১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ফাঁসির দিন যত ঘনিয়ে ওদের উস্কানি ততই বাড়ছে

  • সাকা-মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ড

মোয়াজ্জেমুল হক ॥ মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী বিএনপি নেতা সাকা চৌধুরী ও জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের বিরুদ্ধে ঘোষিত রায় কার্যকরের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই বড় ধরনের নাশকতার হুমকি ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। এ সবই অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে বিএনপি-জামায়াতের ইন্ধনে ঘটছে। আর এ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে নিষিদ্ধ ঘোষিত বা অনুরূপ জঙ্গী সংগঠনের ক্যাডারদের গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিতদের এমনই ধারণা। সর্বশেষ আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নামে গণমাধ্যমকে উদ্দেশ করে ছয় দফা নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। এ সংগঠনটির সদর দফতর চট্টগ্রামে বলে দাবি করা হয়েছে তাদের ই-মেইল ঠিকানায়। এ বিষয়ে মঙ্গলবার সিএমপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের কোন ধরনের দফতর চট্টগ্রামে আগেও ছিল না, এখনও নেই। তবে কয়েকটি জঙ্গী সংগঠনের কর্মীদের তৎপরতা রয়েছে। এ ছাড়া শহীদ হামজা ব্রিগেড নামের যে জঙ্গী সংগঠনটির জন্ম চট্টগ্রামের ফয়’স লেক এলাকায় হয়েছিল সেটির কর্মকা- নস্যাত করে দেয়া হয়েছে। আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নামে গণমাধ্যমে প্রেরিত ই-মেইল বার্তা নিয়ে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিটিআরসির সঙ্গে কাজ শুরু করেছে। এর আদ্যোপ্রান্ত উদ্ঘাটনের চেষ্টা চালানো হবে বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানানো হয়েছে।

এদিকে, সোমবার গণমাধ্যমকে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নামে ই-মেইল পাঠিয়ে হুমকি দেয়ার ঘটনাটি নিয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ও জেলা পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও তাদের তৎপরতা বৃদ্ধি করেছে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা উপলক্ষে বৃহত্তর চট্টগ্রামের ৫ জেলায় সোমবার থেকে প্রায় চার হাজার বিজিবি পুলিশের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োগ করা হয়েছে। এ অবস্থায় আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের ৬ দফা সংবলিত গণমাধ্যমকে উদ্দেশ করে ই-মেইল প্রেরণের ঘটনাটি নিয়ে মঙ্গলবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষগুলো সজাগ হয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্রে ধারণা দেয়া হয়েছে, বিএনপি-জামায়াতের পরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন জঙ্গী সংগঠনের সুইসাইডল স্কোয়াড ও সামরিক কমান্ডারদের দিয়ে এরা মাঠে নাশকতার চেষ্টা করছে। সুযোগ পেলেই এরা যে কোন মুহূর্তে বড় ধরনের অঘটন ঘটাতে পারে। এ আশঙ্কা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে রয়েছে। কিন্তু জঙ্গীদের প্রতিটি ঘাঁটি ও আস্তানা ইতোমধ্যেই পুলিশের নজরে চলে এসেছে। ফলে কোন দিকে তারা সুবিধা করতে পারছে না। এদিকে, সাকা ও মুজাহিদের ফাঁসিতে ঝোলার দিন দ্রুত ঘনিয়ে আসছে। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত আইনগতভাবে বা মাঠ পর্যায়ে আন্দোলনের ব্যানারে এদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে জঙ্গী গ্রুপগুলোকে তারা এক কাতারে নিয়ে এসে নাশকতার ঘটনা ঘটাতে তৎপর হয়েছে। আনসারুল্লাহ বাংলা টিম গণমাধ্যমের প্রতি ছয় দফা নির্দেশ দিয়ে যে ই-মেইল বার্তা পাঠিয়েছে তা স্রেফ একটি ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা বলেই সিএমপি কর্মকর্তারা মনে করছেন। চট্টগ্রামে শহীদ হামজা ব্রিগেড নামের জঙ্গী সংগঠনটির তৎপরতা নস্যাত করে দিয়েছে র‌্যাব। তবে সমূলে বিনাশ হয়েছে এ কথা এখনও দাবি করা হচ্ছে না। কেননা, এদের অর্থায়নকারী সকলকে এখনও আইনের আওতায় আনা যায়নি। সুপ্রীমকোর্টের তিন আইনজীবী ও এক গার্মেন্টস মালিককে হামজা ব্রিগেডকে অর্থ যোগানদাতা হিসেবে গ্রেফতার করে মামলা হয়েছে। বর্তমানে এরা জেলে রয়েছেন। অপরদিকে, জেএমবি, হুজি, হিযবুত তাহ্রীর, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, দ-প্রাপ্ত কিছু বিজিবি সদস্য, যুদ্ধাপরাধীসহ বিভিন্ন জঙ্গী সংগঠন ও বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নাশকতা ঘটাতে তৎপর এমন অনেকেই জেল খাটছে। জেলের অভ্যন্তরে এরা সংঘবদ্ধভাবে নতুন কোন নাশকতা ঘটাতে পারে এ আশঙ্কায় ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ জেলখানাগুলোতে ইতোমধ্যে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

এদিকে, জেএমবি সংগঠন বর্তমানে দু’গ্রুপে বিভক্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। এক গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ডাঃ নজরুল ও অপর গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন হাফেজ রায়হান। এদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য গোয়েন্দাদের হাতে রয়েছে। তবে তারা আত্মগোপনে গিয়ে সংগঠনের তৎপরতা বৃদ্ধির অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। এর পাশাপাশি নতুন করে জেএমবি সদস্য সংগ্রহও চলছে। এ ছাড়া হিযবুত তাহ্্রীর নামে যে সংগঠনটি অনেকটা প্রকাশ্যে দীর্ঘ সময় তৎপরতা চালিয়েছে তারাও এখন গা-ঢাকা দিয়ে রয়েছে। এ সংগঠনটির অধিকাংশ নেতাকর্মী কলেজ-ভার্সিটি পড়ুয়া। বিশে করে দেশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কিছু ছাত্র এ নিষিদ্ধ সংগঠনটির অগ্রভাগে থেকে কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এখন আর পোস্টার-লিফলেট ছড়ানোর সাহসও তাদের নেই। ইতোপূর্বে শুক্রবারে জুমার নামাজ শেষে চট্টগ্রামে প্রায় মসজিদের সামনে এদের কর্মীরা লিফলেট বিতরণ করত। রাতের আঁধারে দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার লাগাত। সংবাদপত্রগুলোতে প্রেস রিলিজ প্রেরণ করত। এখন আর এসব দৃশ্যমান নয়। তবে নেপথ্য অবস্থানে গিয়ে এরা নাশকতার চেষ্টায় যে লিপ্ত তা বিভিন্ন সূত্রে গোয়েন্দাদের কাছে প্রতিনিয়ত খবর আসছে। আর এতে করে বৃহত্তর চট্টগ্রামের সব গোয়েন্দা সংস্থা জঙ্গী তৎপরতার বিরুদ্ধে বিশেষ নজরদারিতে তাদের বিরুদ্ধে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।

আনসারুল্লাহ বাংলা টিম নামে ই-মেইলে সোমবার প্রেরিত গণমাধ্যমে যে ছয় দফা নির্দেশ দেয়া হয়েছে তা নিয়ে মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। তবে এ পর্যন্ত এদের কোন অস্তিত্ব মিলেনি। সিএমপি গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার বাবুল আকতার জানান, ইতোমধ্যে যে ৪ জন জেএমবি সদস্য বিভিন্ন ঘটনায় গ্রেফতার হয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী প্রদান করেছে তাদের কাছ থেকে জঙ্গী তৎপরতা নিয়ে নানা তথ্য মিলেছে। তবে এরা সংঘবদ্ধ নয়। বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে সুযোগ বুঝে ছিনতাইসহ নানা ঘটনায় লিপ্ত রয়েছে। চট্টগ্রামে ল্যাংটা ফকির হত্যা, ছিনতাই করতে গিয়ে হত্যাসহ বেশ কয়েকটি ঘটনায় জেএমবি গ্রুপের সদস্যরা যে জড়িত তা তাদের স্বীকারোক্তিতে বেরিয়ে এসেছে। চট্টগ্রাম কারাগারের তথ্য অনুযায়ী, এ কারাগারে বর্তমান ৬১ জঙ্গী সদস্য রয়েছে। এদের মধ্যে জেএমবি, হুজি, হিযবুত তাহ্রীর ও শহীদ হামজা ব্রিগেডের সদস্য রয়েছে।

বিএনপি-জামায়াত ও জঙ্গী সংগঠনগুলোর জঙ্গী তৎপরতা নিয়ে সরকার জিরো টলারেন্স অবস্থানে চলে যাওয়ায় এদের তৎপরতা আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারেনি। অধিকাংশ জঙ্গী সদস্য আত্মগোপনে গিয়ে নাশকতা ঘটানোর চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। অপরদিকে, বিএনপি- জামায়াতের শীর্ষ নেতাকর্মীরা নিজেদের রক্ষার চেষ্টার পাশাপাশি জঙ্গীদের দিয়ে সরকারী অবস্থান নড়বড় করার অপচেষ্টায় প্রাণপণ তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে সরকারী কঠোর অবস্থানকে আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকেও যখন চেষ্টা চালিয়ে নড়ানো যায়নি এরপর থেকে এরা একেবারে হতাশ হয়ে পড়েছে। বিএনপি-জামায়াত ঢাকায় হেফাজতকে দিয়ে যে অঘটন ঘটানোর চেষ্টা চালিয়েছিল তাও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। হেফাজত এখন নিজেদের অবস্থান নিয়ে ব্যস্ত। তবে তারা বিএনপি-জামায়াতের প্রতি সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে মাঠে নেমে ভুল করেছে বলে স্বীকার করে বর্তমান সরকারের কার্যক্রমের পক্ষেই এক ধরনের নীরব অবস্থান নিয়েছে। অপরদিকে, ব্লগারদের নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনার যে তৎপরতা শুরু হয়েছিল সে ব্যাপারেও এখন জঙ্গীরা আর সুবিধা করতে পারছে না। কেননা, ইতোমধ্যে যারা ধরা পড়েছে তাদের কাছ থেকে গোয়েন্দারা এদের গোপন তৎপরতার আদ্যোপ্রান্ত বের করার পর এদের পরিকল্পনা নস্যাত হয়ে গেছে। তবুও সুযোগ পেলে এরা যে হামলে পড়বে না সে কথা পুলিশ ও গোয়েন্দারা কখনও উড়িয়ে দেয় না। তারাও এ নিয়ে নিয়মিতভাবে নজরদারি বৃদ্ধি করেছে।

গোয়েন্দাদের অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, দেশে সৃষ্ট জঙ্গী সংগঠনগুলোর অধিকাংশ সদস্য বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে গোপন ঘাঁটি গড়ে তুলছে। এসব ঘাঁটিতে ৮-১০ জনের বেশি অবস্থান থাকে না। ৪ থেকে ৫ জনে মিলে অপারেশন চালায়। অপারেশনের নির্দেশদাতা ছাড়া তার উপরের কারও নাম পরিচয়ও জানা থাকে না। চট্টগ্রামে জেএমবির যে ৪ সদস্য ধরা পড়েছে এরা সামরিক কমান্ডার যে নিজ গ্রেনেড বিস্ফোরণে নিহত হয়েছে তাকে ছাড়া অন্য কাউকে চেনে না বলে জবানবন্দী দিয়েছে।

মৃত্যুদ-প্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী সাকা চৌ ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের বিরুদ্ধে আদালতের রায়কে বিলম্বিত করতে তারা সর্বশেষ পর্যন্ত চেষ্টা চালাবে। এরই প্রক্রিয়ায় সাকার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ রায়ের পর রিভিউতে ৫ পাকিস্তানীসহ ৮ জনের সাফাই সাক্ষ্য নেয়ার আবেদন জানানো হয়েছে। আগামী ২ নবেম্বর এ আবেদনের ওপর শুনানির দিন ধার্য হয়েছে। সাকার পক্ষের আইনজীবীরা গণমাধ্যমে তাদের যে যুক্তি তুলে ধরছেন সরকার পক্ষে এ্যাটর্নি জেনারেল ইতোমধ্যে তা নাকচ করে দিয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদ- বহাল থাকবে বলেই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

বর্তমান সরকারের পক্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীগুলোর সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে না পেরে জঙ্গী সংগঠনগুলো দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের হত্যার যে একটি নীলনক্সা প্রণয়ন করেছে তা ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর ওই পথেও তারা প্রতিবন্ধকতার কবলে পড়েছে। প্রসঙ্গত, সর্বশেষ আনসারুল্লাহ বাংলা টিম সকল গণমাধ্যমকে ছয় দফা সংবলিত হুঁশিয়ারি বার্তা পাঠিয়েছে। এর আগে বিভিন্ন জঙ্গী গ্রুপ গত মে, জুন ও আগস্ট মাসে দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের হত্যার তালিকা প্রকাশ করেছে। এদের সংখ্যা ৫৯।