২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জিহাদীদের হুমকি

জিহাদীদের হুমকি

শংকর কুমার দে ॥ আবারও প্রগতিশীল লেখক ও ব্লগার, চাকরিজীবী নারী ও গণমাধ্যমকে ই-মেল বার্তাযোগে হুমকিসহ ৬ দফা নির্দেশনা দেয়া হয়েছে জঙ্গী সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নামে। গণমাধ্যমকে ‘জিহাদ’ বিরোধী সংবাদ প্রকাশ থেকে বিরত থাকা, নারীদের ঘরের বাইরে চাকরি করা শরিয়াহ মতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ ও প্রগতিশীল লেখক ও ব্লগারদের কতল করার হুমকি দেয়া হয়েছে। গত তিন বছরে প্রগতিশীল লেখক ও ব্লগারের মধ্যে ৭ জনকে হত্যা ও ১৬ জনকে কুপিয়ে হত্যাচেষ্টার দায়ে অভিযুক্ত এই জঙ্গী সংগঠনটি। এর মধ্যে দু’একটি হত্যাকা-ের ঘটনা উদ্ঘাটিত হওয়ার দাবি করা হলেও জঙ্গী সংগঠনটির হত্যা, হত্যাচেষ্টার হুমকি ও তৎপরতা থেমে নেই। ই-মেলে দেয়া ৬ দফা নির্দেশনাকে জঙ্গী সংগঠনটির আইন বলে তা মেনে চলার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। গণমাধ্যমে পাঠানো ই-মেল বার্তায় এ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমে প্রচার সমন্বয়ক আব্দুল্লাহ বিন সালিম। জঙ্গী সংগঠনের ই-মেল বার্তার হুমকির খবর প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট ও সাইবার ক্রাইম প্রতিরোধ টিম হুমকিদাতাদের চিহ্নিত করে গ্রেফতারের জন্য মাঠে নেমে তদন্ত শুরু করেছে। গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে এ খবর জানা গেছে।

সোমবার দুপুরের পর ধহংধৎঁষষধযনধহমষধনফ@মসধরষ.পড়স আইডি থেকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ই-মেল বার্তাটি পাঠানো হয়। ই-মেল বার্তা পাঠানোর এ্যাড্রেস লিস্টে দেখা যায়, একই মেল দেশের শীর্ষস্থানীয় সব প্রচার মাধ্যম কার্যালয়েও পাঠানো হয়েছে।

ইমেল বার্তার ওপরে ঠিকানা লেখা হয়েছে আনসারউল্লাহ বাংলা টিম, প্রধান কার্যালয়, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ। শেষে প্রেরকের জায়গায় লেখা হয়েছে আবদুল্লাহ বিন সালিম, প্রচার সমন্বয়ক, আনসারউল্লাহ বাংলা টিম। গণমাধ্যমকে ছয় দফা ‘নির্দেশনা’ দিয়ে আনসারউল্লাহ বাংলা টিমের নামে ই-মেলে জেহাদবিরোধী সংবাদ প্রকাশ না করতে হুমকি দেয়া হয়েছে।

আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নামে ই-মেলে গণমাধ্যমকে যে ৬ দফা নির্দেশনা মেনে চলার জন্য হুমকি দেয়া হয়েছে তাতে বলা হয়েছে, গণমাধ্যমকে জিহাদীবিরোধী সংবাদ প্রকাশ থেকে বিরত থাকতে হবে, এটা আমাদের নির্দেশ, আজ থেকে আমাদের আইন। ইসলামের পথে না চললে আপনাদের পরিণতি হবে ভয়াবহ। উঁচু উঁচু ভবন সব ধুলায় লুটাবে, আপনাদের শির লুটাবে ইসলামের সেনানীদের পদতলে। নারীদের ঘরের বাইরে চাকরি করা ইসলামী শরিয়াহ মতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলেও দাবি করা হয়েছে ওই ই-মেল বার্তায়। ই-মেলে বলা হয়েছে, সংবাদমাধ্যমের নারী কর্মীদের চাকরি থেকে অব্যাহতি দিতে হবে। বিদেশে থাকা ব্লগাররা দেশে ফিরলেই কতল করা হবে।

আনসারুল্লাহ বাংলা টিম জঙ্গী সংগঠনটির কতলের হুমকির তালিকায় যারা আছেন তাদের মধ্যে আসিফ মহিউদ্দিন, আরিফুর রহমান, ওমরা ফারুক লাক্স, ফারজানা কবির স্নিগ্ধা, হাসিব মাহমুদ, চরম উদাস, হোরাস সূর্যদেব, সায়মুম সুলতান, আরিফ কবিরের নাম রয়েছে। এরা ছাড়াও আরও অনেকের নাম রয়েছে যাদের ইসলামবিদ্বেষী ব্লগার হিসেবে চিহ্নিত করে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে। একই ই-মেইল বার্তায় সতর্ক করে দেয়া হয়েছে অমি রহমান পিয়াল, আরিফ জেবতিক, আজম খান, সবাক পাখি, মারুফ রাসুল, ইমরান এইচ সরকারকে।

জঙ্গী সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নামে পাঠানো ই-মেল বার্তায় হুমকি দিয়ে বলা হয়, ইসলামের নামে অপপ্রচার, প্রাণের নবী, উম্মুল মোমেনিনদের চরিত্রে কলঙ্ক লেপে দেয়ার চেষ্টা করছে নাস্তিক্যবাদী শক্তি। তরুণ প্রজন্মের কলব থেকে ইসলামকে মুছে ফেলতে সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করছে তারা। এসব ঘটনায় যারা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে তাদের মধ্যে আছেন আসিফ মহিউদ্দিন, আরিফুর রহমান, ওমরা ফারুক লাক্স, ফারজানা কবির স্নিগ্ধা, হাসিব মাহমুদ, চরম উদাস, হোরাস সুর্যদেব, সায়মুম সুলতান, আরিফ কবিরসহ আরও অনেক ইসলামবিদ্বেষী নাস্তিক। নেতৃত্ব দেয়ার বিষয়ে যাদের নামে হুমকি দেয়া হয়েছে তারা সবাই জঙ্গী সংগঠনের হুমকির মুখে ভয়ে বিদেশে পালিয়ে গেছে বলে জানা গেছে। তারা যদি বাংলাদেশে ফিরে আসে তাহলে প্রগতিশীল লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায়ের মতো দেশের মাটিতে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে জীবনবাজি রেখে আল্লাহ রাসুলের আশেকানরা তাদেরও কতল করবে।

জঙ্গী সংগঠনটির ই-মেইলের বার্তায় সতর্ক করে যাদের হুমকি দেয়া হয়েছে তাদের মধ্যে অমি রহমান পিয়াল, আরিফ জেবতিক, আজম খান, সবাক পাখি, মারুফ রাসুল, ইমরান এইচ সরকারকে নাস্তিক আখ্যায়িত করে বলা হয়, তাদের মতো আরও অনেক নাস্তিক আছে যারা সুচতুরভাবে এদেশের তরুণদের মন ওলামায়ে কেরাম, ধর্মপ্রাণ মুসলমান, মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকসহ পুরো ইসলামের বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্মের মন বিষিয়ে তুলছে। ফলে

দিনে দিনে মানুষ ইসলাম থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, গোমরাহিতে লিপ্ত হচ্ছে, কিন্তু লক্ষ্য পূরণে আমরা অবিচল। ই-মেইল বার্তায় বলা হয়, আমাদের সুনির্দিষ্ট কোন হত্যা তালিকা বা তথাকথিত হিটলিস্ট নেই। ফেসবুক, ব্লগসহ যে কোন মাধ্যমে যে আল্লাহ, নবী, রাসুল, সাহাবি, ওলামায়ে কেরাম, মাদ্রাসার শিক্ষক, ধর্মপ্রাণ মুসলমান, উম্মুল মোমেনিনদের চরিত্র দিয়ে প্রশ্ন তুলবে, বাজে কথা বলবে তাদের আজরাইল হিসেবে রাব্বুল আলামিন আমাদের প্রেরণ করবেন। সুযোগ পাওয়া মাত্র ইসলামের বীর সেনানীরা কতল করবে তাদের। ই -মেইল বাতায় হুঁশিয়ারি করে দিয়ে বলা হয়, দেশ কিংবা বিদেশে পালিয়ে থাকা নাস্তিকদের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে কেউ যেন নাস্তিকতার দিকে ঝুঁকে না পড়েন। অন্যথায় পরিণতি হবে নিলয় নীল কিংবা ওয়াশিকুর বাবু, অভিজিৎ রায়ের মতো। একটি নাস্তিককেও বেঁচে থাকতে দেয়া হবে না। এদের হত্যা করা আল্লাহ রাসুলের বিধান মতে ওয়াজিব।

সংবাদ মাধ্যমের প্রতিও হুঁশিয়ারি দিয়ে জঙ্গী সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নামে পাঠানো ই-মেইল বাতায় বলা হয়, আমরা লক্ষ্য করছি অধিকাংশ পত্রপত্রিকায় আমাদের নামে আজেবাজে কথা লেখা হয়। তাদের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে আহ্বান করছি, আপনারাও যদি নাস্তিক্যবাদের সহায়তাকারী হন তবে কাউকে ছাড়া হবে না। ই-মেলে একটি কয়েকটি দাবিও উত্থাপন করে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম জঙ্গী সংগঠনটি। দাবির মধ্যে রয়েছে, সংবাদ মাধ্যম থেকে নারীদের অব্যাহতি দেয়ার আহ্বান। আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, যেহেতু নারীদের ঘরের বাইরে চাকরি করা, বেপর্দা হয়ে ঘোরাঘুরি করা ইসলামী শরিয়াহ মতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ তাই যারা এদের চাকরি দিচ্ছেন, চাকরি করাচ্ছেন, তারাও সমানভাবে দোষী। সংবাদমাধ্যমের প্রতি আহ্বান করছি নারীদের চাকরি থেকে অব্যাহতি দিন।

নারীদের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়ার বিষয়ে ই- মেল বার্তায় বলা হয়, সকল সংবাদমাধ্যমের প্রতি আহ্বান করছি, ইসলামবিরোধী, নাস্তিক্যবাদী শক্তির কোন প্রকার প্রচারণায় শামিল হওয়া যাবে না। ইসলামের সেনানীদের বিরুদ্ধে কোন প্রকার অপপ্রচার চালান যাবে না। তাদের যে কোন জেহাদী কর্মকা-ের সমালোচনা সম্পূর্ণরূপে অগ্রহণযোগ্য এবং নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো। পত্রিকার বিজ্ঞাপনে নারী মডেলের ছবি ব্যবহার করা যাবে না। কোন নারীর বেপর্দা ছবি পত্রিকায় ছাপানো যাবে না। বিনোদন পাতা, নৃত্য, গীত, নাটক, সিনেমা এমন যে কোন ইসলামী শরিয়তবিরোধী যা সমাজে ফিতনা ছড়ায়, যুবক-যুবতীদের মনে যৌনতা উস্কে দেয় তা প্রকাশ থেকে বিরত থাকতে হবে। যে কোন নাস্তিকের মৃত্যুর পরে পত্রিকায় কোন প্রকারের জেহাদবিরোধী সংবাদ প্রকাশ করা যাবে না। করলে সে পত্রিকায় চাকরিরত এবং মালিক পক্ষকে নাস্তিক, নাস্তিক্যবাদের সহায়ক শক্তি হিসেবে গণ্য করে সমূলে উপড়ে ফেলা হবে।

ই-মেইল বার্তার চিঠির শেষ অংশে বলা হয়, আমাদের লক্ষ সেনানী প্রস্তুত হচ্ছে ইসলামের পবিত্র এই ভূমির আনাচে কানাচে। আমাদের প্রস্তুতি প্রায় চূড়ান্ত। যে কোন দিন খেলাফত কায়েমের সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ব আমরা। বিদেশে অবস্থানরত নয়জন এবং দেশে বসবাসরত ছয়জন ব্লগারের নাম তুলে দিয়ে চিঠিতে বলা হয়েছে, যারা বিদেশে আছেন তাদের দেশে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে আর যারা দেশের অভ্যন্তরে গা-ঢাকা দিয়ে আছেন তাদের সুযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হত্যা করা হবে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মুনতাসিরুল ইসলাম বলেন, আনসারউল্লাহ বাংলা টিমের মেইলের খবরটি আমরা জানতে পেরেছি। বিষয়টি উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে এবং কারা এর পেছনে, কোথা থেকে এই ই-মেল এসেছে তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একজন কর্মকর্তা বলেন, দুই বিদেশী হত্যাকা-ের তদন্ত যখন শেষ পর্যায়ে এবং হত্যাকারী, পরিকল্পনাকারী সবই শনাক্ত তখন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নামে ই-মেইল বার্তা পাঠিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে। আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নামে নানাজনকে হুমকি সংবলিত বার্তা এর আগেও গণমাধ্যমে এসেছে।

গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা বলেন, দুই বিদেশী খুন হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গীগোষ্ঠী আইএস এর দায় স্বীকারের খবর নিয়ে বাংলাদেশে জঙ্গীবাদের উত্থানের আশঙ্কা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে সেই সময়ে জঙ্গী সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নামে ই-মেইল বার্তা পাঠানোর ঘটনাটি একই সূত্রে গাঁথা। বিদেশী দুই খুনে আইএসের সংশ্লিষ্ট্তা পাওয়া যায়নি জানিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে আইএস বা এ ধরনের কোন জঙ্গী গোষ্ঠীর তৎপরতা নেই। অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট টিমের বাংলাদেশ সফর স্থগিত, দুই বিদেশী খুন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের চলাচলে সতর্কতার নির্দেশ দেয়ার ঘটনারই ধারাবাহিকতায় আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নামে ই-মেইল বার্তা পাঠানো হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট ও সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য।