২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

হারিয়ে যাচ্ছে জলাভূমি ॥ বাস্তুচ্যুত হতে চলেছে ২ কোটি মানুষ

হারিয়ে যাচ্ছে জলাভূমি ॥ বাস্তুচ্যুত হতে চলেছে ২ কোটি মানুষ
  • ২৭ বছরে তিন-চতুর্থাংশ বিলীন;###;হুমকির মুখে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম হাকালুকি হাওড়ের অস্তি¡ত্ব, মেলেনি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ;###;স্বতন্ত্র জীববৈচিত্র্যের ৩৭৩ হাওড়ের পরিবেশ- প্রতিবেশও বিপন্ন;###;জলবায়ু পরিবর্তন, নদী দখল, অপরিকল্পিত উন্নয়ন দায়ী

আনোয়ার রোজেন ॥ হেমন্তের শুরুতেই কোমর সমান হয়ে আসত কাঁহারের বিলের পানি। ওই পানিতেই ভোরবেলা আশপাশের কয়েক গ্রামের মানুষ দলবেঁধে পলো দিয়ে মাছ ধরত। এক যুগ আগেও এই সময়টাতে ছিল মাছ ধরার ধুম। কেবল বিলের মাছ দিয়েই অন্নসংস্থান হতো অনেক পরিবারের। শাপলা-শালুকে ভর্তি বিলের রূপও ছিল দেখার মতো। কিন্তু সেই সব দিন এখন অতীত। সেই বিলও আর নেই, তাই মাছও নেই। বিল মরে গেছে! ওখানে এখন ফসলি জমি। বিলপাড়ে গড়ে উঠেছে বসতি, দোকানপাট, মুরগির খামার। বিলের কোন চিহ্নই আর নেই! এভাবেই বিলের ‘স্মৃতিচারণ’ করলেন স্কুল শিক্ষক শামসুল ইসলাম। বিলের স্মৃতিচারণই বটে! কারণ কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ার ৩৩ একর আয়তনের কাঁহারের বিল শুধু নয়, দেশের এমন অসংখ্য ছোট-বড় জলাভূমির অস্তিত্ব বিলীন হয়েছে গত চার দশকে। প্রাপ্ত হিসাবমতে, গত ২৭ বছরে একটু একটু করে দেশের মোট জলাভূমির (হাওড়, বাঁওড়, বিল) প্রায় তিন-চতুর্থাংশই হারিয়ে গেছে। দিনে দিনে নষ্ট হচ্ছে বিদ্যমান জলাভূমির চরিত্র, প্রাকৃতিক সম্পদ ও অপার সৌন্দর্য। বিলুপ্ত হয়েছে ৩৯টি হাওড়। সংস্কার না করায় স্বতন্ত্র জীববৈচিত্র্য রয়েছে এমন ৩৭৩টি হাওড়ের পরিবেশ-প্রতিবেশও বর্তমানে মারাত্মকভাবে বিপন্ন। গুরুত্ব হারিয়ে হুমকির মুখে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম হাকালুকি হাওড়ের অস্তিত্ব। শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় সরকারীভাবে আবেদন করেও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মেলেনি হাকালুকির। গত ৭ অক্টোবর প্রকাশিত আন্তর্জাতিক গুরুত্বসম্পন্ন জলাভূমির ‘রামসার সাইটের’ সর্বশেষ তালিকায় বাংলাদেশ থেকে ঠাঁই হয়েছে কেবল টাঙ্গুয়ার হাওড় ও সুন্দরবনের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রাকৃতিক জলাভূমি রক্ষার কোন বিকল্প নেই। জলাভূমি সংরক্ষণে আইন আছে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে নেয়া হয়েছে সংস্কারের উদ্যোগ। তবে এগুলোই যথেষ্ট নয়। প্রাকৃতিক আধারের বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে দেশে জলাভূমির বিজ্ঞানসম্মত কোন ডাটাবেসই এখনও পর্যন্ত তৈরি করা হয়নি। হাওড় রক্ষায় ২০ বছর মেয়াদী মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ করা হলেও সেটি বাস্তবায়নে চলছে ধীরগতি। দেশের প্রায় দুই কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা এসব জলাভূমির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দীর্ঘমেয়াদী বিকল্প কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা না থাকায় তাদের অধিকাংশই বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকির মধ্যে আছেন।

রামসার আন্তর্জাতিক সনদ অনুযায়ী জলাভূমি বলতে বোঝায়, নিচু ভূমি; যার পানির উৎস প্রাকৃতিক কিংবা কৃত্রিম। এর পানির স্থায়িত্বকাল সারাবছর অথবা মৌসুমভিত্তিক। সামুদ্রিক এলাকায় জলাভূমি বলতে ৬ মিটারের কম গভীরতাসম্পন্ন ভূমিকে বোঝায়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ১৯৮৮ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নদ-নদীর বাইরে বাংলাদেশের মোট আয়তনের শতকরা ৬ থেকে ৭ ভাগ জলাভূমির অন্তর্ভুক্ত। এ হিসেবে ওই সময় দেশে মোট জলাভূমির পরিমাণ ছিল কমপক্ষে ২১ লাখ ৫০ হাজার একর। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন, অপব্যবহার, দখল, ভরাটসহ নানা কারণে জলাভূমির পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেয়া সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, দেশের সর্বমোট জলাভূমি বা জলমহালের আয়তন ৫ লাখ ৭৪ হাজার ৩৫৬ একর। পরিবেশবিদদের মতে, বিশ্বব্যাপী গত শতকের সত্তরের দশক থেকে প্রাকৃতিক জলাভূমিগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের শিকার। তাই জলাভূমি সংরক্ষণের বৈশ্বিক গুরুত্ব অনুধাবন করে ২১টি দেশ ১৯৭১ সালে ইরানের রামসারে একটি সনদে সই করে। সনদ অনুযায়ী বাস্তু (ইকোলজি), উদ্ভিদ, প্রাণী, জলাভূমির বৈশিষ্ট্য (লিমিনোলজি) এবং জলজ বৈশিষ্ট্যের (হাইড্রোলজি) ঐতিহ্যের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক গুরুত্ব রয়েছে এমন জলাভূমির সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করবে দেশগুলো। বাংলাদেশ রামসার কনভেনশনে সই করে ১৯৯২ সালে। সুন্দরবনের সংরক্ষিত বনাঞ্চল (১৯৯২ সাল) এবং সিলেটের টাঙ্গুয়ার হাওড় (২০০০ সালে) রামসার তালিকার অন্তর্ভুক্ত।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে যাওয়ায় কমে যাচ্ছে হাওড়াঞ্চলের বিলগুলোতে পানির পরিমাণ। অনেক ক্ষেত্রে আশপাশের খাল-বিল ও নদী-নালা শুকিয়ে যাওয়াতেও বিলের পানি কমে গেছে। পলি পড়া ও দখলের কারণে গতি-প্রকৃতি পরিবর্তিত হয়ে অনেক বিল ভরাট হয়ে গেছে। কোথাও আবার অতিবৃষ্টির কারণে সৃষ্ট দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা নষ্ট করেছে বিলের পরিবেশ। তবে জলাভূমির সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে মানুষ। অপরিণামদর্শী উন্নয়ন প্রকল্প, দখল, অপরিকল্পিত মাছ আহরণ, বিলের পানিতে কীটনাশক ব্যবহারের কারণে দিনের পর দিন নষ্ট হয়ে চলেছে একের পর এক জলাভূমি। দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়ন করতে গিয়ে বাঁধ নির্মাণ, সøুইসগেট ও কালভার্টসহ বিভিন্ন প্রকল্প ধ্বংস করছে দেশের জলাভূমির বিশাল একটি অংশ।

ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশে অনুর্ধ ২০ একর আয়তনের জলমহাল রয়েছে ২৩ হাজার ১৬২টি। আর ২০ একরের উর্ধে মোট জলমহালের সংখ্যা মাত্র ৩ হাজার ১১৩টি। এসব জলমহালের (হাওড় এবং বাঁওড়ের মধ্যে থাকা বিল) বেশিরভাগই দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত জেলায় অবস্থিত, যা হাওড়াঞ্চল নামেই পরিচিত। আবার ২০ একরের উর্ধে শতাধিক জলমহাল আছে মাত্র ১১টি জেলায়। সবচেয়ে বেশি জলমহাল রয়েছে সুনামগঞ্জে (৪১৮টি)। এছাড়া হবিগঞ্জে ১৯৪টি, কিশোরগঞ্জে ১৭৯টি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১৭৮টি, সিলেটে ১৭৬টি, নেত্রকোনায় ১৬১টি এবং মৌলভীবাজারে ১৩৬টি বৃহদাকার জলমহাল আছে। এই অঞ্চলের বাইরে খুলনায় ১৬১টি, পটুয়াখালীতে ১৪০টি, যশোরে ১৩০টি এবং পাবনায় আরও ১১৫টি বৃহদাকৃতির জলাভূমি রয়েছে। খাগড়াছড়িতে কোন ধরনের জলাভূমি নেই। আর বান্দরবানে মাত্র একটি ও শরীয়তপুরে দুইটি প্রাকৃতিক জলাভূমি রয়েছে।

বিপন্ন হাওড়াঞ্চল ॥ দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত জেলার ৪৭টি উপজেলা নিয়ে হাওড়াঞ্চল গঠিত। এর মধ্যে সুনামগঞ্জে (৯৫), সিলেট (১০৫), হবিগঞ্জ (১৪), মৌলভীবাজার (৩), নেত্রকোনা (৫২), কিশোরগঞ্জ (৯৭) এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় (৭) মোট ৩৭৩টি হাওড় আছে। দেশের বৃহত্তম হাওড় হাকালুকি এবং একমাত্র আন্তর্জাতিক হাওড় টাঙ্গুয়ার এ অঞ্চলজুড়েই বিস্তৃত। হাওড় গবেষকরা বলছেন, নানামুখী কারণে বিভিন্ন হাওড় নিজেই বিপন্ন। হাওড়ের সংখ্যা ৪১২টি থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৩৭৩টিতে। হাওড়ের প্রকৃতি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর হুমকি নিয়ে হাজির হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে দেশের যে অভিন্ন ৫৭ নদী রয়েছে, তার ২৪টি হাওড়াঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত। হাওড় গবেষক ড. নিয়াজ পাশার তথ্য মতে, এসব নদী হাওড়ের মোট পানির ৬৭ শতাংশের যোগানদাতা, অবশিষ্ট পানি বৃষ্টির অবদান। তবে এমন একাধিক অভিন্ন নদীর উজানে নির্মিত বাঁধের কারণে শুষ্ক মৌসুমে হাওড়াঞ্চলের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহে বিঘœ ঘটছে। তাছাড়া প্রভাবশালীদের অবৈধ বালু উত্তোলন, দখল, নদী ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণও থেমে নেই। এসব কারণে নেত্রকোনায় সোমেশ্বরী, মহাদেও, লেঙগুরা, কংশ ও উবদাখালী, সুনামগঞ্জের যাদুকাটা, ধামালিয়া, উমিয়াম জালুখালি, বৌলাই, নওয়াগাং, সিলেটের সুরমা, কুশিয়ারা, পিয়াইন ও সারি; মৌলভীবাজারের মনু, ধলাই ও জুড়ি; হবিগঞ্জের খোয়াই, সোনাই, সুতাং এখন অর্ধমৃত এবং শাখা-প্রশাখার নদীগুলো প্রায় মৃত। ফলে হাওড়ের বিল, জলাশয়ও শুকিয়ে যাচ্ছে। আবার বর্ষাকালে বাঁধ খুলে দেয়ায় সৃষ্টি হচ্ছে আকস্মিক বন্যার। এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতি হাওড়ের জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। কুশিয়ারা-কালনী ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের জরিপের বরাত দিয়ে আরেক হাওড় গবেষক আখলাক হোসেইন খান জানিয়েছেন, গত শতকের শেষ দিকে সুরমা-কুশিয়ারা নদীর উৎসমুখে চর গজিয়ে ওঠায় বরাক নদ ও এর অববাহিকার পানি সুরমায় ২০ ভাগ ও কুশিয়ারায় ৮০ ভাগ প্রবাহের ফলে ভাঙন দেখা দেয়। এতে পাড় ভেঙ্গে ৫-৬ কোটি টন মাটি কুশিয়ারা নদীতে ভেঙ্গে পড়ে। এ মাটিতে নদীর তলদেশসহ উজান থেকে ভাটির ৬০ কিলোমিটার খাল-নালা ও জলাশয় ভরাট হয়ে যায়। স্বাভাবিক পানি প্রবাহ না থাকায় হবিগঞ্জের অন্তত ১০-১২টি হাওড়ে মরুকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি।

হুমকির মুখে হাকালুকি ॥ উপকূলীয় এবং জলাভূমির জীববৈচিত্র্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, হাকালুকি দক্ষিণ এশিয়ার হাওড়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড়। মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা এবং সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও গোলাপগঞ্জ উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন পরিবেষ্টিত এই হাওড়ের আয়তন প্রায় ৪৫ হাজার একর। জলজ জীববৈচিত্র্যের আধার এই হাওড়টিকে ‘রামসার সাইটে’ অন্তর্ভুক্ত করা পরিবেশবিদদের দীর্ঘদিনের দাবি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে পরিবেশ অধিদফতরের মাধ্যমে এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাবও ইরানের রামসার কনভেনশন সচিবালয়ে পাঠায় পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়। তবে প্রস্তাবটি কার্যকরের জন্য বিবেচিত হয়নি। গত ৭ অক্টোবর প্রকাশিত রামসার সাইটের সর্বশেষ তালিকায় জায়গা হয়নি হাকালুকির। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোঃ নুরুল করিম জনকণ্ঠকে বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। সংশ্লিষ্ট শাখার মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে জানার চেষ্টা করছি। রামসার সাইটের স্বীকৃতি পেতে বেশ কিছু টেকনিক্যাল শর্ত পূরণ করতে হয়। হতে পারে সব শর্ত পূরণ না হওয়ায় প্রস্তাবটি এখনও বিবেচিত হয়নি।

একাধিক জরিপ ও গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, গত ১৫ বছরে হাকালুকি হাওড়ের শতাধিক বিল ভরাট হয়ে গেছে। বেসরকারী সংগঠন পরিপ্রেক্ষিতের জরিপ মতে, হাওড়ের ২৮১টি বিলের মধ্যে সম্পূর্ণ ও আংশিক ভরাট হয়ে গেছে ১৩৩টি বিল। অপর একটি জরিপের মতে, হাওড়ের ২৫ ভাগের মতো নদী-খাল-বিল ইতোমধ্যে ভরাট হয়ে গেছে। এছাড়া যেগুলো আছে সেগুলোরও তলদেশ ভরাট হয়ে অনেকটা মরা খালে পরিণত হয়েছে। দিন দিন কমে যাচ্ছে হাওড়ের পানি ধারণক্ষমতা। ফলে হাওড়ে এখন অকালবন্যা, অতিবন্যাসহ ঘন ঘন প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে হাওড়ে যে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে তার অন্যতম কারণও এটি। জানা গেছে, হাওড় দিয়ে প্রবাহিত জুড়ী, ফানাই, সোনাই, কন্টিনালাসহ নদী, খাল, ছড়ার অস্তিত্বও বিলীন হওয়ার পথে। এর ওপর সম্প্রতি সোনাই নদের ওপর স্থগিত বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের অনুমতি দিয়েছে খোদ নদী রক্ষা কমিশন। এসবের বিরূপ প্রভাব পড়ছে হাওড়ের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর। হাকালুকির জীববৈচিত্র্যও নষ্ট হচ্ছে নানাভাবে। প্রতিবছর দূরদেশের অসহনীয় শীত থেকে বাঁচতে হাওড়ে আশ্রয় নেয়া বিভিন্ন প্রজাতির পরিযায়ী পাখিদের বিষটোপ দিয়ে হত্যা করা হয়। বিলের পানি শুকিয়ে নিধন করা হয় মা-মাছ ও পোনা মাছ। ইতোমধ্যে ৩২ প্রজাতির মাছ বিলীন হয়ে গেছে। সময়মতো বৃষ্টি না হওয়া এবং অতিবৃষ্টির কারণে বিভিন্ন প্রজাতির জলজ উদ্ভিদও বিপন্ন। অযাচিত সম্পদ আহরণের হরিলুটে প্রকৃতির এই ‘রতœ ভা-ার’ শূন্যে পরিণত হচ্ছে। দেশের অন্যান্য জেলার বিল-জলাশয়ের ক্ষেত্রেও অভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণা প্রতিবেদনে। রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলার বিশাল এলাকায় বিস্তৃত দেশের সবচেয়ে বড় জলাশয় চলনবিল সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। সারাবছর পানি থাকার কারণে একদা এটি ছিল বিভিন্ন প্রজাতির অভয়াশ্রম। তবে বড়াল নদীর উৎসমুখে নির্মিত সøুইসগেটের কারণে গত তিন দশকে ধ্বংস হয়েছে বিল এলাকার ফসল ও জীববৈচিত্র্য, উধাও হয়েছে মাছের আশ্রম।

এ প্রসঙ্গে গবেষক ড. নিয়াজ পাশা বলেন, মৎস্য আইনের বিভিন্ন শর্ত সাপেক্ষে হাওড়গুলোর বিল-জলাশয় বিভিন্ন মেয়াদে ইজারা দেয়া হয়। কিন্তু তদারকির অভাবে প্রায়ই আইন ভেঙ্গে মাছ ও অন্যান্য সম্পদ আহরণ করা হয়। জলমহাল অব্যবস্থাপনার জন্য স্থানীয় প্রশাসন, ভূমি, পরিবেশ ও মৎস্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। জলাভূমি সংরক্ষণের দায়িত্ব কোন একক মন্ত্রণালয়ের অধীন নয়। হাওড় ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ডকে অধিদফতর করা হলেও তাদের কার্যক্রম সীমিত। এ কারণে এ সংক্রান্ত সমন্বিত বৃহৎ কোন উদ্যোগও নেই। মৎস্য অধিদফতর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় ৩ কোটি ১৭ লাখ টাকা ব্যয়ে হাওড়াঞ্চলের ৪ জেলার ২৩ বিল পুনর্খনন কাজ শুরু করেছে। এছাড়া এই সময়ে মাত্র একটি জলাভূমি পুনর্খনন, সাতটিতে অভয়াশ্রম স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ, হাওড়াঞ্চলে ১৪টি অভয়াশ্রম, ২১৩টি বিল নার্সারি স্থাপন করতে পারছে। অধিদফতরের ওয়েবসাইট থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। এছাড়া পরিবেশ অধিদফতরও কয়েকটি প্রকল্পের মাধ্যমে জলাভূমি সংরক্ষণ ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে ঋণ বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলাভূমি সংরক্ষণে এসব উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নে সদিচ্ছা। ২০১২ সালে নেয়া হাওড় মাস্টারপ্ল্যান হতে পারে সেই মহাপরিকল্পনা। এ প্রসঙ্গে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) নির্বাহী সাধারণ সম্পাদক আবদুস সোবহান জনকণ্ঠকে বলেন, হাওড়াঞ্চলের প্রায় দুই কোটি মানুষ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষের তুলনায় দরিদ্র কিন্তু সম্পদে সমৃদ্ধ। যে মহাপরিকল্পনা হাওড় উন্নয়নে করা হয়েছে তার যথাযথ বাস্তবায়নে যেমন দারিদ্র্য দূর হবে তেমনি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখবে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত সেটি বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী মহাপরিকল্পনার নিয়মিত আপডেট করাও জরুরী। এ জন্য হাওড় ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদফতরকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন বলে মনে করেন এই পরিবেশবিদ।

নির্বাচিত সংবাদ