২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

হাতিরঝিলে অরাজকতা-অবৈধ মাইক্রো ও অটোস্ট্যান্ড

হাতিরঝিলে অরাজকতা-অবৈধ মাইক্রো ও অটোস্ট্যান্ড

জনকণ্ঠ রিপোর্ট ॥ নানা অরাজকতা চলছে হাতিরঝিল প্রকল্প ঘিরে। অনুমোদন ছাড়াই মাইক্রোবাস টার্মিনাল গড়ে উঠেছে। দিব্যি এসব মাইক্রোসহ অটোরিক্সায় যাত্রী পরিবহন হচ্ছে সব সময়। নম্বরবিহীন অনেক পরিবহন চলছে প্রশাসনের নাকের ডগায়। অথচ বলার বা দেখার যেন কেউ নেই। অবৈধভাবে যাত্রী পরিবহন করায় বেড়েছে সড়ক দুর্ঘটনাও। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে একটি সুবিধাভোগী চক্র মাইক্রোবাসে যাত্রী পরিবহনের রমরমা বাণিজ্য চালাচ্ছে দিনের পর দিন। তবে রাজউক কর্তৃপক্ষ বলছে, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। মূল প্রকল্প বুঝে পাওয়ার পর সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে বলেও মনে করেন তারা।

কথা ছিল পানি হবে স্বচ্ছ। পানিতে বেড়ানোর জন্য চালু হবে ওয়াটার বোট। হবে বিনোদন কেন্দ্র। বিশাল গ্যালারি। বাস্তবে এর কোন কিছুই এখন পর্যন্ত হয়নি। যা হয়েছিল তাও যেন যাচ্ছে রসাতলে। ময়লা পানির দুর্গন্ধে এলাকায় এখন ঘুড়ে বেড়ানো দায়। নাকে রুমাল গুঁজে পথ চলতে হয়। পুরো এলাকা অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। ছিনতাই, চুরির ঘটনা ঘটছে অহরহ। মানুষ হত্যার নিরিবিলি স্থান হিসেবে এই এলাকাটি বেছে নিয়েছে সন্ত্রাসীরা। অবৈধ পার্কিং, গাড়ি ধোয়া মোছা, ময়লা ফেলা, ড্রেনের পানি পড়া সবকিছুই চলছে। লেকের পানিতে গোসল করা, হাঁস পালন হচ্ছে। গবাদিপশু চড়ানো হচ্ছে প্রকল্পের বিভিন্ন প্রান্তে।

এদিকে পরিকল্পিত অবকাঠামো গড়ে না ওঠায় শেষ পর্যন্ত স্বপ্নপূরীর আদলে প্রকল্পটি রক্ষা করা সম্ভব কিনাÑ এ নিয়েও সন্দেহ দেখা দিয়েছে। ময়লা-আবর্জনা আর স্যুয়ারেজের পানিতে এখন একাকার লেকের পুরো অংশ। পানির রং আলকাতরার মতো। কচুরিপানা জমেছে বিভিন্ন পয়েন্টে। কাওরান বাজারের একশ্রেণীর মাছ ব্যবসায়ী তাদের ব্যবসার কাজে প্রকল্পের বিভিন্ন অংশ ব্যবহার করছে। অবাধে মাছ শিকার চলছে ঝিল থেকে।

রামপুরা থেকে মাইক্রো সার্ভিস ॥ হাতিরঝিল প্রকল্পের রামপুরা অংশ থেকে বেগুনবাড়ি সিগন্যাল পর্যন্ত মাইক্রোবাসে করে যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে প্রতিদিন। প্রকল্পের দু’অংশে এসব পরিবহন চলাচলে রীতিমতো স্ট্যান্ড করা হয়েছে। সারিবদ্ধভাবে রাখা হয় মাইক্রো ও অটোরিক্সা। অটোরিক্সার বেশ কয়েকটি প্রাইভেট লেখা। দূরে থাকেন চালকরা। খোলা থাকে গাড়ির ডালা। যাত্রী ভড়া মাত্রই আসনে বসেন চালক। দ্রুত স্থান ত্যাগ করে অন্যপাশে গিয়ে সিরিয়াল নেন। পাশাপাশি সংঘবদ্ধ চাঁদাবাদ চক্রও আছে টার্মিনাল ঘিরে।

অবৈধ এই পরিবহন বাণিজ্যের সিন্ডিকেটের মূল হোতার নেতৃত্বেই মূলত চলছে প্রায় ৩০টি গাড়ি। জনপ্রতি ভাড়া ২০ টাকা। সকালে ও বিকেলে যাত্রী বেশি। গাড়ি কম। তাই এসব পরিবহনের চাহিদা অনেক। যাত্রীরা বলছেন, হাতিরঝিল দিয়ে যাতায়াতের জন্য সাধারণ মানুষের কোন ব্যবস্থা নেই। রামপুরা থেকে মালিবাগ হয়ে কারওয়ান বাজার আসতে সময় লাগে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা। হাতিরঝিল হয়ে আসলে সময় লাগে ১০ মিনিটেররও কম। ভাড়া একটু বেশি গেলেও এতে কারও অভিযোগ নেই। সব মিলিয়ে যাত্রী পরিবহনের নামে প্রতিমাসে আয় হচ্ছে কোটি টাকার বেশি।

প্রকল্প এলাকায় সেনা সদস্য, আনসার থেকে শুরু করে টহল পুলিশ থাকলে এসব বিষয়ে কারও কোন বক্তব্য নেই। সেনা সদস্যরা এ নিয়ে একেবারেই মুখ খুলতে নারাজ। তারা বলছেন, উচ্চ পর্যায়ের কর্তাব্যক্তি ছাড়া মিডিয়ার সঙ্গে কথাবলা নিষেধ। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউক চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন ভূঁইয়া সাংবাদিকদের বলেন, প্রকল্পের কাজ এখনও শেষ হয়নি। পুরো প্রকল্পটির কাজ শেষ হলে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। কোন অনিয়ম থাকবে না। তাই মাইক্রো বাসস্ট্যান্ডের বিষয়টি খোঁজ নেয়া হচ্ছে। যদি অবৈধভাবে যাত্রী পরিবহন করা হয় তাহলে পুলিশ ও বিআরটিএ-কে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হবে বলে জানান তিনি।

জানা গেছে, একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের ১৫ থেকে ২০ জন মাইক্রোবাস চলাচলের পুরো বিষয়টি দেখাশোনা করছেন। পার্শ¦বর্তী ৬টি থানাকে মোটা অঙ্কের মাসোহারাও দিচ্ছেন। একাধিক ড্রাইভারে সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে গুলশান, বাড্ডা, রামপুরা, রমনা, তেজগাঁও ও তেজগাঁও শিল্প থানাকে ম্যানেজ করে অনৈতিকভাবে মাইক্রোবাস চলছে এ এলাকায়।

তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, মাইক্রোবাসগুলো বেআইনীভাবে চলছে বলেই নানা জনের কাছে নানা ভাবে জবাবদিহিতা করতে হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গাড়িই এ রোডে চলছে। আমরা মহাজনরা মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি সরকার থেকে যদি মাইক্রোবাস চলাচলে কোন অনুমোদন নিতে পারি তাহলে গাড়ি চলবে, নতুবা একসঙ্গে সব মাইক্রোর চলাচল এ রাস্তায় বন্ধ করে দেব। মোঃ সিকান্দর নামক একজন ড্রাইভার জনকণ্ঠকে বলেন, অবসর সময়ে এ রাস্তায় গাড়ি চালাই। নিজের দুটো গাড়ি চলাচল করে, তা দেখাশুনা করি। দিনে গড়ে আয় হয় ৭’শ থেকে ৮’শ। বড় কথা যাত্রীরা সন্তুষ্ট।

রামপুরা পুলিশ প্লাজা কনকর্ডের সামনে কথা হয় রাজন নামক একজন ড্রাইভারের সঙ্গে। তিনি বলেন, কিছু করে খেতে হয়, তাই গাড়ি চালাই। না খেয়েতো থাকতো পারবো না। ওই সিগন্যালে কর্মরত আনসার মিজান বলেন, অনৈতিক হলে কি হবে! পুলিশ দেখার পরেও তো কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না। প্রায় সব সময়ই যাত্রী পরিবহনে এ রাস্তায় মাইক্রো চলাচল করছে।

প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ॥ হাতিরঝিল প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ। এ ছাড়াও জলাবদ্ধতা, বন্যা প্রতিরোধ, ময়লা পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, রাজধানীর যানজট নিরসনসহ সৌন্দর্য বৃদ্ধি। এসব লক্ষ্যকে সামনে রেখে ঝিলের চারদিকে ওয়াকওয়ে নির্মাণ, ওভারপাসসহ প্রকল্পের চারদিকে পূর্ব-পশ্চিম সড়ক নির্মাণ করা। লেকের এপাড় থেকে ওপাড়ে যেতে থাকবে দৃষ্টিনন্দিত সেতু, নজরকাড়া বাহারি জলফোয়ারা, সিঁড়ি। বিনোদনের জন্য থাকবে সাংস্কৃতিক কেন্দ্রসহ শিশুপার্ক। পর্যটকদের নামাজ আদায়ের জন্য থাকবে মসজিদ। পালতোলা নৌকায় নৌবিহার করারও সুবিধা রাখার কথা আছে এই প্রকল্পে। সবকাজ শেষ হলে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই রামপুরা থেকে কাওরানবাজার বা কাওরানবাজার থেকে গুলশান হয়ে বাড্ডা এলাকায় পৌঁছা যাবে। এতে রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আসার কথা। কমবে যানজট। রাজধানীর মানুষের নান্দনিক সৌন্দর্যের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হাতিরঝিল প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০০৭ সালে।

রক্ষণাবেক্ষণের অর্থ আসবে প্রকল্পের আয় থেকে ॥ কথা ছিল প্রকল্পের আয় থেকেই পরিচালন ব্যয় তোলা হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত আয়ের কোন উৎস চালু হয়নি। তাই হাতিরঝিল প্রকল্পে রক্ষণাবেক্ষণের কোন অর্থ রাখা হয়নি। আয়ের প্রস্তাবিত উৎসের মধ্যে রয়েছে এমপি থিয়েটার থেকে আয়, কার পার্কিং, টোল আদায়সহ অন্যান্য নাগরিক সুবিধা। তবে আয়ের উৎসের কোনটিই এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

বালু নদীতে যাবে হাতিরঝিলের বর্জ্য ॥ হাতিরঝিলের পানি সারাবছরেই থাকবে স্বচ্ছ। প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে ঝিলের পানিতে ময়লা, আবর্জনা জমে থাকার কোন সুযোগ নেই। কারণ লেকের বর্জ্য পৃথক লাইন দিয়ে বালু নদীতে ফেলে দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। তবে বর্জ্য অপসারণের জন্য লাইন টানার কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু ময়লা পানি লেকে মিশছে ২৪ ঘণ্টা। বিশেষ করে বাংলামোটর এলাকায় কালভার্টের ময়লা ও কালো পানি হাতিরঝিলে গিয়ে মিশছে অবিরাম।