২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পোড়ামাটির রাধাকৃষ্ণ লোকজ ঐতিহ্যের কদমা বাতাসা

পোড়ামাটির রাধাকৃষ্ণ লোকজ ঐতিহ্যের কদমা বাতাসা
  • বাড়তি আকর্ষণ পূজার মেলা

মোরসালিন মিজান ॥ পূজার হাজারো আনুষ্ঠানিকতা। না করলেই নয়। দুর্গাপূজার বেলায় সেটি বাড়ে বৈ কমে না। বোধন শেষে ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে সোমবার শুরু হয়েছিল এই আনুষ্ঠানিকতা। মঙ্গলবার মহাসপ্তমীর সকালে চক্ষুদানের মধ্য দিয়ে ‘প্রাণ প্রতিষ্ঠা’ করা হয় ত্রিনয়নী দেবীর প্রতিমায়। এভাবে প্রতিদিনই থাকছে নানান আনুষ্ঠানিকতা। সবই মন্দিরে। ম-পে। আর বহিরাঙ্গনে বসেছে মেলা। দোকানিরা বাহারি পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন। সন্ধ্যা হতে রাত অবধি ম-পে ম-পে ঘুরে বেড়ানো। ঠাকুর দেখা। দুর্গোৎসব চলাকালে পূজাম-পগুলোতে প্রতিদিনই অঞ্জলি, প্রসাদ বিতরণ, ভোগ-আরতি হবে। এছাড়া আলোকসজ্জা, আরতি প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন কর্মসূচীর আয়োজন করা হয়েছে। তবে বিশেষ আকর্ষণ- পূজার মেলা। রাজধানী ঢাকার প্রায় সব পূজাম-পের সামনেই এমন মেলা বসেছে।

এবার রাজধানী ঢাকায় ম-পের সংখ্যা প্রায় ২২২টি। অধিকাংশ ম-প ঘিরে ছোট-বড় মেলা বসেছে। যেখানে বড় খোলা জায়গা বা মাঠ আছে সেখানে মেলাও বড়সড়ো। ছোট জায়গায় ছোট পরিসরের মেলা। যে মন্দির বা ম-পের বাইরে একেবারেই জায়গা নেই, সেখানে রাস্তার ধারে বসে গেছেন দোকানিরা। ক্রেতাও যথেষ্ট। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের ওসব দোকানে ঢুঁ না মারলেই নয়!

ঢাকার পূজার মেলা বিশেষভাবে দৃশ্যমান হয় ঢাকেশ্বরী মন্দির এলাকায়। পুরান ঢাকার এই মন্দিরে মেলা ঠিক বলেকয়ে হয় না। এবারও অনানুষ্ঠানিক মেলায় সরব হয়েছে মন্দিরের আশপাশ। মন্দিরে যাওয়ার মূল রাস্তার ধারে বেশকিছু স্থায়ী দোকান। এসব দোকানে সারাবছরই পূজার সামগ্রী, ধর্মীয় গ্রন্থ ইত্যাদি বিক্রি হয়। এখন মেলার চরিত্র পেয়েছে। প্রতিটি দোকানে বিচিত্র পণ্যসম্ভার। বিভিন্ন দোকানের সামনে খই, কদমা, চিনির বাতাসা দেখে গ্রামের ভুলতে বসা মেলাটির কথাটি মনে পড়ে যায়। মন্দিরের পেছনের অংশে যাওয়ার রাস্তায় মাদুর পেতে বসেছেন দোকানিরা। মন্দিরের সীমানা প্রাচীরের ভেতরে একটি বড় খোলা জায়গা। প্রায় পুরোটাজুড়ে মেলা বসেছে। মেলার বিভিন্ন স্টলে হরেক রকমের পুতুল। পোড়ামাটির সামগ্রী। চিরচেনা ভঙ্গিতে বাঁশি বাজাচ্ছেন কৃষ্ণ। পাশেই তার রাধা। দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। গণেশসহ আছে অন্য দেব-দেবীর মূর্তি। তবে এগুলো দেব-দেবী যতটা, তারও বেশি মৃৎশিল্পের নিদর্শন। সেভাবেই চলছে কেনাবেচা। মেলায় আছে দারুণ সব কাজ করা শঙ্খ। বিশেষ এই বাদ্যযন্ত্রের গায়ে নিখুঁত শিল্পকর্ম দেখে অবাক হতে হয়। মেয়েদের সাজগোজের সব আছে মেলায়। হাতভর্তি চুড়ি চাই? আছে কাঁচের চুড়ির বড় সংগ্রহ। প্রতিমা দেখতে আসা মেয়েরা শখ করে চুড়ি পরছেন। পছন্দ করে কিনছেন মালা, চেন, কানের দুল। কানের দুলের প্রদর্শনীটা চোখে পড়ার মতো। মেঝেতে অনেকগুলো স্টেইনলেস স্টিলের বাটি। পাশাপাশি সাজানো। প্রতিটির ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে কানের দুল। প্রথমে দেখে বোঝার উপায় নেই, ভেতরে কী। একটু খেয়াল করলে দেখা যায় দুলগুলো। খোঁপা সাজানোর ফুল, কাঁটা ইত্যাদি বিক্রি হচ্ছে। ছেলেদের জন্য আছে চমৎকার ব্রেসলেট। একটু খুঁটিয়ে দেখা গেলে পাওয়া যাবে আকর্ষণীয় আরও অনেক কিছু।

মঙ্গলবার ঢাকেশ্বরীতে প্রতিমা দেখার পর মেলা ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন যুথীকা ও রঞ্জন। এই যুগলের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এরই মাঝে তাঁরা বেশ কয়েকটি ম-প ঘুরে প্রতিমা দেখেছেন। কোথায় কেমন প্রতিমা গড়া হয়েছে সেটি খুব আগ্রহ নিয়ে তারা দেখেছেন। তার পর পরই পূজার মেলার প্রতি আকর্ষণ। যুথীকা বললেন, ঢাকার মেলায় খুব বেশি কিছু এখন পাওয়া যায় না। তবু অভ্যাসবশত খোঁজাখুঁজি করি। তাতেই পছন্দের কিছু না কিছু পাওয়া হয়ে যায়।

এখন রাজধানীবাসীর বড় স্রোত গুলশানের পূজাম-পে। দারুণ আকর্ষণীয় করে গড়া হয়েছে এটি। নাচ-গানসহ হরেক আয়োজন এখানে। এরপরও মেলাটির কথা আলাদা করে বলতে হয়। অঘোষিত মেলা। রাস্তার ধারে দোকান সাজানো হয়েছে। বিভিন্ন হস্তশিল্প, কাঁসা-পিতলের পণ্য, মেয়েদের গয়না ইত্যাদি খুব সহজেই টানে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মের মানুষও প্রতিমা দেখছেন। কেনাকাটা করছেন মেলা ঘুরে। আশিকুর রহমান নামের সরকারী এক কর্মকর্তা এসেছিলেন স্ত্রী ও কন্যাকে নিয়ে। বললেন, এত বর্ণাঢ্য একটি আয়োজন। ছেলে মেয়েদের নিয়ে তো আসতেই হয়। মেলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা যারা অন্য ধর্মের মানুষ তাদের ম-পে বিশেষ কিছু করার থাকে না। সে কারণেই মেলা ঘুরে দেখা। মেলা ঘুরে মেয়ে খুব খুশি বলে জানান তিনি।

এখানেই শেষ নয়। মেলার কারণে অনেক ম-পের দর্শনার্থীর সংখ্যাও বেড়ে যায়। বিশেষ করে কলকাতাতে এই উদ্দেশ্যে মেলার আয়োজন করা হয় বলে জানা যায়। এবার শিলিগুড়ির ছোট-বড় ম-পগুলোতে মেলার আয়োজন করা হয়েছে। ফলে সেখানে লোকসমাগম বেশি। মেলায় স্টল ভাড়া দিয়ে পূজার খরচের একটা অংশ তুলে নেয়া যাচ্ছে বলেও ধারণা। এভাবে পূজার সঙ্গে জুড়ে আছে পূজার মেলা। দশমীর দিন পর্যন্ত চলবে এই মেলা।