২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

টিপিপি চুক্তি গার্মেন্টস খাতে নতুন চ্যালেঞ্জ

  • যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রধান প্রতিযোগী হতে পারে ভিয়েতনাম

এম শাহজাহান ॥ যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে করা ১২ দেশের মধ্যে টিপিপি চুক্তি পোশাক খাতের নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এতে গার্মেন্টস পণ্য রফতানিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী হয়ে উঠতে পারে ভিয়েতনাম। টিপিপি (ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ) চুক্তির ফলে দেশটি বিনা শুল্কে পোশাক রফতানির সুযোগ পেল। আর বাংলাদেশ আগের মতো যুক্তরাষ্ট্রকে ১৬ শতাংশ শুল্ক দেবে। টিপিপি’র ফলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড আর থাকল না। উদ্যোক্তারা বলছেন, চ্যালেঞ্জটা এখানেই। তবে এই চ্যালেঞ্জ উতরে যাওয়ার সক্ষমতাও রয়েছে বাংলাদেশের। ‘কমপ্লায়েন্স’ ইস্যুতে ভিয়েতনামের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। শুধু তাই নয়, গার্মেন্টস পণ্যের গুণগতমান এবং দামে সস্তা হওয়ার কারণে ক্রেতারা থাকবেন বাংলাদেশের সঙ্গেই। এরপরও টিপিপি চুক্তিপরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে এর কি ধরনের প্রভাব পড়তে পারে তার একটি সমীক্ষা করছে রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)। পাশাপাশি পুরো বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে সরকার। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১২টি দেশের মধ্যে সম্প্রতি ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ বা টিপিপি চুক্তি করা হয়েছে। এই চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ব্রুনেই, কানাডা, চিলি, জাপান, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, নিউজিল্যান্ড, পেরু, সিঙ্গাপুর এবং ভিয়েতনাম নিয়ে নতুন এই অর্থনৈতিক জোট গঠন করা হয়েছে। এতদিন ডেইরি পণ্য ও ওষুধশিল্প খাতের সুরক্ষা নিয়ে ১২টি দেশের মতপার্থক্য থাকলেও চুক্তির মাধ্যমে অবশেষে তা দূর হয়েছে। এই চুক্তির ফলে দেশগুলো দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিনাশুল্ক সুবিধা পাবে। ১২টি দেশ বর্তমান বৈশ্বিক বাণিজ্যের ৪০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে।

উদ্যোক্তারা বলছেন, এ চুক্তির ফলে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হচ্ছে ভিয়েতনাম। টিপিপিতে থাকায় দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিনা শুল্কে তৈরি পোশাক রফতানি করতে পারবে। এতে বাংলাদেশের পোশাক খাতে নতুন সঙ্কট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জানতে চাইলে এ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদ জনকণ্ঠকে বলেন, টিপিপি’র ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভিয়েতনাম প্রধান প্রতিযোগী হয়ে উঠতে পারে। কারণ বাংলাদেশ ১৬ শতাংশ শুল্ক দিলেও ভিয়েতনাম বিনাশুল্কে রফতানি করতে পারবে। এতে ভিয়েতনামের তৈরি পোশাক কম মূল্যে কিনতে পারবেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা। ফলে ওদের মার্কেট বড় হওয়ার সুযোগ তৈরি হলো। এতে একটি চাপ তৈরি হলো গার্মেন্টস খাতের উপর। তিনি বলেন, তবে এখানে একটি শর্ত দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পোশাকের কাঁচামাল নিজ দেশে না থাকলেও তা যুক্তরাষ্ট্র থেকেই আনতে হবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কাঁচামাল এনে আবার সেই পণ্য ওই দেশটিতে রফতানি করে মুনাফা করা ততটা সহজ বিষয় নয়। এছাড়া কারেন্সির দরপতনের বিষয়টি রয়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে কমদামে গুণগতমানের পোশাক নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। কারখানা কমপ্লায়েন্স এবং কাঁচামাল তৈরিতে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে। ফলে সবকিছু বিবেচনায় নিলে টিপিপির চ্যালেঞ্জ গ্রহণের সক্ষমতা রয়েছে

বাংলাদেশের। শুধু তাই নয়, চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যে ৫০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানি করা হবে।

জানা গেছে, টিপিপি’র ফলে পোশাকখাতে কি ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে তার একটি সমীক্ষা প্রতিবেদন তৈরি করছে ইপিবি। আগামী সপ্তাহ নাগাদ এই প্রতিবেদন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হবে। এছাড়া এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি বৈঠকও করা হয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে-এই চুক্তির ফলে শর্তের বেড়াজালে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের মতো অনেক দেশের বাজার হারাতে পারে বাংলাদেশ। এই দেশগুলো নিয়ে সৃষ্ট মুক্তবাজারের আকার হবে ৩০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বর্তমান বিশ্বের মোট জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ। এছাড়া সম্প্রতি ফিলিপিন্স, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া এ জোটে অন্তর্ভুক্তির আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন জনকণ্ঠকে বলেন, টিপিপি চুক্তির ফলে দেশের পোশাক খাতে কি ধরনের প্রভাব পড়ে তার একটি সমীক্ষা করা হচ্ছে। এছাড়া এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে স্টেক হোল্ডারসহ বিশেষজ্ঞদের মতামত নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এই চুক্তির ফলে ভিয়েতনাম বিনাশুল্কে পণ্য রফতানির সুযোগ পাবে। বিপরীতে বাংলাদেশকে আগের মতোই শুল্ক গুনতে হচ্ছে। সমস্যাটা এখানেই। তারপরও টিপিপি চুক্তিতে যেসব শর্ত দেয়া হয়েছে তা প্রতিপালনে সক্ষম নয় ভিয়েতনাম। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন নই। কমপ্লায়েন্স ইস্যুতে বাংলাদেশের সক্ষমতা এখন ভিয়েতনামের চেয়ে অনেক বেশি। তিনি বলেন, পুরো পরিস্থিতি সরকার পর্যবেক্ষণ করছে। তবে এই চুক্তির ফলে তাৎক্ষণিক কোন প্রভাব না পড়লেও দীর্ঘমেয়াদে সঙ্কট তৈরি হতে পারে। এ কারণে পরিস্থতি মোকাবেলায় কৌশল নির্ধারণ করছে সরকার।

টিপিপি চুক্তি বাস্তবায়নে বড় বাধা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানিগুলোর স্বার্থ ও মুনাফা সংরক্ষণে দেশটির অনমনীয় অবস্থান। যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, বায়োলজিকস অথবা জীবন্ত উপকরণ থেকে প্রতিষেধক উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে ১২ বছর পর্যন্ত মেধাস্বত্ব সংরক্ষিত থাকে। কিন্তু বিশ্বের সিংহভাগ দেশে এ ধরনের বিষয়ে একচেটিয়া স্বত্বের মেয়াদ পাঁচ বছর। টিপিপি আলোচনায় অংশ নেয়া দেশের সরকারগুলো যেমন এতে আপত্তি জানিয়েছে, তেমনি বেশ কিছু নাগরিক সংগঠনও এতে উদ্বেগ প্রকাশ করে। যুক্তরাষ্ট্রের এই শর্ত মানতে টিপিপি’র অংশীদার বেশ কয়েকটি দেশকে নিজেদের মেধাস্বত্ব সংরক্ষণ আইন ও নীতিমালায় পরিবর্তন আনতে হবে বলে বিশেষজ্ঞরা তাগিদ দিয়েছেন। বাণিজ্য-সংক্রান্ত মেধাস্বত্ব চুক্তির (ট্রিপস) ফলে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলো নিজস্ব মেধাস্বত্ব আইনের আওতায় উন্নত বিশ্বের প্রযুক্তি ব্যবহার করে আসছিল। কিন্তু টিপিপিতে বাণিজ্য সম্পর্কিত মেধা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এখন বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থে উন্নত প্রযুক্তি কিনতে হবে। ফলে বাংলাদেশের কৃষি খাত ও ওষুধশিল্প এতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আর এসব দিক বিবেচনায় নিয়ে ইতোমধ্যে ট্রিপসের মেয়াদ বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ।