১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দুর্গাপূজা, মহরম ও যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে নিরাপত্তা জোরদার

গাফফার খান চৌধুরী ॥ দুর্গাপূজায় এক অন্যরকম পরিবেশ চোখে পড়ল সোমবার রাজধানীর গুলশান-বারিধারা ও বনানী ঘুরে। বিশেষ করে বনানী পূজাম-প ঘিরে রীতিমতো আমেজ শুরু হয়েছে। দেশী-বিদেশীসহ সব ধরনের মতভেদ ভুলে অনেকেই দেখতে যাচ্ছেন বনানী পূজাম-প। ম-প চত্বরে চলছে শুভেচ্ছাবিনিময়। কূটনৈতিক জোন হিসেবে পরিচিত এসব এলাকায় নির্বিঘেœ বিদেশীরাও ঘুরে বেড়াচ্ছেন। পূজার আমেজে তারাও আনন্দিত। তারা তাঁদের কাজ করছেন নির্বিঘেœ। তাঁদের চলাফেরায় ন্যূনতম কোন অস্বস্তি লক্ষ্য করা যায়নি। দ্রুত কাজ সেরে তাড়াহুড়ো করে শঙ্কিত বা আতঙ্কিত বা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে বিদেশীদের অন্যত্র চলে যাওয়ার কোন লক্ষণও চোখে পড়েনি। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ৫ বিদেশিনীকে রীতিমতো হেসে খেলে মজা করতে করতে বনানী পূজাম-প ঘুরে হেঁটে চলে যেতে দেখা গেল। তারা কানাডা ও কোরিয়ার নাগরিক বলে সেখানে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকারা জানিয়েছেন। কানাডিয়ান দূতাবাসের সামনে দেশী-বিদেশী একাধিক ব্যক্তি অবলীলায় বলছিলেন, তারা নিরাপত্তা নিয়ে মোটেই শঙ্কিত নন। অধিকাংশ বিদেশী বাংলাদেশে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হওয়ার মতো কোন কারণ আছে বলে মনে করেন না বলে বিদেশীদের বরাত দিয়ে জানালেন কূটনৈতিক জোনে দায়িত্বরত এবং নানাভাবে বিদেশীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরাও।

এক ইতালীয় খুনের পর এসব এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে চোখে পড়ার মতো। প্রতিটি রাস্তার বাতি ঠিক করা হয়েছে। সন্ধ্যা হওয়ার আগেই রাস্তার বাতি জ্বালানো হয়। নিরিবিলি রাস্তায় পর্যাপ্ত গোপন সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্বনরের বাড়ির চারদিকে অতি উজ্জ্বল সার্চ লাইট, প্রচুর সিসি ক্যামেরা, অতিরিক্ত পুলিশ, র‌্যাব ও আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এমন নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে কূটনীতিকপাড়ার সব রাস্তায়ই। রাস্তার মোড়ে মোড়ে বসানো হয়েছে বাড়তি চেকপোস্ট।

যদিও দুর্গাপূজা, মহরম ও যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে সারাদেশেই নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। দেশব্যাপী আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযানও চালাচ্ছে। দুর্গাপূজা উপলক্ষে বিশেষ নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে রয়েছে রাজধানীর গুলশান-বনানী-বারিধারা ও উত্তরা। এসব এলাকায় বিদেশীদের বসবাস অপেক্ষাকৃত বেশি হওয়ায় এমন ব্যবস্থা।

সোমবার বেলা সাড়ে ১১টায় র‌্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ বনানী মাঠে স্থাপিত পূজাম-প পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে তিনি সাংবাদিকদের জানান, সম্প্রতি দুই বিদেশী হত্যার ঘটনা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এ জন্য এবারের নিরাপত্তা থাকছে কঠোর। শুধু বিদেশী নন, সর্বসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের ভিত্তিতে কাজ করছে র‌্যাব। এবার সারাদেশে ২৮ হাজার ৭৩টি পূজাম-পে পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে র‌্যাব নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। পোশাকধারী ও সাদা পোশাকে র‌্যাবের সদস্যরা কাজ করে যাচ্ছেন। কোন ধরনের নাশকতার আশঙ্কা নেই। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে র‌্যাব অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। ডগস্কোয়াড, বম্ব ডিজপোজাল টিম, স্ট্রাইকিং ফোর্স, মোবাইল টহলসহ নানা ধরনের নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। সর্বক্ষণিক র‌্যাবের হেলিকপ্টার প্রস্তুত রয়েছে। শহরে প্রবেশ ও বাহির হওয়ার পথগুলোতে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। প্রতিমা বিসর্জনের দিন রাস্তা, জলাশয়, খাল ও নদী ঘাটসমূহে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকছে। নৌ টহল থাকবে। গুরুত্ব বিবেচনা করে অনেক ম-পে কন্ট্রোলরুম স্থাপন করা হয়েছে। এর আগে র‌্যাবের ডগস্কোয়াড পুরো এলাকায় তল্লাশি চালায়। পূজাম-পে প্রবেশের রাস্তায় আর্চওয়ে মেটাল ডিটেক্টর বসানো হয়েছে।

পরে সাংবাদিক সন্তোষ শর্মার উপস্থাপনায় গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজা পরিষদ ও গুলশান বিভাগের উপকমিশার এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে পূজার আনুষ্ঠানিকতা এবং নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলেন। পরিষদের সভাপতি সুভাষ চন্দ্র ঘোষ বলেন, ২০০৮ সাল থেকে বনানী মাঠে খুবই জাঁকজমকপূর্ণভাবে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এবারও কোন নাশকতার আশঙ্কা করছি না। কোন চাঁদাবাজি বা আগতদের কেউ কোন প্রকার হয়রানির শিকার হননি। ঢাকার যে ৭টি পূজাম-পকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে, তার মধ্যে এটিও একটি। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁরা দেখা করেছেন। সার্বিকভাবে সহায়তা করায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ধন্যবাদ জানান তিনি।

সাধারণ সম্পাদক সুধাংশু কুমার দাশ বলেন, নিরাপত্তা নিয়ে তারা ন্যূনতম চিন্তিত নন। কারণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। সরকারের সব সংস্থা তাদের সঙ্গে সর্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে।

গুলশানের উপকমিশনার একেএম মোস্তাক আহমেদ খান বলেন, সব ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। সর্বস্তরের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা থাকছে। সংবাদ সম্মেলনে পূজা উদ্যাপন কমিটির নেতা ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব মনোজ সেনগুপ্তসহ পূজা উদ্যাপন কমিটির নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। মনোজ সেনগুপ্তের সার্বিক সহযোগিতায় এবার প্রথমবারের মতো মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগর থানাধীন নাগরনন্দির ঘোষবাড়িতে জাঁকজমকপূর্ণ পূজা উদ্যাপিত হচ্ছে।

এর আগে গত রবিবার ডিএমপি কমিশনার মোঃ আছাদুজ্জামান মিয়া এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে জানান, সার্বজনীন শারদীয় দুর্গোৎসবে সর্বসাধারণের মতো বিদেশীরাও নির্বিঘেœ যাতায়াত করতে পারবেন। আতঙ্কিত হওয়ার ন্যূনতম কোন কারণ নেই। বিদেশীদের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তরফ থেকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। বিদেশীরা স্বেচ্ছায় নিরাপত্তা না চাইলেও তাঁদের নিরাপদে দুর্গোৎসব উপভোগ করতে সব ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। প্রসঙ্গত, রবিবার থেকে শুরু হয়ে আগামী ২৩ অক্টোবর প্রতিমা বির্সজনের মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছে সার্বজনীন শারদীয় দুর্গোৎসব। আগামী ২৩ অক্টোবর প্রতিমা বিসর্জন ও মহরমের আশুরার দিন হওয়ায় ওইদিন দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত বিজয়াদশমী ও তাজিয়া মিছিল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এবার ঢাকায় ২২২টি ম-পে পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর ওয়াইজঘাট ও আশুলিয়ার বিআইডব্লিউটিএ-এর ল্যান্ডিং ঘাটে অধিকাংশ প্রতিমার বিসর্জন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এসব এলাকায় স্থাপিত ওয়াচ টাওয়ার থেকে বিসর্জনের সার্বিক পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা হবে। বিসর্জনের জায়গাগুলোতে প্রচুর পরিমাণ ডুবুরি থাকছে। যাতে প্রতিমা বিসর্জনের সময় কেউ ডুবে গেলে তাকে দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব হয়।