২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হবে সাড়ে ৬ শতাংশ

  • বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস ॥ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অর্জনের প্রশংসা

অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অর্জনের প্রশংসা করেছে বিশ্বব্যাংক। সেই সঙ্গে অনিশ্চয়তার বিষয়ে প্রকাশ করা হয়েছে উদ্বেগ। এক বাক্যে বলা হয়েছে অর্থনীতি স্থিতিশীল আছে, তবে নিশ্চয়তা নেই। এ অবস্থায় চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৬ দশমিক ৫ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। অর্থবছরের শুরুতে জাতীয় বাজেটে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগে বিদ্যমান ফাঁদের অবসান হলে এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক। এ লক্ষ্য অর্জনে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও বড় শর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেটে এসব বিষয় উঠে এসেছে। মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁও এ সংস্থাটির বাংলাদেশ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটির বিস্তারিত তুলে ধরেন সংস্থার ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। বক্তব্য রাখেন কান্ট্রি ডাইরেক্টর জোহানেস জাট। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে স্থিতিশীল রয়েছে। তবে রয়েছে অনিশ্চয়তাও। চলতি অর্থবছরে অর্থনীতিতে ভাল প্রবৃদ্ধি, নিম্নমুখী মূল্যস্ফীতি, রিজার্ভে উর্ধগতি, পরিমিত বাজেট ঘাটতির পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। গত অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে মর্মে সরকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) দাবির যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে প্রতিবেদনে। বলা হয়েছে সংখ্যা নিয়ে আলোচনা করলে উত্তাপই ছড়াবে কিন্তু আলো ছড়াবে না। সুতরাং সংখ্যা বড় কথা নয়। প্রকৃত প্রবৃদ্ধিই বড় কথা।

জোহানেস জাট বলেন, বাংলাদেশ অর্থনীতির ক্ষেত্রে এশিয়ার টাইগার। কেননা ইতোমধ্যেই আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে দেশটি। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে অর্জন অনেক। পোশাক শিল্পের অর্জন উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। কেননা এর শ্রমিকদের মধ্যে বেশিরভাগই নারী। ফলে নারীর ক্ষমতায়ন ঘটেছে। বিদ্যুত উৎপাদন বৃদ্ধি হয়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। বিদ্যুতের উৎপাদন ১০ হাজার মেগাওয়াট পার হয়েছে। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক কানেকটিভিটি ক্ষেত্রের প্রশংসা করে তিনি বলেন, এর ফলে আঞ্চলিক বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। এত উল্লেখযোগ্য অর্জনের মধ্যে ঢাকার যানজটকে অন্যতম সমস্যা হিসেবে দেখছেন তিনি। এ বিষয়ে জাট বলেন, ঢাকাতে বিভিন্ন সংস্থা আলাদা আলাদাভাবে কাজ করছে। যেমন রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি, রাজউক, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ইত্যাদি। এসব সংস্থার মধ্যে সমন্বয় থাকা জরুরী। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পদ্মা সেতু বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রকল্প। এর মধ্য দিয়ে দেশের দক্ষিণ-পঞ্চিমাঞ্চল এবং ভারতে ওই অঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হবে। এটি বাস্তবায়নের ফলে প্রবৃদ্ধিও বাড়বে।

নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অর্থনীতি ভেতর-বাইরে দুই দিক থেকেই ঝুঁকিতে রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে প্রতিবেদনে। বলা হয়েছে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় ক্ষেত্রেই পৌষের সকালের মতো ঝুঁকি রয়েছে। অনেক কুয়াশা রয়েছে। এ বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থির হলে আবার অর্থনীতির গতি টেনে ধরবে। সরকারী বিনিয়োগের মান নিশ্চিত না হওয়ায় পণ্য ও সেবার সরবরাহ ব্যবস্থা সঙ্কুচিত হতে পারে। সরকারী বিনিয়োগ বাড়লেও তার সুফল পাওয়া যাচ্ছে না প্রত্যাশিত হারে। সরকারের অর্থ ব্যয়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে অবকাঠামো খাতে উন্নতি হয়নি।

চীনের গতিপ্রবাহ আগামী দিনে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, রফতানিতে গুরুত্ব কমিয়ে চীনের উদ্যোক্তারা অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্য সরবরাহের দিকে বিশেষ নজর দিচ্ছেন। তা ছাড়া চীনের মুদ্রার বিনিময় হারে নিয়ন্ত্রণ উঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। ফলে বাজারে চাহিদা ও সরবরাহের মাধ্যমে বিনিময় হার নির্ধারিত হবে। এর প্রভাবে বাংলাদেশী পণ্যের প্রতিযোগিতা বাড়বে।

বিশ্বব্যাপী পণ্য ও সেবার দাম কমে আসার সম্ভাবনা থাকায় বাংলাদেশের রফতানি খাতে মন্দা নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে প্রতিবেদনে। তা ছাড়া পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রের প্রক্রিয়াধীন ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (টিপিপি) চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের রফতানি উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলে এতে দাবি করা হয়েছে।

বাংলাদেশের আর্থিক খাত নাজুক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, মোট বিতরণ করা ঋণের ১০ দশমিক ৪৭ শতাংশ বর্তমাণে খেলাপী রয়েছে। ব্যাংকের কর্পোরেট ব্যবস্থাপনা এখনও সমস্যাগ্রস্ত। ব্যবসা বাণিজ্যে এখনও বড় বাধা হয়ে রয়েছে ঋণের প্রাপ্তির সুবিধার স্বল্পতা। খেলাপী ঋণের সমস্যা। পুঁজিবাজারের পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও এখনও বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েই গেছে।

রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অর্জন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও লেনদেনে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় সরকারের পক্ষ থেকে গুরুত্ব দিয়ে উদ্যোগ নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, ভোক্তাদের চাহিদা ধরে রাখতে সামষ্টিক অর্থনৈতিক পদক্ষেপ প্রয়োজন। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতার অভাব দূর করতে হবে। মূলধন ঘাটতি পূরণে আবার অর্থায়নের আগে ব্যাংকগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

এ সময় জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির উদ্বেগের মূল বিষয় হলো, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ঘাটতি আছে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ভাল না। গত বছর রেমিটেন্স ভাল থাকলেও চলতি বছরে তা কমতির লক্ষণ দেখা দিয়েছে। কারণ গত কয়েক বছর থেকে বিদেশে শ্রমিক অবস্থানের হার কমে আসছে। এছাড়া বর্তমানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলেও অশ্চিয়তা কাটেনি।

গত অর্থবছরে প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধিকে মন্দের ভাল বলে মন্তব্য করেন জাহিদ হোসেন। প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ও ভিয়েতনামের চাইতে প্রবৃদ্ধিতে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। তবে চীন, ভারত ও শ্রীলঙ্কার চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। ২০১০ সাল থেকে ২০১৫ পর্যন্ত বাংলাদেশে গড়ে ৬ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এ সময়ে চীন ৮ দশমিক ৩০ শতাংশ, ভারত ৭ দশমিক ৩ শতাংশ ও শ্রীলঙ্কা ৭ দশমিক ১ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।

অন্যদিকে পাঁচ বছর পাকিস্তান ৩ দশমিক ৯০ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়া ৫ দশমিক ৬ শতাংশ ও ভিয়েতনাম ৫ দশমিক ৯০ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচী (এডিপি) বাস্তবায়ন বিষয়ে প্রতিবদনে বলা হয়েছে, সরকারী বিনিয়োগ বর্তমানে বেড়েছে। কিন্তু সেটি খাতা-কলমে ঠিক আছে। কেননা মাঠ পর্যায়ে এর প্রভাব নেই। রাস্তা-ঘাট উন্নয়নে প্রকল্প নেয়া হলেও তার বাস্তবায়ন সঠিকভাবে হচ্ছে না। এক্ষেত্রে এডিপি বাস্তবায়নের সক্ষমতার অভাব, দুর্নীতিসহ নানা কারণ রয়েছে। ড. জাহিদ হোসেন বলেন, এবারে প্রতিবেদনে চিনি, গম ও সয়াবিন তেলের দাম পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, যখন আন্তর্জাতিক বাজারে কোন পণ্যের দাম বাড়ে তখন বাংলাদেশেও দ্রুত এবং তুলনামূলক বেশি বাড়ে। কিন্তু যখন কোন পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে কমে, তখন বাংলাদেশের বাজরে ধীরে প্রভাব পড়ে এবং তুলনামূলক কম পরিমাণে কমে। বাজারে সিন্ডিকেট থাকলে দামের এ ধরনের পার্থক্য হয়। সুদের হারের ক্ষেত্রে নিম্নগামিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম হয়েছে। বিশেষ করে এনবিআর-এর কর আহরণ চিত্র ভাল নয়।