২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিএনপির মুখে জাতীয় ঐক্যের ডাক

  • আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

ঢাকার কাগজে খবর দেখলাম, বিএনপি জাতীয় ঐক্য চায়। দলের নয়া পল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সাংবাদিকদের কাছে মন্তব্যটি করেছেন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, ‘দুই বিদেশী হত্যার পরিপ্রেক্ষিতে জঙ্গীবাদ দমনসহ চলমান সঙ্কট নিরসনে সব রাজনৈতিক দল ও সচেতন নাগরিকদের নিয়ে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা জরুরী আবশ্যক।’ আওয়ামী লীগের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, ‘জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার জায়গাটিতে তাদের আসতে হবে। যদি তারা সত্যিকার অর্থে দেশকে ভালবাসেন, মানুষকে ভালবাসেন, স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন তাহলে জাতিকে অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। এই উদ্যোগ তাদেরই নিতে হবে। কারণ, তারা ক্ষমতায় আছেন।’

বিএনপি নেতা পরোক্ষভাবে আওয়ামী লীগের ওপর অপরাজনীতি করার দোষারোপ করেছেন এবং বলেছেন, ‘দেশে গণতন্ত্রহীনতার সুযোগ উগ্রপন্থীরা গ্রহণ করবে এটাই স্বাভাবিক। সেটা আমরা কেউ চাই না। দেশের সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় বিএনপি উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে বিদেশী নাগরিকদের খুনের ঘটনা এবং পর পর কয়েকটি হত্যার ঘটনায় গোটা জাতি আজ শঙ্কিত। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশে অপরাজনীতি করা হচ্ছে। এই অপরাজনীতির ফলে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি হচ্ছে না।’

‘বিএনপি জাতীয় ঐক্য চায়’ এই কথা শুনে রূপকথার বৃদ্ধ সিংহের গল্প মনে পড়ল। বার্ধক্যজনিত দুর্বলতায় পশু শিকারে অক্ষম হয়ে এই সিংহ ঘোষণা করেছিল, সে অহিংস ধর্মে দীক্ষা নিয়েছে। আর পশু বধ করবে না। জন্মাবধি জাতীয় ঐক্যের প্রতিটি ভিত্তি ভাঙ্গার অবিরাম চেষ্টা চালাবার পর আজ ক্ষমতাহীন ও ঐক্যহীন বিএনপি জাতীয় ঐক্য চায় এবং সেজন্য আওয়ামী লীগ সরকারের কাছেই আবেদন জানাচ্ছে তারা যেন এই ঐক্য প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী হয়। কারণ তারা এখন দেশের চালিকাশক্তি।

এক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো, এক সময় বিএনপিও তো দীর্ঘ সময় পালাক্রমে ক্ষমতায় ছিল। তখন তারা জাতীয় ঐক্য গড়ার এই জরুরী কাজটিতে কেন হাত দেননি? হাত না দিয়ে বরং সেই ঐক্যের ভিত্তিগুলো ভাঙ্গার চেষ্টা করেছেন। জাতির পিতাকে অস্বীকার ও অবমাননা, স্বাধীনতার মূল আদর্শগুলোকে ধ্বংস করার চেষ্টা, জাতিকে প্রতিটি পেশার ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদী ও অজাতীয়তাবাদী এই পরিচয়ে বিভক্ত করে ফেলা এবং স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত ও অন্যান্য উগ্রপন্থীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে স্বাধীনতার সব অর্জন নষ্ট করার চেষ্টা এ কাজই কি বিএনপি এ যাবতকাল করে আসেনি?

জাতীয় ঐক্য গড়ার একটা সর্বসম্মত ভিত্তি থাকে। সেই ভিত্তি হলো স্বাধীনতার মূলনীতিগুলো মেনে নেয়া। স্বাধীনতার ইতিহাসকে সম্মান দেয়া। স্বাধীনতার যুদ্ধে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদের মর্যাদা দেয়া। বিএনপি এ যাবত এর একটি কাজও করেছে কি? স্বাধীনতা যুদ্ধের মূলমন্ত্র বাঙালী জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতায় তারা বিশ্বাস করেন কি? বন্দুকের জোরে ক্ষমতায় বসেই তো বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান অবৈধভাবে সংবিধান থেকে সেক্যুলারিজম বাদ দেন এবং বাঙালী জাতীয়তাবাদের পাল্টা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ খাড়া করেন। জাতির পিতাকে সম্মান প্রদর্শনের বদলে তাঁর মৃত্যুদিবসকে বিএনপি নেত্রী নিজের বানোয়াট জন্মদিন ঘোষণা করে পঞ্চাশ-ষাট কেজি ওজনের কেক কাটেন।

ফখর মির্জা এখন উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে বিএনপির অবস্থান গ্রহণের কথা বলছেন। স্বাধীনতাবিরোধী এবং উগ্রপন্থী জামায়াতের পলাতক নেতাদের পাকিস্তান থেকে ডেকে এনে বাংলাদেশে প্রথম পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেন জিয়াউর রহমান। আফগান যুদ্ধের সময় পলাতক তালেবান ও আল কায়েদার উগ্রপন্থীদের সমর্থকদের বাংলাদেশে এসে ঘাঁটি গাড়ার সুযোগ করে দেয় তখনকার খালেদা জিয়া সরকার। খালেদা জিয়া ২০০১ সালে মানবতার শত্রু এবং ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমতায় বসিয়ে সরকার গঠন করেছেন। তার দলের অনেক মন্ত্রী ও নেতা এখন ফাঁসিকাষ্ঠের আসামি। মির্জা ফখরুল যত ভাল কথাই বলুন, কাক এখন ময়ূরপুচ্ছ ধারণ করলেই তো ময়ূর হতে পারবে না।

এখন দু’জন বিদেশী হত্যা নিয়ে বিএনপি খুবই চিন্তিত। কিন্তু তাদের শাসনামলে যখন হুমায়ুন আজাদ, কিবরিয়া, আহসানউল্লাহ মাস্টারসহ দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক নেতারা একের পর এক নৃশংস হত্যাকা-ের শিকার হয়েছেন; এমনকি শেখ হাসিনার জনসভায় প্রকাশ্যে দিনেদুপুরে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে তাঁকে তাঁর দলবলসহ হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে, অসংখ্য নর-নারীকে হতাহত করা হয়েছে, তখন বিএনপি সরকারের ভূমিকা কি ছিল? বেগম জিয়ার পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, শেখ হাসিনাই সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য নিজের সভায় নিজের লোক দিয়েই বোমা হামলা চালিয়েছিলেন!

ফখর মির্জার ভাষ্য মতে, বিএনপি এখন দেশে উগ্রপন্থীদের কার্যকলাপে উদ্বিগ্ন। কিন্তু এই উগ্রপন্থীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে দু’দিন আগেই বিএনপি কি দেশে ভয়াবহ সন্ত্রাস সৃষ্টি করেনি? পেট্রোলবোমা হামলা চালিয়ে অসংখ্য নিরীহ নর-নারী ও শিশুকে হত্যা করেনি? এই নৃশংসতার তুলনা বিরল। মির্জা ফখরুল এখন মানুষকে ভালবাসার কথা বলছেন। কিন্তু তার দল গত সাধারণ নির্বাচনের আগে ও পরে জামায়াতের সঙ্গে হাত মিলিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মারার যে অভিযান শুরু করেছিল তা কি মানুষকে ভালবাসার প্রমাণ? ক্ষমতার জন্য তাদের কাছে দেশ ও মানুষের মূল্য গৌণ হয়ে গিয়েছিল।

দু’জন বিদেশীর হত্যাকা-ে বিএনপি এখন উদ্বিগ্ন। কিন্তু উগ্রপন্থীদের হাতে যখন একের পর এক মুক্তমনা ব্লগার নৃশংসভাবে নিহত হয়েছেন, তখন বিএনপির ছোট-বড় কোন নেতাকেই মুখ খুলতে দেখা যায়নি। বরং ইতোপূর্বে এই ব্লগারদের নাস্তিক, মুরতাদ আখ্যা দিয়ে বিএনপিই তাদের হত্যার ক্ষেত্র প্রস্তুতিতে সহায়তা যুগিয়েছিল। সন্ত্রাস ও দুর্নীতির যে বীজ বিএনপি তাদের শাসনামলে দেশে রোপণ করে গেছে, এখন তা-ই মহামহীরুহ হয়ে উঠেছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে দুর্নীতিকবলিত একটি প্রশাসন এবং সন্ত্রাসকবলিত রাজনীতি। আওয়ামী লীগের ভেতরেও এই সন্ত্রাস ও দুর্নীতি অনুপ্রবিষ্ট হয়েছে। শেখ হাসিনা যথাসাধ্য চেষ্টা চালাচ্ছেন সন্ত্রাস ও দুর্নীতির এই দুই অসুর বধের জন্য। তিনি যদি তা না পারেন, তা হবে দেশের জন্য এক মহাসর্বনাশ।

বিএনপি এখন জাতীয় ঐক্য চায়, খুব ভাল কথা। তাহলে প্রথমেই বেগম খালেদা জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসার নামে গিয়ে চক্রান্তের রাজনীতির জাল বোনা বন্ধ করতে হবে। বহু দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের মামলায় অভিযুক্ত তার পুত্র তারেক রহমানকে মিথ্যা ইতিহাস চর্চা থেকে বিরত হতে হবে। একজন প্রকৃত ইতিহাসবিদ কখনও ইতিহাসের বিকৃতি ঘটান না। কিন্তু মূর্খের দ্বারা ইতিহাস বিকৃতি ক্ষতিকর এবং হীন মানসিকতার পরিচায়ক। এটাও এক ধরনের সন্ত্রাস।

জাতীয় ঐক্য গড়তে চাইলে বিএনপি খোলামনে এগিয়ে আসুক। সন্ত্রাস বর্জনের ঘোষণা দিক। জামায়াত ও একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের সংশ্রব বর্জন করুক। জাতীয় ঐক্যের একটি সর্বসম্মত ভিত্তি মেনে নিতে সম্মত হোক। এই ভিত্তি হলো জাতির পিতা ও জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের আদর্শগুলোকে মেনে নেয়া। ভারতের বিজেপি বাংলাদেশের বিএনপির মতোই একটি সাম্প্রদায়িকতামনা দল। কিন্তু তারা ক্ষমতায় এসে মহাত্মা গান্ধীকে জাতির পিতা হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়নি। স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন এমন বহু কংগ্রেস নেতার স্মৃতির প্রতি তারা শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। শিবসেনা ও আরএসএসের চেষ্টা সত্ত্বেও বিজেপির সরকার ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ভারতের অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র কাঠামো ভেঙ্গে ফেলার এই চেষ্টায় মদদ দিচ্ছেন না।

ভারতের বিজেপির কাছ থেকে বাংলাদেশের বিএনপির অনেক শেখার রয়েছে। ভারতে কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে যেমন রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও দ্বন্দ্ব রয়েছে বাংলাদেশেও তেমনি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য এবং দ্বন্দ্ব থাকবেই। নিজ নিজ কর্মসূচী নিয়ে তারা জনগণের কাছে যাবেন এবং জনগণের ম্যান্ডেট পেলে তারা ক্ষমতায় যাবেন এই গণতান্ত্রিক পন্থা মেনে চললেই দেশের রাজনীতিতে সুস্থতা আসতে পারে। তবে কর্মসূচীগত পার্থক্য থাকলেও একটি সাধারণ সমঝোতা থাকবে সকল রাজনৈতিক দলের মধ্যে। এই সমঝোতাটি হলো জাতির পিতা, জাতির মুক্তি সংগ্রামের মূলমন্ত্র ও ইতিহাসকে বিতর্কের বিষয় না করা। এগুলোই জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি। এই ভিত্তিকে না মেনে বিএনপি যদি বাংলাদেশকে মিনি পাকিস্তান বানাতে চায়, তা কখনই জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার সহায়ক হবে না।

বিএনপির শুভাকাক্সক্ষী, সাধারণ নেতা ও কর্মীদের আজ ভেবে দেখতে হবে, তারা কোন্ পথে যাবেন? তাদের দলে আজ তারেক রহমানের ভূমিকা হ্যামিলনের বংশীবাদকের। এই বংশীধ্বনিতে মাতা খালেদা জিয়া সম্মোহিত থাকতে পারেন; কিন্তু দলের সাধারণ নেতাকর্মীরা পারেন না। তাহলে দলের সর্বনাশ ঘটবে। তারেক রহমানের পিছু পিছু গোটা দল সমুদ্রের অতলে বিলীন হয়ে যাবে। এখনও সময় আছে। দলের নেতৃত্বকে হুঁশিয়ার করে তারা গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথে ফিরিয়ে আনতে পারেন। তাতে দল বাঁচবে, দেশ বাঁচবে। বিএনপি আগে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিগুলো মেনে নিতে রাজি হোক। তারপর আওয়ামী লীগকে ডাক দিক ঐক্য ও সমঝোতা গড়ে তোলার বৈঠকে যোগ দিতে। সে ডাকে সাড়া না দিয়ে আওয়ামী লীগের উপায় থাকবে না।

[লন্ডন, ২০ অক্টোবর, মঙ্গলবার, ২০১৫॥

নির্বাচিত সংবাদ