২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জাতীয়তাবাদ বিশ্লেষণ করা জরুরী

  • বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর

পার্থ চ্যাটার্জির বইটি খুব সম্ভব সবাই পড়েছেন : ন্যাশনালিস্ট থট এ্যান্ড দি কলোনিয়াল ওয়ার্ল্ড। চ্যাটার্জি বইটিতে দেখিয়েছেন চিন্তা, সংস্কৃতি এবং ক্ষমতার সম্পর্ক। এই সম্পর্কে প্রথমত আছে পরিবর্তনের মাধ্যম হিসেবে চিন্তার প্রশ্ন। দ্বিতীয়ত আছে সমাজের বিদ্যমান সংস্কৃতির সঙ্গে চিন্তার সম্পর্ক। তৃতীয়ত আছে অন্য সংস্কৃতির পরিসরে নতুন সংস্কৃতি বপনের সম্পর্ক। চতুর্থত আছে চিন্তার নতুন ফ্রেমওয়ার্ক সরাসরি যুক্ত প্রভুত্বের সম্পর্কের সঙ্গে। সর্বশেষ চিন্তা ও সংস্কৃতির সম্পর্ক সমাজের অভ্যন্তরের ক্ষমতার পরিবর্তমানতার কিভাবে যুক্ত।

এসব প্রশ্নের অন্তঃসার হচ্ছে ব্যাখ্যার প্রক্রিয়া সম্বন্ধে প্রশ্ন তোলা। সাম্র্রাজ্যবাদের ইতিহাস কিংবা কলোনিয়ালিজমের ইতিহাস জাতীয় অহঙ্কারকে সামনে টেনে নিয়ে আসে। জাতীয় অহঙ্কার হচ্ছে শেষ পর্যন্ত সাংস্কৃতিক ডিসকোর্স। এই ডিসকোর্স একদিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে শক্তিশালী করে রাখে, অন্যদিকে ডি-কলোনাইজিং প্রক্রিয়ার একটি প্যাটার্ন তৈরি করে।

ডি-কলোনাইজিং প্রক্রিয়ার দুটি নজির দেয়া জরুরী। প্রথমটি আমি উল্লেখ করছি ব্রিটিশ আমল থেকে। ব্রিটিশ জমানার শেষ দিকে কলকাতায় রশিদ আলী দিবসের কথা আমি উল্লেখ করছি। সারা কলকাতা সেøাগানে সেøাগানে উত্তাল। হিন্দু-মুসলমান একত্র হয়ে রাস্তায় নেমে পড়েছে। কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, কমিউনিস্ট পার্টি : বিভিন্ন দল বিভিন্ন নয় আর। সব দল এক, গোলাগুলির পরোয়া নেই : মানুষ মানুষ, কলোনিয়ালিজমের ইতিহাসকে এক ধাক্কায় বদলে দিয়েছে। সব দল এক, গোলাগুলির পরোয়া নেই : মানুষ মানুষ, কলোনিয়ালিজমের ইতিহাসকে জাতীয় অহঙ্কারে মুড়ে দিয়েছে। রশিদ আলী দিবস নিয়ে একটি কালজয়ী উপন্যাস লিখেছেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় : চিহ্ন। কলোনিয়াল ডিসকোর্স নয়, ডি-কলোনিয়াল ডিসকোর্স তৈরি করেছেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সেই ডিসকোর্সে তিনি ইতিহাসকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। অনেক কিছুই, কলোনিয়াল এবং পোস্ট-কলোনিয়াল জাতি-রাষ্ট্রের ইতিহাস অবদমিত করা হয়েছে, অনেক কিছুই মুছে ফেলা হয়েছে, যখন জাতীয়তাবাদী ডিসকোর্স নিজের ইতিহাস লিখেছে, যেখানে সাধারণ মানুষ-জাতি লড়াই করেছে অসংলগ্নভাবে, লক্ষ্যহীনভাবে, ব্রিটিশ কলোনিয়াল ইতিহাসের বিরুদ্ধে। জাতীয়তাবাদী ডিসকোর্সের ক্রিটিক এখানেই, সাধারণ মানুষের শক্তির সঙ্গে মতাদর্শিক মাধ্যম যুক্ত করা, নতুন সর্বজনীনতার চেতনার সঙ্গে এসব লড়াই যুক্ত করা। চিহ্ন উপন্যাসটিতে একদিনের লড়াইকে সর্বজনীন করা হয়েছে, জাতীয়তাবাদী ডিসকোর্সের মধ্যে কলোনিয়াল ইতিহাস ডি-কলোনাইজড হয়েছে। আমরা উপন্যাসটা পড়ি এবং ইতিহাসকে অন্যভাবে দেখি।

ডি-কলোনাইজিং প্রক্রিয়ার আর একটি নজির আমি তুলে ধরছি। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে একটা নতুন সর্বজনীনতা নির্মিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে একটি নতুন সর্বজনীনতা দক্ষিণ এশিয়ায় দেখা দিয়েছে। এই সর্বজনীনতার মতাদর্শিক সম্পর্ক ভিন্ন। এই ডিসকোর্স সভ্যতার পক্ষে, মানবাধিকারের পক্ষে, নীতির পক্ষে, সর্বজনীনতার পক্ষে দাঁড়িয়ে আছে। এই মতাদর্শিক মাধ্যম চ্যালেঞ্জ করছে পূর্বতন সর্বজনীনতাকে, যা তৈরি হয়েছে ম্যাথু আর্নল্ড ও আর্নেস্ট গেলনার থেকে। কলোনিয়াল ইতিহাস থেকে আবার তৈরি হয়েছে ধর্মজ উৎসাহ, এই উৎসাহ সেক্যুলারিজমের বিরোধী। বুদ্ধিবাদের বিরোধী বলে ধর্মজ উৎসাহ : হিন্দু-মুসলিম প্রত্যয়ের বিপরীত এক গোঁড়ামির ইতিহাস তৈরি করে দিয়েছে। ডি-কলোনাইজিং প্রক্রিয়ার একটি দিক হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের কর্তৃত্ববাদের বিপক্ষে অবস্থান নেয়া। কর্তৃত্ববাদকে বোঝার চেষ্টা করা, ব্যাখ্যা করা, প্রশ্ন করা : এর অর্থ হচ্ছে ক্ষমতার মুখোমুখি সত্য উচ্চারণ করা। এ কথাটাই এডওয়ার্ড সাঈদ তার রিপ্রেজেন্টেসনস অব দি ইনটেলেকচুয়াল বইটিতে বলেছেন।

বাংলাদেশের সংস্কৃতি কিংবা সাহিত্য হচ্ছে নির্বাসিতদের নিয়ে। বাংলাদেশে যারা সাহিত্য করেছেন, তারা সবাই সভ্যতার পক্ষে কাজ করেছেন অর্ধ-বর্বরতার ভেতর। এমন বর্বরতা কত মানুষকে গৃহহীন করেছে, জমিজমা থেকে উচ্ছেদ করে দিয়েছে, তারা সে ধরনের কবি কিংবা সাহিত্যিক যারা গৃহহীন, ভাষার ভার কাঁধে নিয়ে ঘুরেছেন। এই নির্বাসিত মানুষজন : শামসুর রাহমান অন্যতম, দুঃখের মধ্যে থেকেছেন, এই দুঃখের শেষ নেই। এদের কথাই হারজেন বলেছেন দি রোমান্টিক এগজাইলস সনেট। পূর্বতন এগজাইলস এবং বর্তমানের এগজাইলসের মধ্যে তফাত আছে। আমাদের সময় : আধুনিক যুদ্ধবিগ্রহ, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্রাজ্যবাদ কিংবা দক্ষিণ এশিয়ার সাম্রাজ্যবাদ, যার শিরোমণি ভারত : ভারতের শাসকদের কোয়াসি থিওলজিক্যাল সর্বাত্মকবাদী শাসকদের উচ্চাশা ছোট করে দেখার উপায় নেই। গরুর গোশত খাওয়া নিয়ে যে তুলকালাম চলছে তাকে কি বলব। সত্যিই ভারত হয়ে উঠেছে রিফিউজিদের দেশ, স্থানচ্যুত ব্যক্তিদের মাথা গোঁজার ঠাঁই : যেখানে সংখ্যাগুরুদের অধীন সংখ্যালঘুরা : মুসলমান কিংবা খ্রীস্টান কিংবা আদিবাসী। অধিকার কেবলমাত্র সংখ্যাগুরুদের আছে, অন্যরা অধিকারহীন সংখ্যালঘু।

এই পরিসরে মানবিকতার ধারণা বড় করে দেখা কতদূর পর্যন্ত সম্ভব। একবিংশ শতাব্দীর মাপকাঠিতে, মানবিকতাহীন বাস্তব, কিংবা ইতিহাস নান্দনিকভাবে মেনে নেয়া যায় না। আমাদের অভিজ্ঞতা যে তা-ব তুলে ধরেছে তা নিষ্ঠুর ও নির্মম। এই নিষ্ঠুরতা ও নির্মমতা তৈরি করেছে একদল মানুষ অন্য একদল মানুষের জন্য। লাখ লাখ মানুষ ঐতিহ্য, পরিবার ও ভূগোল থেকে নির্বাসিত হচ্ছে। এই নির্বাসন মেনে নেয়া যায় না। আমাদের রুখে দাঁড়াতে হবে এই নির্বাসনের বিরুদ্ধে।

এই পরিসরেই আমাদের জাতীয়তাবাদ বিশ্লেষণ করা জরুরী হয়ে পড়েছে। জাতীয়তাবাদ কি নির্বাসনের সঙ্গে যুক্ত নয়? বাংলাদেশে, জামায়াতে ইসলামী কি হত্যার মধ্য দিয়ে হত্যার রাজনীতি তৈরি করছে না? বিচারহীন একটা ব্যবস্থার রাজনীতি শক্তিশালী করছে না? জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে একত্র হয়েছে বিএনপি : এই দুই দলের রাজনৈতিকতা মানুষের বিপরীত।

মাহমুদ দারভিসের কবিতা আপনাদের শোনাতে চাই :

আমি নিজেই নির্বাসন।

তোমার চোখ দিয়ে আমাকে বন্ধ করে দাও।

যেখানে তুমি আছ সেখানে নিয়ে চলো-

বা তুমি সেখানে নিয়ে চলো।

আমার মুখের রং তুমি ফিরিয়ে দাও

শরীরের উত্তাপ

হৃদয় ও চোখের আলো,

রুটির নোনা স্বাদ

পৃথিবীর স্বাদ... মাতৃভূমি

তোমার চোখ দিয়ে আমাকে ঢেকে দাও।