২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নরেন্দ্র মোদির ভারত ও সাহিত্যিকদের পুরস্কার প্রত্যাহার

  • মিলু শামস

শুরু করেছিলেন নয়নতারা সায়গল। সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার পাওয়া তিন যুক্তিবাদী সাহিত্যিক স্বাধীন মতপ্রকাশের ‘অপরাধে’ খুন হওয়ার পরও সাহিত্য আকাদেমির নীরব ভূমিকা তাকে প্রতিবাদী করে। চুরাশি বছর বয়স্ক সাহিত্যিকের কাছে প্রতিবাদের এর চেয়ে জোরালো ভাষা সম্ভবত ছিল না। ক্ষুব্ধ তিনি বলেন, সাহিত্যিকদের হত্যা করা হচ্ছে অথচ সাহিত্য আকাদেমি চুপ। কোনরকম প্রতিবাদ নেই। এ মেনে নেয়া যায় না।

নয়নতারার পুরস্কার ফেরতের পর একে একে গরু খাওয়া নিয়ে একাধিক হত্যা ও নির্যাতন, পাকিস্তানী গজল গায়ক গুলাম আলীকে গাইতে না দেয়া, সুধীন্দ্র কুলকার্নির মুখে কালি লেপে দেয়া, অভিনেতা নাসিরুদ্দীন শাহকে ‘ভারত বিদ্বেষী’ আখ্যা দেয়া ইত্যাদি ঘটনায় ভারতের বিভিন্ন ভাষাভাষী লেখক-সাহিত্যিকরা পুরস্কার ফেরত দিয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। ‘পদ্মশ্রী’ পাওয়া পাঞ্জাবী লেখক দিলীপ কৌর তিওয়ানা খেতাব ফিরিয়ে দিয়ে বলেছেন, ‘যা হচ্ছে তা দেশের পক্ষের লজ্জার।’ প্রতিবাদী সাহিত্যিকরা মনে করছেন, বিজেপি আমলে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর শক্তি বাড়ছে। ভারত বহুবাদী চরিত্র হারিয়ে হিন্দুত্ববাদী হওয়ার পথে এগোচ্ছে। গরু হত্যা নিষিদ্ধ করা, যুক্তিবাদীদের হত্যা, ইখলাক হত্যাকা-, পাকিস্তানী শিল্পীকে অনুষ্ঠান করতে না দেয়া, সুধীন্দ্র কুলকার্নিকে অপমান করা এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ভারতকে ক্রমশ হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করার সার্বিক ছকের অঙ্গ।

এই ছক কাটার কাজ বহু আগে শুরু হলেও দু’হাজার চৌদ্দ সালের মে মাসে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর তা শক্ত ভিত্তি পেয়েছে। নির্বাচনী প্রচারে মোদি প্রথমে উন্নয়নের কথা বেশি বললেও শেষদিকে তার আসল চেহারা বেরিয়ে পড়ে। ভারতীয় জনগণকে হিন্দু জাতীয়তাবাদের কথা বলে সাম্প্রদায়িক কাঠামোর মধ্যে এক করাই ছিল তার মূল উদ্দেশ্য। যদিও হিন্দু জাতীয়তাবাদ বলে আসলে কিছু নেই। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে ভারতে বহু জাতি আছে। যাদের ভাষা ভিন্ন এবং প্রত্যেকের নিজস্ব সংস্কৃতির মধ্যে যে সব উপাদান ও পার্থক্য আছে তাতে কোনভাবেই একে এক জাতির মধ্যে আবদ্ধ করা যায় না। প্রাচীনকালে হিন্দু বলতে বোঝাত ভারতের পশ্চিম অঞ্চলের অধিবাসীদের। এরপর হিন্দুস্তান বলতে বোঝাত মূলত উত্তর ভারত-পাঞ্জাব থেকে বঙ্গদেশ পর্যন্ত এলাকাকে। পরে গোটা ভারতই পরিচিত হয় হিন্দুস্তান বলে। হিন্দু, মুসলমান, জৈন, বৌদ্ধ, খ্রীস্টান, নাস্তিক- সবাই ছিলেন হিন্দুস্তানী। বেদ, মনুসংহিতা, রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদিকে ধর্মগ্রন্থ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ‘হিন্দু’ নামের ধর্মীয় কাঠামো গড়ে ওঠে অনেক পরে।

বিজেপিসহ সংঘ পরিবারের অন্যান্য সংগঠন হিন্দুত্ব বলতে এই বর্ণপ্রথাকে সামনে আনে না। একে ভিত্তি করে জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলাও কঠিন। সংঘ পরিবার নিয়ন্ত্রিত সংগঠনগুলোকে তাই অন্য পথ ধরতে হয়। যার নাম সাম্প্রদায়িকতা। মোদি ও তার অগ্রজ বিজেপি নেতা অটলবিহারী বাজপেয়ী, এল, কে আদভানি, মুরলী মনোহর যোশীরা ‘হিন্দুত্ব’র কোন কোন তত্ত্ব হাজির না করে আর এস এস-এর তথাকথিত হিন্দু জাতীয়তাবাদের নামে সাম্প্রদায়িকতারই উচ্চকণ্ঠ প্রচার করেছিলেন। সে অবস্থান থেকেই তারা উনিশ শ একানব্বই সালে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বাবরী মসজিদ ধ্বংসের কর্মসূচী ঘোষণা ও তার বাস্তবায়ন করেছিলেন। এরই পথ ধরে দু’হাজার দুই সালে গুজরাটের তখনকার মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সুযোগ্য নেতৃত্ব দুই হাজার মুসলমান হত্যার দক্ষ-যজ্ঞটি সম্পন্ন করে। সেখানেও ‘হিন্দুত্ব’র কোন তত্ত্ব ছিল না বরং সরাসরি সাম্প্রদায়িকতার আশ্রয় ছিল। সংঘ পরিবারের ‘হিন্দুত্ব’র অর্থ আসলে নিপাট সাম্প্রদায়িকতা। যার মূল লক্ষ্য ভারতের মুসলমানরা।

কিন্তু এই উগ্র সাম্প্রদায়িকতার প্রতিনিধি নরেন্দ্র মোদির উত্থান কি শুধু সাম্প্রদায়িকতার জোরেই সম্ভব হয়েছে? না ভারতে দীর্ঘদিন ধরে গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও কমিউনিস্ট আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়ার সুযোগে অপ্রতিহতগতিতে বেড়ে উঠেছে বড় পুঁজি ও কর্পোরেট হাউসগুলো। মনমোহন সিংয়ের মন্ত্রিসভা দ্বিতীয় মেয়াদে বড় পুঁজি ও কর্পোরেট হাউসগুলোর দাবি মেটাতে পারেনি। শিল্পায়নের নামে বড় ব্যবসায়ী ও শিল্প পুঁজির জমির চাহিদাও মেটাতে না পারায় তারা ধীরে ধীরে কংগ্রেস থেকে সরে এসে নরেন্দ্র মোদীর পেছনে ভিড় জমিয়েছেন। নরেন্দ্র মোদীর তথাকথিত ‘গুজরাট মডেল’কে প্রচারের ঔজ্জ্বল্যে এনে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে হিমালয় সমান উচ্চতা দেয়ার কাজটি নেপথ্যে তারাই করিয়েছিলেন। যাতে বিভ্রান্ত হয়েছে ভারতের সাধারণ মানুষ। দু’হাজার নয় থেকে তের সাল পর্যন্ত ‘ভাইব্রান্ট গুজরাট’ নামে প্রতিবছর নিয়মিত যে সম্মেলন হয়েছে তাতে অংশ নিয়েছেন অনিল আম্বানী, সুনীল মিত্তাল, রতন টাটাদের মতো শিল্পপতিরা। নরেন্দ্র মোদীকে প্রধানমন্ত্রী করার কথা সে সময় তারা খোলাখুলিই বলেছেন। ভারতীয় দৈনিক ‘দ্যা হিন্দু’র প্রাক্তন সম্পাদক সিদ্ধার্থ বরদারাজন তার এক প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন দু’হাজার নয়ের ভাইব্রান্ট গুজরাট সম্মেলনে অনিল আম্বানী বলেছিলেন, ‘নরেন্দ্র ভাই যখন গুজরাটের জন্য এত ভাল কাজ করেছেন, তখন ভেবে নেয়া যায় উনি দেশের নেতৃত্ব দিলে কি করবেন। গুজরাট তার নেতৃত্বে সব ক্ষেত্রে অগ্রগতি দেখেছে। গোটা দেশও দেখবে আশা করা যায়।’ তারা মোদীকে এত তীব্র সমর্থন দিয়েছিলেন কারণ বুঝেছিলেন গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল প্রতিরোধের এমন শুনশান নীরবতায় মোদীর কাছেই তাদের পুঁজি নিরাপদ থাকবে। মোদীকে সমর্থন দেয়া মানে তারা সমর্থন দিয়েছেন আরএসএস-এর কর্মকা-কে। দু’হাজার চৌদ্দ সালের মে মাসে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতের রাজনীতি উগ্রতার এক ভিন্নমাত্রা পেয়েছে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবকসংঘের আদর্শে উজ্জীবিত বাছা বাছা সদস্যরা বিজেপির শীর্ষ পদে। তারাই এখন রাষ্ট্রেরও শীর্ষ পদে থাকায় আর এস এস-এর আদর্শধন্য অন্য রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর তৎপরতাও বেড়েছে। শুরু থেকেই ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ শিল্পী সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীদের কাছ থেকে প্রতিবাদ এলেও বৃহৎ পুঁজির আশির্বাদধন্য সংগঠন ও ক্ষমতা কাঠামোর প্রচন্ডতার কাছে তাদের অসহায়ত্তই প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু গত প্রায় সতের মাসে একটু একটু করে উগ্রতার যে বিষ জমা হয়েছে মুক্তচিন্তার অনেক লেখক সাহিত্যিকেরই তাতে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়েছে। তাই তারা নিজেদের মতো করে প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে নিয়েছেন। অনেকে এর সমালোচনা করেছেন। কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রী বিজেপি নেতা মহেশ শর্মা তো বলেই ফেলেছেন, সাহিত্য আকাদেমি সরকারী সংস্থা নয়, স্বশাসিত সংস্থা, লেখকদের সংস্থা। লেখকরাই এখানে দেশের লেখকদের পুরস্কার দেন। সেই পুরস্কার কেউ ফেরত দেবে কিনা তা তাদের ব্যাপার। সাংসদ বিজয় গোয়েল আরেক কাঠি বেড়ে বলেছেন, ‘লেখকরা বরং তাঁদের কলমের দিকে নজর দিন। নইলে তারা পুরস্কার থেকে বঞ্চিত হবেন।’ যেন পুরস্কারের আশায়ই লেখকরা লেখেন। লেখকরা সমাজ বিচ্ছিন্ন মানুষ নন। সমাজের অন্যায় অবিচার অনৈতিকতা দেখেও চুপ থেকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর পরামর্শ মত সবার পক্ষে শুধু নিজেদের কলমের দিকে দৃষ্টি আটকে রাখা সম্ভব নয়। যারা পারেননি তারাই পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এর সমালোচনা এসেছে সাহিত্যিকদের মধ্য থেকেও। পশ্চিম বঙ্গের একগুচ্ছ সাহিত্যিক মনে করেন- যে সরকার ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা বাড়াচ্ছে তাদের আমলে তারা সাহিত্য আকাদেমী পুরস্কার পাননি। তাই পুরস্কার ফিরিয়ে দেয়ারও প্রশ্ন ওঠে না।

কেউ তাদের ফেরত দিতে বাধ্যও করছে না। যারা ফেরত দিয়েছেন তারা ব্যক্তিগত উপলব্ধি থেকেই দিয়েছেন। নিজের জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন প্রত্যাহার করার জন্য অনেক বড় মনের প্রয়োজন হয়। হ্যাঁ, এটা ঠিক এ ধরনের প্রতিবাদ হয়তো বড় কোন ফল বয়ে আনতে পারে না। তারপরেও লেখকরা বিবেক দংশন অনুভব করেছেন বলেই এটা করেছেন। একে ছোট করে দেখার কিছু নেই। কোন সরকারের সময় পুরস্কার পেয়েছেন, অন্য সরকারের সময় কেন ফেরত দেবেন- এতসব হিসাব নিকাশ তারা করেননি।

ভারতের প্রতিবাদী সাহিত্যিকদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছে সাহিত্যিকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন পেন ইন্টারন্যাশনাল। সংগঠনের সভাপতি জন র‌্যালস্টোনসোল রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও সাহিত্য আকাদেমীকে চিঠি লিখে ভারতের এখনকার পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পদক্ষেপ নেয়ার আহবান জানিয়েছেন।