২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পাঁচ বছরে আট শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ॥ সপ্তম পাঁচশালা পরিকল্পনা অনুমোদন

  • ২০৪০ সাল পর্যন্ত প্রেক্ষিত পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ আগামী পাঁচ বছরে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে চায় সরকার। এজন্য প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিতকরণ, নাগরিকের ক্ষমতায়ন মূল প্রতিপাদ্য নিয়ে অনুমোদন দেয়া হয়েছে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে উন্নত দেশের ভিত রচিত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। মঙ্গলবার রাজধানীর শেরবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠকে এ অনুমোদন দেয়া হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও এনইসি চেয়ারপার্সন শেখ হাসিনা। পরিকল্পনার সার সংক্ষেপ উপস্থাপন করেন সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম।

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এ সময় অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান, পরিকল্পনা সচিব শফিকুল আজম, বাস্তবায়ন-পরীবিক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের সচিব শহীদ উল্লা খন্দকার, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য আরাস্তু খান, হুমায়ুন খালিদ ও গোলাম ফারুক উপস্থিত ছিলেন।

পরিকল্পনামন্ত্রী জানান, আগামী ২০২০ সাল থেকে ২০৪০ সাল পর্যন্ত এরও একটি প্রেক্ষিত পরিকল্পনা তৈরির জন্য নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চারটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার তৈরি ও বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে এ প্রেক্ষিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে বলেও বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্য দিয়ে উন্নত দেশে যাওয়ার যে স্বপ্ন তা পূরণ হবে। এক প্রশ্নের জবাবে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, বিশ্বব্যাংক ভাল কথা খুব কম বলে, প্রবৃদ্ধির অর্জন নিয়ে যেটুকু মন্তব্য করেছে সেটিই অনেক বেশি। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকের সব কথা পুরোপুরি বিশ্বাস করা যাবে না। আমরা আমাদের আঙ্গিক থেকে উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছি দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। কেননা এখন দেখেন কাজের লোক পাওয়া যায় না। আমি আমার স্ত্রীর চেয়ে কাজের লোকের সঙ্গে বেশি ভাল ব্যবহার করি, কারণ সে যেন ছেড়ে চলে না যায়। অপর এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, দেশে হাঙ্গামা আছে বলেই আমরা সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় গড় প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৪ শতাংশ ধরেছি। তা না থাকলে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হতো ৯ থেকে ১০ শতাংশ। পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, অনুমোদিত সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা হচ্ছে উন্নত দেশে যাওয়ার ভিত। এটির সঠিক বাস্তবায়নের উপরই এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।

ব্রিফিং এ জানানো হয়, পাঁচ বছরে (২০১৬-২০ সাল পর্যন্ত) এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে অতিরিক্ত ১ কোটি ২৯ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হবে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো কর্মসংস্থান তৈরি এবং আয় বৈষম্য কমিয়ে আনা। এবারের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় গড়ে ৭ দশমিক ৪ ভাগ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। দারিদ্র্যের হার ৬ দশমিক ২ ভাগ কমিয়ে বর্তমানের ২৪ দশমিক ৮ থেকে ১৮ দশমিক ৬ ভাগে নিয়ে আসা হবে। শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ৯ দশমিক ৬ ভাগ থেকে ১১ দশমিক ৯ ভাগে উন্নীত করা হবে। রফতানি আয় ৩০ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২০ সালে ৫৪ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

পরিকল্পনাটির বাস্তবায়ন শুরুর অর্থবছর ২০১৬ তে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৭ শতাংশ, ২০১৭ অর্থবছরে ৭ দশমিক ২ শতাংশ, ২০১৮ অর্থবছরে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ, ২০১৯ অর্থবছরে ৭ দশমিক ৬ শতাংশ এবং পরিকল্পনা শেষ ২০২০ অর্থবছরে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য রয়েছে। প্রবৃদ্ধির এ লক্ষ্য পূরণে শিল্প খাতে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের কৌশল নেয়া হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় শিল্প (ম্যানুফেকচারিং) খাতে গড় প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য হচ্ছে ১০ দশমিক ৮ শতাংশ। সেবা খাতে গড় প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ এবং পাঁচ বছরে কৃষি খাতে গড় প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। অন্যদিকে শিল্প, সেবা ও কৃষি এই তিন খাত মিলে আগামী পাঁচ বছরে গড় প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ।

পরিকল্পনায় আগামী পাঁচ বছরের অন্যান্য লক্ষ্যগুলো হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি বর্তমানের (২০১৫ সাল) ৬ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ২০২০ সালে ৫ দশমিক ৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়া। মোট বিনিয়োগ বর্তমানে জিডিপির ২৭ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে আগামী পাঁচ বছরে জিডিপির ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশে নিয়ে যাওয়া। জাতীয় সঞ্চয় বর্তমানে জিডিপির ২৯ দশমিক ১ শতাংশ থেকে ২০২০ সালে জিডিপির ৩২ দশমিক ১ শতাংশে নিয়ে যাওয়া। ভোগ বর্তমানে জিডিপির ৭৭ দশমিক ৭০ শতাংশ থেকে পাঁচ বছরে জিডিপির ৭৩ দশমিক ৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়া। আগামী পাঁচ বছরে দেশী-বিদেশী মিলে নতুন ১ কোটি ২৯ লাখ কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিকল্পনামন্ত্রী জানান, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের জন্য ব্যয়ের লক্ষ্য চূড়ান্ত করা হয়েছে ৩১ লাখ ৯০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। মোট ব্যয়ের মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ধরা হয়েছে ২৮ লাখ ৪৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ৩ লাখ ৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা। আগামী ৫ বছরে মোট যে ব্যয়ের (বিনিয়োগ) লক্ষ্য ধরা হয়েছে তার মধ্যে সরকারী ব্যয় ৭ লাখ ২৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা এবং বেসরকারী খাত (বৈদেশিকসহ) থেকে ২৪ লাখ ৬৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা।

আগামী পাঁচ বছরে মধ্য আয়ের দেশে যেতে কাক্সিক্ষত অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে যেসব লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে সেগুলো হলো, বিনিয়োগকারীদের দ্বারা চিহ্নিত সীমাবদ্ধতা দূরীকরণের মাধ্যমে বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা, পাবলিক বিনিয়োগ ঘাটতি দূর করতে আধুনিকায়ন পরিকল্পনা তৈরি, বিদ্যুত ও জ্বালানির সঠিক মূল্য নির্ধারণ ও ভর্তুকির পরিমাণ যুক্তিযুক্তকরণ, সরকারী-বেসরকারী বিনিয়োগ অংশীদারিত্ব পুনর্গঠন ও গতিশীলতা আনয়নে পদক্ষেপ গ্রহণ, পোশাক খাত থেকে লব্দ অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে অ-পোশাক রফতানি খাতের জন্য উদ্দীপক কাঠামোর উন্নতিকরণ, রফতানি সম্ভাবনাসহ কৃষি কৌশল পুনর্বিবেচনা করা, কৃষকদের ভাল প্রনোদনা প্রদানে মূল্য নীতি প্রণয়ন ও গ্রামীণ অবকাঠামোর ওপর বেশি জোর প্রদান করা, পশু ও মৎস্য ক্ষেত্রে মনোযোগ সৃষ্টি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে প্রমাণভিত্তিক নিরুপণ ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণের সাহায্যে সঠিক কৌশল নির্ধারণ করা এবং আইসিটি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সংক্রান্ত সেবা রফতানি বৃদ্ধির লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট বিধিগত এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করা ও এর সুনির্দিষ্ট সমাধানের জন্য একটি সমীক্ষা পরিচালনা করা।

সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্ব পাওয়া বিষয়গুলো হচ্ছে, কারিগরি ও প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন মানবসম্পদ গঠন, বিদ্যুত উন্নয়ন, জ্বালানি ও যোগাযোগ খাতে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূরীকরণ, কৃষিভিত্তিক শিল্পসহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের উন্নয়ন কৌশল নির্ধারণ, আইসিটি-স্বাস্থ্য-শিক্ষা সংক্রান্ত সেবা রফতানিতে সুনির্দিষ্ট নীতিকৌশল প্রণয়ন, সরকারী-বেসরকারী বিনিয়োগে গতিশীলতা আনয়ন এবং রফতানির গতিশীলতা আনতে পণ্যের বৈচিত্র্যায়ন।

অন্যদিকে আগামী পাঁচ বছরে সুশাসন নিশ্চিত করতে বিচার ও আইনের শাসন, সরকারী প্রশাসনে সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক সুশাসন উন্নীত করার বিভিন্ন কৌশল নেয়া হয়েছে।