১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পোকায় খাওয়া গম ফ্রান্সে ফেরত পাঠানো হচ্ছে

  • আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে ॥ খাদ্যমন্ত্রী

বাবুল সরদার, বাগেরহাট/আহসান হাবিব হাসান, মংলা থেকে ॥ আবারও নিম্নমানের গম আমদানির খবর পাওয়া গেছে। এবার মংলা বন্দরে আসা খাবার অনুপযোগী ও নিম্নমানের ২১ হাজার টন গম গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আমদানিকৃত গম খালাস তদারকি কমিটি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে খাদ্যমন্ত্রী এ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম জনকণ্ঠকে বলেন, মংলা বন্দরে আসা নিম্নমানের ২১ হাজার টন গম ফ্রান্সে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। খাওয়ার অনুপযোগী এই গম গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে চিঠি দিয়ে বিষয়টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য এই গম আমদানি করেছে ঢাকার ইমপেক্স কনসালটেন্ট লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। খাদ্যমন্ত্রী বলেন, গমের মান পরীক্ষার জন্য জাহাজে গিয়ে সরেজমিন পরীক্ষা ও নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরীক্ষার পর নিম্নমান এবং খাবার অনুপযোগী থাকায় ওই গম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায় খাদ্য বিভাগের তদারকি কমিটি। এটিই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। তিনি বলেন, গম নিয়ে যাতে মন্ত্রণালয় ও সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট না হয় সে ব্যাপারে আমরা সতর্ক রয়েছি।

ফ্রান্স থেকে নিম্নমানের গম নিয়ে আসা সাইপ্রাসের পতাকাবাহী এমভি পিনটেল নামের জাহাজটি গত এক সপ্তাহ ধরে মংলা বন্দরের হারবাড়িয়ায় অবস্থান করছে। শত কোটি টাকার গম আমদানি করা হলেও বর্তমানে মংলা বন্দরে খালাসের অপেক্ষায় জাহাজে থাকা গমের মূল্য প্রায় ৪৪ কোটি টাকা বলে জানা গেছে। এ তথ্য নিশ্চিত করেছে আমদানিকৃত গম খালাস তদারকি কমিটির আহ্বায়ক খুলনার আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক কাজী নূরুল ইসলাম।

খাদ্য বিভাগ সূত্র জানায়, ফ্রান্স থেকে আমদানি করা গম নিয়ে সাইপ্রাসের পতাকাবাহী এমভি পিনটেল জাহাজটি গত ১২ অক্টোবর দুপুরে মংলা বন্দরে আসে। জাহাজে থাকা আমদানিকৃত ওই গমের মান পরীক্ষার জন্য ৬ সদস্যের কমিটি ১৩ অক্টোবর জাহাজে গিয়ে গম সরেজমিনে পরীক্ষা ও নমুনা সংগ্রহ করে। পরীক্ষায় নিম্নমান এবং খাবার অনুপযোগী থাকায় ওই গম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায় খাদ্য বিভাগের তদারকি কমিটি। খাবার অনুপযোগী ও নিম্নমানের গমের বিষয়টি জানিয়ে দেয়া হয় খাদ্য মন্ত্রণালয়সহ আমদানিকারক ঠিকাদারকে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য এই গম আমদানি করেছে ঢাকার ইমপেক্স কনসালটেন্ট লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান।

তবে একাধিক সূত্রে জানা গেছে, খাদ্য বিভাগের ফ্রান্স থেকে আমদানি করা শত কোটি টাকার অধিক মূল্যের ৫২ হাজার ৫শ’ মেট্রিক টন খাবাব অনুপযোগী পোকা ধরা নিম্নমানের গম খালাসের সুযোগ অপেক্ষায় পাঁচ মাসের বেশি সময় ধরে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশ উপকূলে অবস্থান করেছে সাইপ্রাসের পতাকাবাহী জাহাজ এমভি পিনটেল। সারাদেশে ‘ব্রাজিলের পচা গম’ নিয়ে হৈ-চৈয়ের মধ্যে ফ্রান্স থেকে খাদ্য বিভাগের জন্য আনা খাবাব অনুপযোগী পোকা ধরা নিম্নমানের এই গম খালাসে আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকায় আমদানিকারক ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ইমপেক্স কনসালটেন্ট লিমিটেড তা চট্টগ্রাম বন্দরে খালাস করতে না পেরে জাহাজটিকে কৌশলে বঙ্গোপসাগরে নিয়ে যায়। ঢাকার এই ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটিকে খাবার অনুপযোগী পোকা ধরা এই নিম্নমানের গম খালাসের জন্য থাকতে হয় সময় ও সুযোগের অপেক্ষায়। তাদের হাতে মোক্ষম সুযোগটি এসে যায় সেপ্টেম্বরের শেষ ও অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে। ওই সময়ে ঢাকা-রংপুরে ইতালি ও জাপানের দুই নাগরিক সন্ত্রাসীদের গুলিতে খুন হলে দেশ-বিদেশে শুরু হয় তোলপাড়। কর্মরত বিদেশীরা বাংলাদেশ ছাড়তে শুরু করে। এই সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানিকৃত গম পরীক্ষায় কর্মরত এক বিদেশী বিশেষজ্ঞ নিরাপত্তাহীনতায় দেশ ছেড়ে চলে যান। আমদানিকারক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইমপেক্স কনসালটেন্ট লিমিটেড এই সুযোগে খাদ্য বিভাগ ও চট্টগ্রামের আমদানিকৃত গম খালাস তদারকি কমিটিকে দ্রুত ম্যানেজ করে তাদের পক্ষে পরীক্ষা রিপোর্ট এনে চট্টগ্রাম বন্দরে ৩১ হাজার ৫০ মেট্রিক টন গম খালাস করে।

এর পরই বাঁধে বিপত্তি। আমদানিকৃত চাল-গমের ৪০ ভাগ মংলা বন্দরে খালাস করতে হবে প্রধানমন্ত্রীর এমন নির্দেশ থাকায় এই খাবাব অনুপযোগী নিম্নমানের অবশিষ্ট ২১ হাজার মেট্রিক টন গম খালাসের জাহাজটিকে ১২ অক্টোবর নিয়ে আসা হয় মংলায়। এই বন্দরে আমদানিকৃত গম খালাস তদারক কমিটি ১৩ অক্টোবর জাহাজে গিয়ে আমদানিকৃত গম পোকায় খাওয়া, পোকাধরাসহ খাবার অনুপোযোগী ও নিম্নমানের দেখতে পায়। নিয়ে আসে পোকায় খাওয়া, পোকাধরা গমের নমুনা। তদারকি কমিটি ৪৪ কোটি টাকা মূল্যের এই গম গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেয়।

ফলে বিপাকে পড়ে গম আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ইমপেক্স কনসালটেন্ট লিমিটেড। তারা খাদ্য বিভাগের উর্ধতন কর্মকর্তাদের দিয়ে প্রথমে মংলা বন্দর আমদানিকৃত গম খালাস তদারকি কমিটির সদস্যদের ম্যানেজ করার চেষ্টা চালায়। তদারকি কমিটির সদস্যদের বলা হয় চট্টগ্রামে এই গম পরীক্ষায় রিপোর্ট ভাল এসেছে, সাড়ে একত্রিশ হাজার মেট্রিক টন গম সেখানে খালাসও হয়েছে। তোমাদের এই গম গ্রহণ করতে আপত্তি থাকার তো কথা নয়। এই গম পুনঃ পরীক্ষার জন্য নমুনা ঢাকায় পাঠায়। এভাবেই মংলা বন্দর থেকে গম খালাসের চেষ্টা চালাতে থাকে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ইমপেক্স কনসালটেন্ট লিমিটেড। এখনও ওই গম খাদ্য বিভাগের উর্ধতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে দ্রুত মংলা বন্দর দিয়ে খালাসের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

আমদানিকৃত গম খালাস তদারকি কমটির আহ্বায়ক খুলনার আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক কাজী নূরুল ইসলাম সোমবার জানান, নিম্নমানের এই গমবাহী জাহাজ এমভি পিনটেল বর্তমানে মংলা বন্দরের অদূরে পশুর নদীর হারবাড়িয়ায় অবস্থান করছে। এই জাহাজের খাবার অনুপযোগী গম কোন অবস্থাতেই গ্রহণ করা হবে না। এই গম মানবদেহের জন্য উপযোগী নয়। তবে এই গম পশু বা মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। জাহাজে থাকা এই গমের মূল্য প্রায় ৪৪ কোটি।

মংলা বন্দর আমদানি গম খালাস তদারকি কমিটির অন্যতম সদস্য ও সিএসডি গোডাউন ম্যানেজার আব্দুল মান্নান তালুকদার জানান, গম ফের পরীক্ষার জন্য নমুনা ঢাকায় পাঠাতে বলা হয়েছে। জাহাজটির স্থানীয় এজেন্ট লিডমন্ড শিপিং-এর পরিচালকরাও এই খাবার অনুপযোগী গম আমদানিকারকদের অংশীদার। তারাও এর সঙ্গে জড়িত। তিনি জানান, জাহাজে থাকা ওই গম পোকায় খাওয়া ও পোকা ধরেছে।

এমভি পিনটেল জাহাজের স্থানীয় এজেন্ট লিডমন্ড শিপিংয়ের পরিচালক আক্তার হোসেন জানান, এতদিন আদালতের নির্দেশ থাকায় আমরা গম খালাস করতে পারিনি। ৬ মাস ধরে গম জাহাজে থাকায় গমে পোকা ধরা বিচিত্র কিছু না। তিনি স্বীকার করেন মংলায় খালাসের অপেক্ষায় থাকা গমের মধ্যে ২/৩ টন গমে পোকা ধরেছে। এ গমে ডাস্ট একটু বেশি, তবে খাবার উপযোগী। ঢাকা থেকে গমের এ নমুনা পরীক্ষায় তার দেয়া তথ্যের সত্যতা মিলবে বলেও তিনি দাবি করেন। এই জাহাজটিতে ১৯জন ক্রু’র মধ্যে বেশিরভাগই জর্জিয়ার নাগরিক বলে জানান।

মংলা বন্দর আমদানিকৃত গম খালাস তদারকি কমিটির অন্যতম সদস্য খাদ্য চলাচল ও নিয়ন্ত্রক নকীব সাদ সাইফুল ইসলাম, গম ফের পরীক্ষার জন্য নমুনা ঢাকায় পাঠাতে বলেছে। তিনি জানান, খাদ্য বিভাগের মহাপরিচালক এই গম সম্পর্কে ব্রিফিং করে বিস্তারিত জানাবেন। প্রাথমিকভাবে তাদের মনে হয়েছে আমদানিকৃত গমের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় ওই গম খালাস বন্ধ রাখা হয়েছে। তিনি জানান, লিডমন্ড শিপিং এজেন্টের পরিচালকরাও আমদানিকারকদের পার্টনার। আমদানিকৃত গম খালাসের আগে সেটি পরীক্ষার জন্য একজন বিদেশী বিশেষজ্ঞ চট্টগ্রামে অবস্থান করতেন। তবে দুই বিদেশী হত্যাকা-ের পর তিনিও তার দেশে চলে গেছেন। এই কারণে চট্টগ্রামে এই গম পরীক্ষার নামে কি হয়েছে তা বলা কঠিন। এই গম পোকায় বেশিরভাগ অংশ খেয়ে ফেলেছে। তাদের চোখে আমদানিকৃত গম ভাল না বলে এই কর্মকর্তা দাবি করেন। সে কারণে গম গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আমদানিকৃত গম খালাস তদারকি কমিটি।