। হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপুজো, যা শেষ হবে আগামী ২৩ অক্টোবর প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খ আর উলুধ্বনি আর ভক্তকূলের আবহনের মন্ত্রোচ্চারণে দেবী দুর্গার স্বর্গ থেকে মর্ত্যে আগমন ঘটেছে। পুজোর মন্ত্রোচ্চারণ, মন্দিরে মন্দিরে ধূপ-ধুনোয় ভক্তদের নৃত্য আরতি আর ঢাক-ঢোল, কাঁসর-মন্দিরার পাশাপাশি মাইকের আওয়াজ আর বর্ণাঢ্য আলোকচ্ছটায় আজ সারাদেশের পুজোম-পগুলো উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে। দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালনে দুর্গতিনাশিনীর আগমন আনন্দে বিহ্বল বিশ্বের কোটি হিন্দু সম্প্রদায়।

প্রতিমা তৈরি শেষ। বাহারি রঙ চড়েছে প্রতিমার গায়। নিপুণ শিল্পী তার তুলির আলতো ছোঁয়ায় জাগিয়ে তুলেছেন মা দুর্গাকে। জেগে উঠবেন সরস্বতী। গণেশের গায় উঠেছে নক্সীদার কুঁচির দুধসাদা ধুতি। মা লক্ষ্মীর হাসি ঝরে পড়ছে ম-পগুলোতে। আজ ষষ্ঠীপুজোর মধ্য দিয়ে খুলে যাবে মা দুর্গার স্নিগ্ধ শান্ত চোখ। জেগে উঠবেন দশভুজা। আশীর্বাদ দেবেন মনোবাঞ্ছা নিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে আসা পূজারীকে।

শারদীয় দুর্গোৎসবকে বর্ণাঢ্য ও আনন্দমুখর করে তুলতে দেশজুড়ে বর্ণাঢ্য প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। সারাদেশে এখন উসবের আমেজ। শারদোৎসবে মতোয়ারা হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিটি মানুষ। পুজো উপলক্ষে সারাদেশে নেয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ঢাকা, চট্টগ্রামে মোতায়েন করা হয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।

দুর্গতিনাশিনী দুর্গা এসেছেন বিশ্ব শান্তির জন্য তথা সবার মঙ্গলের তরে। কিন্তু অসুরবিনাশিনী জগজ্জননী দেবী দুর্গা বাঙালী গৃহে আসেন অন্যভাবে। কৈলাশ ছেড়ে প্রতিবছর তিনি আসেন বাবার বাড়িতে কন্যারূপে। দেবী দুর্গার সঙ্গে প্রতি শরতে মর্ত্যে আসেন লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ। এই চালচিত্রে দেবাদিদেব শিবও বাদ যান না। লক্ষ্মী সমৃদ্ধি ও সরস্বতী জ্ঞানের প্রতীক। কার্তিক হচ্ছেন দেব সেনাপতি, শত্রুনাশকারী। আর গণেশ হচ্ছেন সর্বসিদ্ধিদাতা অর্থাৎ মানুষের কামনা পূরণকারী। বাঙালী হিন্দুরা যে কোন শুভকাজে ইষ্টনাম হিসেবে দেবী দুর্গাকে স্মরণ করে থাকেন।

সনাতন বিশ^াস ও পঞ্জিকামতে, জগতের মঙ্গল কামনায় দেবী দুর্গা এবার ঘোড়ায় চড়ে মর্ত্যলোকে (পৃথিবী) আসবেন, যার ফল হচ্ছে ফসল ও শস্যহানি। আর বিদায় নেবেন (গমন) দোলায় (পালকি) চড়ে, যার ফল হচ্ছে মড়ক। পুরাণমতে, রাজা সুরথ প্রথম দেবী দুর্গার আরাধনা শুরু করেন। বসন্তে তিনি পুজোর আয়োজন করায় দেবীর এ পুজোকে বাসন্তীপুজো বলা হয়। কিন্তু রাবণের হাত থেকে সীতাকে উদ্ধার করতে লঙ্কাযাত্রার আগে শ্রী রামচন্দ্র দেবীর পুজোর আয়োজন করেছিলেন শরতকালের অমাবস্যা তিথিতে, যা শারদীয় দুর্গোৎসব নামে পরিচিত। দেবীর শরতকালের পুজোকে এজন্যই হিন্দুমতে অকাল বোধনও বলা হয়।

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের হিসাবে এবার সারাদেশে প্রায় সাড়ে ২৮ হাজার ম-পে শারদীয় দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হবে। সরকারী হিসাবে অবশ্য ২৮ হাজার ৩৪৫টি ম-পে পুজো হচ্ছে। মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির হিসাবে এবার ঢাকা মহানগরীর পুজোম-পের সংখ্যা ২২৫টি, যা গতবারের তুলনায় ৫টি বেশি।

শারদীয় দুর্গাপুজোর প্রথম দিনে আজ সোমবার ষষ্ঠীতে দশভুজা দেবী দুর্গার আমন্ত্রণ ও অধিবাস। আগের দিন রবিবার সায়ংকালে সব ম-প-মন্দিরে বেলশাখায় বোধনের মাধ্যমে দক্ষিণায়নের নিদ্রিত দেবী দুর্গার নিদ্রা ভাঙ্গার জন্য বন্দনাপুজো করা হয়েছে। ষষ্ঠী তিথিতে আজ সকাল ৯টা ৫৭ মিনিটের মধ্যে দেবীর ষষ্ঠ্যাদি কল্পারম্ভ। সেই সঙ্গে দেবীর আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে শুরু হবে মূল দুর্গোৎসব। আগামীকাল মঙ্গলবার মহাসপ্তমী, বুধবার মহাষ্টমী ও কুমারীপুজো। তিথি অনুযায়ী এবার বৃহস্পতিবার একই দিনে মহানবমী ও বিজয়া দশমী পড়েছে। তবে সারাদেশে শুক্রবার বিজয়া শোভাযাত্রা সহকারে প্রতিমা বিসর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আবার বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকামতে, শুক্রবার সকালে বিজয়া দশমী ও প্রতিমা বিসর্জন হওয়ায় রামকৃষ্ণ মিশন পুজোম-পসহ অনেক মন্দির ও পুজোম-প এই সময়সূচীই অনুসরণ করছে। এ হিসেবে বরাবরের মতো এবারও পাঁচ দিনজুড়েই চলবে উৎসবের নানান আয়োজন।

দুর্গোৎসব চলাকালে পুজোর প্রতিদিনই অঞ্জলি, প্রসাদ বিতরণ ও ভোগআরতির আয়োজন করা হবে। এছাড়া দেশজুড়ে দুর্গোৎসব চলাকালে ম-পে ম-পে আলোকসজ্জা, আরতি প্রতিযোগিতা, স্বেচ্ছায় রক্তদান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা, নাটক, নৃত্যনাট্যসহ বিভিন্ন কর্মসূচীর আয়োজন করা হয়েছে।

শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে পৃথক বাণীতে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া এবং জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন।

পৃথক বিবৃতিতে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতিত্রয় মেজর জেনারেল (অব) সিআর দত্ত বীরউত্তম, এ্যাডভোকেট প্রমোদ মানকিন, ঊষাতন তালুকদার, সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি কাজল দেবনাথ, সাধারণ সম্পাদক জয়ন্ত কুমার দেব, মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি জেএল ভৌমিক, সাধারণ সম্পাদক নারায়ণ সাহা মনি, ছাত্র যুব ঐক্য পরিষদের সভাপতিত্রয় নির্মল কুমার চ্যাটার্জী, উইলিয়াম প্রলয় সমাদ্দার বাপ্পি, এ্যাডভোকেট প্রশান্ত ভূষণ বড়ুয়া এবং সাধারণ সম্পাদক রমেন ম-ল হিন্দু সম্প্রদায়সহ দেশবাসীকে শারদীয় দুর্গোৎসবের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের প্রতিটি পুজোম-পের নিরাপত্তা রক্ষায় পুলিশ, আনসার, র‌্যাব ও বিজিবি সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। পুুলিশ এবং র‌্যাবের পাশাপাশি প্রায় প্রতিটি ম-পে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী দায়িত্ব পালন করবে। ঢাকেশ^রী মন্দির মেলাঙ্গনে মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির উদ্যোগে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষ খোলা হয়েছে।

রাজধানীতে কেন্দ্রীয় পুজো উৎসব বলে পরিচিত ঢাকেশ^রী জাতীয় মন্দির পুজোম-পে আজ পাঁচ দিনের শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক উ™ে^াধন হবে। পুজোর পাশাপাশি ভক্তিমূলক সঙ্গীতানুষ্ঠান, দুস্থদের মধ্যে বস্ত্র বিতরণ, মহাপ্রসাদ বিতরণ, আরতি প্রতিযোগিতা, স্বেচ্ছায় রক্তদান ও শেষ দিনে বিজয়া শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠ পুজোম-পে মহাষ্টমী ও কুমারীপুজোর দিনে মহাপ্রসাদ বিতরণ করা হবে। রাজারবাগের বরোদেশ^রী কালীমাতা মন্দির ও শ্মশান কমিটির পুজোম-পে পুজোর আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াও দরিদ্রদের মধ্যে বস্ত্র বিতরণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নৃত্যনাট্য ও নাটক পরিবেশিত হবে।

গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজা উদযাপন পরিষদের আয়োজনে বনানী পুজোম-পে পুজোর পাঁচ দিনই বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হবে। শাঁখারীবাজারের প্রতিদ্বন্দ্বী পুজোম-পে দুর্গাপুজোর ৪৪ বর্ষপূর্তি উপলক্ষে থাকছে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। জয়কালী রোডের রামসীতা মন্দিরে আলোচনা সভা ও দরিদ্রদের মধ্যে বস্ত্র বিতরণ করা হবে।

এছাড়া রমনা কালীমন্দির ও আনন্দময়ী আশ্রম, সিদ্ধেশ্বরী কালীবাড়ি, পুরান ঢাকার অভয়নগর দাস লেনের ভোলানন্দগিরি আশ্রম, রাধিকা বসাক লেন, নবেন্দ্র বসাক লেন, ঢাকেশ্বরীবাড়ি, শাঁখারীবাজারের পান্নিটোলা, টিকাটুলীর প্রণব মঠ, ঠাঁটারীবাজার পঞ্চানন শিবমন্দির, সূত্রাপুরের ঋষিপাড়া মন্দির, গৌতম মন্দির, বনগ্রাম তরুণ সংসদ, ওয়ারী সার্বজনীন পূজা কমিটির ম-প, কলাবাগান মাঠে সার্বজনীন পুজোম-প, ফরাশগঞ্জ জমিদারবাড়ি, বিহারীলাল জিউর মন্দির, যমুনা মাঈ আশ্রম ও মতিঝিলের অরুণিমা সংসদ পূজা কমিটির ম-পসহ বিভিন্ন মন্দির ও ম-পে দুর্গোৎসবের ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।