২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

স্বপ্নবাজ তারুণ্যের সম্ভাবনা!

  • অদম্য তরুণদের মজার ইস্কুল

আজ থেকে ৮ বছর আগে মজার ইশকুল শুরু হয়েছিল পথশিশু ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার আলো দেখানোর উদ্দেশ্য নিয়ে। আজ সেখানে ১৩টি স্কুল ও ১৮০০ শিক্ষার্থী। পথশিশুদের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের লক্ষ্যে এই অসাধারণ উদ্যোগ শুরু করেছিল কিছু উদ্যমী তরুণ মিলে। নিজেদের হাত খরচের টাকা বাঁচিয়ে পরম মমতায় শুধু পড়িয়েই ক্ষান্ত হয়নি তারা, পাশাপাশি শেল্টারও দিয়েছিল। তাদের দেখে আরও শত শত তরুণ অনুপ্রাণিত হয়েছে দেশের জন্য ভাল কিছু করার। ‘সকল শিশু পড়তে শিখুক, জীবনটাকে গড়তে শিখুক’-এই ব্রত নিয়ে সুবিধাবঞ্চিত, ঝরে পড়া, শ্রমজীবী ও পথকলি শিশুদের লেখাপড়া শেখানোর জন্য ‘মজার স্কুল’ নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু হয়েছিল। শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেয়ার জন্য চারজন স্বপ্নদ্রষ্টা নিজের উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় এলাকার স্কুলগামী পথকলি শিশুদের লেখাপড়া শেখানোর জন্য এই ব্যতিক্রমী ‘মজার স্কুল’টি গড়ে তোলে। নিজেরা পকেটের টাকা দিয়ে এই স্কুলটি পরিচালনা করেছেন এবং স্কুলের শিক্ষার্থীদের খাতা-কলমসহ শিক্ষাসামগ্রী তারা নিজেরাই ক্রয় করে দেন। ঢাকা শহরের এসব যুবক ছেলে তাদের চা-সিগারেটের খরচ বাঁচিয়ে, সেই টাকা দিয়ে রাস্তার ছেলেমেয়েদের পড়ায়, তাদের খাওয়ায়, তাদের বই কিনে দেয়। একদল মেয়ে তাদের হাত খরচের টাকা থেকে এসব পথশিশুর নিজের সন্তান জ্ঞান করে যতœআত্তি করে। এরকম কয়েক শত ভলান্টিয়ার মিলে এই মজার স্কুল দেখভাল করে। যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্বপ্নবাজ তরুণ- আরিফ আরিয়ান, হাসিব, জাকিয়া। বিদেশ থেকে তারা একটি পয়সাও নেয়নি। সম্পূর্ণ নিজেদের অর্থায়নে তারা এটি চালাত।এদের প্রধান আরিফ আরিয়ান। সে কম্পিউটার সায়েন্স এবং ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে গ্রাজুয়েশন করা। নিজের ক্যারিয়ার ভুলে গিয়ে সে দিনরাত বাচ্চাদের পেছনে লেগে থাকত। জাকিয়া এই টিমের অন্যতম সদস্যা। ওরা দুই বোন। টাকার অভাবে নিজের ছোট বোনের পড়ালেখা বন্ধ। তবু এই জাকিয়া মেয়েটা পথের বাচ্চাদের বুকে টেনে নিয়েছিল। নিজের টিউশনির টাকা থেকে এসব বাচ্চা সে পড়াশোনা করাত, বই কিনে দিত। রাস্তায় যেসব বাচ্চাকে দেখলে আমাদের মতো ভদ্রলোকের গা ঘিন ঘিন করে, জাকিয়া তাদের নাকের ময়লা নিজ হাতে মুছে দিত। একদম শিশু বাচ্চাদের বাথরুম ট্রেনিংটিও সে করাত। কিছু কিছু মেয়ে মা হিসেবেই জন্মায়, জাকিয়া হচ্ছে এই ধরনের মেয়ে।

নাফিসের সম্মাননা শুধুই বাংলাদেশের

অস্কার এ্যাওয়ার্ডের সবচেয়ে সম্মানিত পদকের সঙ্গে দ্বিতীয়বারের মতো যুক্ত হয়েছিল বাংলাদেশী কৃতী সন্তান কাজী নাফিস-বিন জাফর। এই বুদ্ধিদীপ্ত তরুণ রাজবাড়ী জেলার কাজী জাফর-বিন বাশারের একমাত্র পুত্র। নাফিস ২০০৮ সালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্যাটাগরিতে অস্কার এ্যাওয়ার্ড পেয়েছিল। একাডেমি অব মোশন পিকচার আর্টস এ্যান্ড সাইন্সেস-এর এই সম্মাননা এ্যাওয়ার্ড বাংলাদেশের ছেলে নাফিস বিন জাফরের সাথে আলোকিত করেছিল যেন পুরো বাংলাদেশকে। ৭ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় আয়োজিত এই বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের ৫৮ জন হলিউড প্রযুক্তি উদ্ভাবকের মধ্যে বাংলাদেশের নাফিস ছিলেন অন্যতম। প্রতিবছর অস্কার আয়োজনের আগেই এ পুরস্কার তুলে দেয়া হয় হলিউডের সেরা প্রযুক্তিবিদের মধ্যে। নাফিস চলচ্চিত্রে প্রয়োগ উপযোগী প্রযুক্তি ‘ড্রপ ডেস্ট্রাকশন টুলকিট’ উদ্ভাবনের জন্য এই সম্মানে ভূষিত হয়েছিল। নাফিসের মায়ের পরিবারের রয়েছে বিশাল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। তার মামা একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রয়াত স্থপতি সৈয়দ মইনুল হোসেন (জাতীয় স্মৃতিসৌধের স্থপতি)। নাফিসের নানা বিখ্যাত পাপেট শিল্পী টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব মুস্তাফা মনোয়ার, তার মায়ের নানা কবি গোলাম মোস্তফা এবং দাদা কবি সৈয়দ এমদাদ আলী। তবে নাফিস অস্কার পেয়েছিল ‘ড্রপ ডিস্ট্রাকশন টুলকিট ইন হলিউড মুভি ২০১২’ সিনেমার জন্য। এটি তার নিজস্ব সৃষ্টি। ড্রপ ডিস্ট্রাকশন টুলসের জন্য ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট বিভাগের পুরস্কার এটি। এ আইডিয়াটা প্রথম ব্যবহার করেন ২০০৯ সালে। পরবর্তীতে ২০১২ সালে ‘টু থাউজেন্ড টুয়েল্ভ’ নামে এ ছবিতে ভিজ্যুয়াল এফেক্ট প্রয়োগ করে সিনেমা জগতে নতুন ডাইমেনশন সৃষ্টি করে সাড়া ফেলে দেন গোটা আমেরিকায়। লেখাপড়া শেষে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দেন মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ক্যারোলিনায়। এর দু’বছর পর চলে যান স্পেশাল এফেক্ট তৈরির জন্য বিখ্যাত জেমস ক্যামেরনের ডিজিটাল ডোমেইনে। ২০০০ সাল থেকে তিনি যুক্ত হন সিনেমা জগতের সঙ্গে। এরপর তাকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। বর্তমানে তিনি সাংহাইয়ে একটি বিখ্যাত এমিনেশন ওয়ার্কসের প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করছেন।

সেলুলয়েড স্বপ্নে বাধা জামসেদুর রহমান

‘স্বপ্ন আর ইচ্ছের সমন্বয় বড্ড ভয়াবহ! কারণ এটাকে দমিয়ে রাখা অসম্ভব। এটা এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি, যা সবার থাকে না। যার আছে, তাকে বলব এটার সঠিক ব্যবহার করো।’-এই কথাটি তরুণ ফিল্মমেকার জামসেদুর রহমান সজীব মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন। ছোট্ট শহর রাজবাড়ীর আলোবাতাসে বেড়ে ওঠা অদ্যমী আর সদা প্রত্যয়ী তরুণ ফিল্মমেকার সজীব কাছের কিছু তরুণকে নিয়ে গড়ে তোলেন ‘আলটিমেট ক্রিমারস’ নামে ফিল্ম প্রডাকশন হাউস। এই তরুণ তুর্কীর অনুপ্রেরণায় নিজ জেলার মানুষ আজ নতুন অভিজ্ঞতার আলোকে উদ্ভাসিত হচ্ছে। এরই মধ্যে এই তরুণ নির্মাণ করেছেন অসংখ্য স্বল্পদৈর্ঘ্য ফিল্ম, যা সকলের নিকট গ্রহণীয় ও প্রশংসিত হয়েছে।

২০১৪ সালে ‘রাজবাড়ী মিডিয়া পিপলস’-এর আয়োজনে প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য ফিল্ম উৎসবে তার তৈরি একাধিক ফিল্ম প্রদর্শিত হয়েছে এবং সকলের নিকট সমাদৃত হয়েছে। এ ছাড়া ‘রাজবাড়ী মিডিয়া পিপলস’-এর পরবর্তী স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজনে তার কিছু নতুন ফিল্ম প্রদর্শন হওয়ার অপেক্ষায় আছে। তারেক মাসুদ চলচ্চিত্র উৎসবে তার শর্টফিল্ম ‘অনুপ্রেরণা’ সকলের মধ্যে সাড়া ফেলে দেয়। গত ২৯ আগস্ট মতিঝিলের আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজে অনুষ্ঠিত ৮ম ইস্টারক বিজ্ঞান মেলায় ভিডিওগ্রাফি কন্টেস্টে তার নির্মাণ ‘ভূতের রহস্য’ প্রথম স্থান অর্জন করে। এছাড়াও সম্প্রতি ম্যুভিয়ানা ফিল্ম সোসাইটি এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি যৌথভাবে ‘নতুন চলচ্চিত্র, নতুন নির্মাতা’ প্রতিযোগিতামূলক চলচ্চিত্র উৎসব তার নির্মিত ‘ভূতের রহস্য’ তাকে নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়।

তবে এই তরুণ নিজেকে সংজ্ঞায়িত করে ভিন্নভাবে-‘আমি বড় কেউ না, খুব সাধারণ একজন, ছোটখাটো মানুষ। ফিল্ম আমাকে খুব টানে, আগ্রহের পুরোটা জুড়েই তাই কেবলই ফিল্ম। শর্টফিল্ম বানাই মাঝে মধ্যে, কাজ করি, কাজ শিখি। আমার শর্টফিল্মগুলো আহামরি ধরনের নয়, আমার মতোনই, সাধারণ। তবে যাদের নিয়ে কাজ করি, আমার টিম, সেটা অসাধারণ। আমার প্রত্যেকটি কাজের পরিসর খুব বেশি বড় হয় না, চেষ্টা করি স্বল্প পরিসরেই কাজ করার।’

‘ঘাসফুল’ মানবতা, সাহিত্য ও মননশীল জাগরণের সংগঠন

বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার মাধ্যমে প্রগতিশীল, কলুষমুক্ত ও শিল্পীত সমাজ বিনির্মাণে এগিয়ে যেতে পরিপূর্ণ ভালবাসা, সময়, শ্রম ও মেধার নির্যাস সঁপে দিতেই ‘ঘাসফুল’-এর কিছু নিঃস্বার্থ তরুণ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। দুস্থদের সাহায্য করা, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্থদের পাশে দাঁড়ানো, দরিদ্র মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তি প্রদান, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা ইত্যাদি ‘ঘাসফুল’ সংগঠনের প্রাথমিক পদক্ষেপ। মানুষের ইন্দ্রিয় দ্বারা জাগতিক বা মহাজাগতিক চিন্তা চেতনা, অনুভূতি, সৌন্দর্য ও শৈল্পিক মনোভাব প্রকাশের লিখিত রূপই সাহিত্য। শিল্পের সব সূক্ষ্ম বিষয় সাজাতে এবং সাহিত্যকে আধুনিকীকরণ ও সময়োপযোগী করার লক্ষ্যে তাদের ‘ঘাসফুল’ নামে একটি মাসিক সাহিত্যপত্রও আছে। সাহিত্যপত্রটি এপার-ওপার বাংলার নবীন-প্রবীণ লেখক-কবিদের এক অনন্য মেলবন্ধন। সাহিত্যজগতে বাংলার দেশীয় ঐতিহ্যকে একটি নতুন সুস্থ ধারায় বিকশিত করতে ‘ঘাসফুল’ সাহিত্যপত্র সৃষ্টিশীল নবীন লেখকদের সেরা লেখাগুলো প্রকাশ করতে অনবদ্য ভূমিকা পালন করছে। এখানে একদল তরুণ তাদের আকাশছোঁয়া স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে পথ হাঁটছে। সাথে রয়েছে বটবৃক্ষের মতো ছায়া দানকারী সুহৃদ বিজ্ঞজন। ‘সীমাবদ্ধতার অবসানে প্রারম্ভের আহ্বান’Ñএই সেøাগানকে ধারণ করে মাহাদি আনামের নেতৃত্বে কিছু উদ্যমী তরুণ দেশের বিভিন্ন দুর্যোগময় মুহূর্তে হাতে নেয় পথশিশুদের পড়ালেখার ভার, বন্যাদুর্গতদের কিংবা শীতার্তদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করে।

নির্বাচিত সংবাদ