২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

করুণ দশায় মিসরের উদারপন্থীরা

  • মুসান্না সাজ্জিল

চলতি মাসের শেষের দিকে মিসরে নতুন পার্লামেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফা ভোট প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রেসিডেন্ট আবদুল ফাতাহ আল সিসি এটাকে গণতন্ত্রের পথে চূড়ান্ত পদক্ষেপ বলে দাবি করলেও বাস্তবে এর মধ্য দিয়ে একটা রাবারস্ট্যাম্প পার্লামেন্টের আবির্ভাব ঘটতে যাচ্ছে।

মিসরের উদারপন্থীরা এই নির্বাচনে অংশ নিলেও তাদের ভাল করার সম্ভাবনা নেই। ২০১১ সালে স্বৈরশাসক হোসনি মোবারককে গণঅভ্যুত্থানে উৎখাত করা হয়। ওই অভ্যুত্থানে যে শক্তিগুলো নিয়ামক ভূমিকা পালন করেছিল দেশকে গনতন্ত্রের পথে নিতে এখন তাদের ক্ষমতার পচিয় পাওয়া তো দূরের কথা, আগ্রহটুকু পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। কেন এমন হল? কী কারণে তারা গণতন্ত্রের ব্যাপারে নিস্পৃহ হয়ে গেল?

গতবারের পার্লামেন্ট নির্বাচন ছিল অবাধ। তাতে বিজয়ী হয় মুসলিম ব্রাদারহুড। প্রেসিডেন্ট হন মুরসি। বছর গড়াতে না গড়াতেই জেনারেল সিসি প্রেসিডেন্টকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করেন। ব্রাদারহুড গণতন্ত্র নস্যাত করছে এই যুক্তিতে উদারপন্থীদের একটি বড় অংশ সে সময় জেনারেল সিসির হাতে প্রেসিডেন্ট মুরসির উৎখাতকে সমর্থন যুগিয়েছিল। সিসির সৈন্যরা বিক্ষোভরত ইসলামপন্থীদের গুলি করে হত্যা করার সময় তারা মৌনতা অবলম্বন করেছিল। এরপর উদারপন্থীদের নিজেদের মধ্যে কোন্দল শুরু হয়ে যায়। অন্তর্কলহে জর্জরিত এই উদারপন্থীরা জনগণের কাছে আবেদন হারিয়ে ফেলে। এখন মিসর যখন আবার স্বৈরাচারের দিকে ফিরে যাচ্ছে সেটা প্রতিরোধ করার ব্যাপারে এই উদারপন্থীদের অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে।

বাস্তব অবস্থা হলো, অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে সিসি ব্রাদারহুডকে নিষ্ঠুরভাবে দমন করার পর উদারপন্থীদের ওপর চড়াও হন। তাদের কণ্ঠরোধ করেন। নিরাপত্তা সংস্থাগুলো উদারপন্থী রাজনীতিক ও কর্মীদের তাড়া করে ফেরে। মিডিয়ার ওপর নানান ধরনের বিধিনিষেধ আরোপিত হয়। বিক্ষোভ সমাবেশ নিষিদ্ধ হয়। এনজিওগুলোকে কঠিন বেড়াজালে বেঁধে রাখা হয়। এসব নিপীড়নমূলক ব্যবস্থার পেছনে প্রায়শই নিরাপত্তার দোহাই পাড়া হয়। হাজার হাজার মানুষ কারাগারে ধুঁকতে থাকে। এদের বেশিরভাগই ব্রাদারহুডের সদস্য, যে দলটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

উদারপন্থীদের প্রবল প্রতিপক্ষ ব্রাদারহুড দৃশ্যপটে নেই। কিন্তু তাতে উদারপন্থীদের কোন লাভ হচ্ছে না। নির্বাচনে তাদের ভাল করার সম্ভাবনা নেই। অংশত এর কারণ হলো নতুন নির্বাচনী আইন। মিসরের পার্লামেন্ট গঠিত হবে ৫৯৬ সদস্য নিয়ে। তিন-চতুর্থাংশ সদস্য একক প্রার্থী ব্যবস্থায় নির্বাচিত হবেন। এখানে বিত্তবান, ক্ষমতার উপরমহলের সঙ্গে ভাল যোগাযোগ থাকা লোকজন এবং শাসকগোষ্ঠীর অনুগতরা প্রায়ক্ষেত্রেই ভোট কিনে নেবেন। আরও ২০ শতাংশ সদস্য আসবেন পার্টি তালিকা থেকে। আগের পার্লামেন্টের বেশিরভাগ সদস্য এভাবেই নির্বাচিত হতেন। সিসি নিজে ৫ শতাংশ সদস্যকে মনোনীত করবেন। তার মানে হোসনি মোবারকের সময় যেমন ছিল তেমনি একটি রাবারস্ট্যাম্প পার্লামেন্ট হবে।

এ অবস্থায় উদারপন্থীদের নির্বাচনে ভাল করার কথা নয়। তবে শুধু নির্বাচনী আইন এ জন্য দায়ী তা নয়। আগের নির্বাচনেও তারা যে তেমন ভাল করেনি তা নয়। তখন সেক্যুলার ও গণতন্ত্রপন্থী দলগুলো এক-তৃতীয়াংশেরও কম ভোট পেয়েছিল। এই দলগুলো ছিল নবীন ও অনভিজ্ঞ। ভোটারদের সংগঠিত করতে পারার দীর্ঘ ইতিহাসের অধিকারী ব্রাদারহুডের কাছে তারা পাত্তা পাননি। গত ৬০ বছর ধরে এ দেশে সত্যিকারের কোন রাজনৈতিক দল না থাকায় এ দলগুলো অনেককিছুই শেখেনি।

সরকারবিরোধী শক্তি হিসেবে ভাল ভূমিকা পালন করলেও মিসরের উদারপন্থীরা একজন নেতার পেছনে বা একটা প্ল্যাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি। বিগত পার্লামেন্ট নির্বাচনে তাদের ভোট বিভিন্ন দলের মধ্যে বিভক্ত হয়ে যায়, যে দলগুলোর কোনটাই দ্বিতীয় পর্বের ভোটে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এটা বিপ্লবী আন্দোলনের মধ্যে বড় ধরনের বিভক্তির পরিচায়ক।

উল্লেখ করা যেতে পারে যে, মোবারককে উৎখাত করার সংগ্রামে যারা অংশ নিয়েছিল তারা ছিল ছাত্র, শ্রমিক, ইউনিয়ন সদস্য, ইসলামপন্থী- এককথায় বিভিন্ন মত-পথের লোক। তাদের প্রত্যেকের নিজ নিজ এজেন্ডা ছিল। পরবর্তীকালে যে রাজনৈতিক দলগুলো গড়ে ওঠে তাদের অর্থনৈতিক, ধর্মীয় ও গণতান্ত্রিক চেতনাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে যথেষ্ট মতপার্থক্য ছিল। উদারপন্থী শব্দটা দ্বারা অনেক সময় সেক্যুলার শক্তিকে বোঝানো হয়। কিন্তু যে রাজনৈতিক দলগুলো আবির্ভূত হয়েছিল সেগুলোতে সমাজতন্ত্রী থেকে মুক্তবাজার অর্থনীতির সমর্থক পর্যন্ত নানা মত ও পথের মানুষ ছিল। এদের মধ্যে ব্যবধান ঘোচানোর জন্য তেমন কোন চেষ্টা চালানো হয়নি। এবারের নির্বাচনে সকল বিপ্লবী শক্তি একটি নির্বাচনী মোর্চায় ঐক্যবদ্ধ হবে- এমন প্রত্যাশা করা হলেও শেষ পর্যন্ত তা ধূলিস্যাত হয়ে গেছে।

এককভাবে উদারপন্থী দলগুলোর টিকে থাকাও বেশ দায় হয়ে পড়েছে। বেশকিছু দল অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ক্ষতবিক্ষত। কনস্টিটিউশন পার্টির প্রধান হলেন শুকরুল্লাহ। দলীয় মতপার্থক্য ও জটিলতার বিষচক্রের কথা উল্লেখ করে গত আগস্ট মাসে তিনি পদত্যাগ করেন। ২০১২ সালে মোহাম্মদ আল বাবাদি দলটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এবারের নির্বাচনে অংশ নেয়া এবং সিসির প্রতি ভূমিকা নিয়েই মূলত দলটিতে মতভেদ দেখা দেয়। দলের অভ্যন্তরে মেরুকরণ এবং আরও অনেক সমস্যার কারণে অতিসম্প্রতি সোশ্যালিস্ট ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রধানও পদত্যাগের চেষ্টা করেন। বহু কষ্টে সেটা ঠেকানো হয়। মিসরের সবচেয়ে পুরনো দল এবং গতবারের নির্বাচনে তৃতীয় স্থানে থাকা ওয়াফদ পার্টির নেতা আল সাইদ আল কাদারির বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।

দলীয় কোন্দল ছাড়াও উদারপন্থী দলগুলোর একটা অভিন্ন সমস্যা অর্থ সঙ্কট। গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত নতুন দলগুলোর পেছনে কিছু ব্যবসায়ী অর্থ-সম্পদ ঢাললেও হালে তারা সরকারের রোষানলে পড়ার আশঙ্কা থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিয়েছে। দলীয় কোন্দল ও অর্থ সঙ্কট ছাড়াও লিবারেল দলগুলোর আরেক সমস্যা ভোটারদের বিশেষত গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে তুলতে না পারা, যে কারণে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যা সমাধানে তাদের ভাবনা ও কর্মসূচী সম্পর্কে জনগণের ভাল ধারণা নেই। এ অবস্থায় উদারপন্থীদের গণতন্ত্রের আবেদন মিসরীয়দের কাছে বাসি হয়ে গেছে। তারা সিসির বিষয়েই অধিক স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। আর কিছু না হলেও কয়েক বছরের টালমাটাল ও অস্থিরতার পর সিসি দেশবাসীকে অন্তত স্থিতিশীলতা দিতে পেরেছেন। এখানেই তার যত সাফল্য।

সূত্র : দ্য ইকোনমিস্ট