২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

তাজিয়া মিছিল থেকে নাশকতার পরিকল্পনা!

  • ৩১ বিহারী ক্যাম্পে রেড এ্যালার্ট

গাফফার খান চৌধুরী ॥ ঢাকার ৩১ বিহারী ক্যাম্পে হাই রেডএলার্ট জারি করা হয়েছে। দেশের অন্যত্র থাকা ৩৯টি ক্যাম্পের ওপর চলছে বিশেষ গোয়েন্দা নজরদারি। আগামী ২৩ ও ২৪ অক্টোবর ঢাকার ক্যাম্পগুলো থেকে অন্তত ২০টি বিশাল ঝটিকা তাজিয়া মিছিল বের করার প্রস্তুতি চলছে। স্বাধীনতা বিরোধীরা এখাতে মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করছে। এজন্য জোরেশোরেই প্রস্তুতি চলছে। তাজিয়া মিছিল থেকে নাশকতা চালিয়ে নতুন করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাজিয়া মিছিলের নেতৃত্বদানকারী ও বিহারী নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কয়েক দফায় জরুরী বৈঠকও করেছে। বৈঠকে এমন আতঙ্কের কথা জানানো হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, তাজিয়া মিছিল বাস্তবায়ন কমিটি এবং আটকেপড়া পাকিস্তানী নেতৃবৃন্দের তরফ থেকে। তাজিয়া মিছিলের নেতৃত্বদানকারী শতাধিক জনের তালিকা প্রস্তুত করে তাদের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি চালানো হচ্ছে।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ৬টি বিহারী ক্যাম্প ঘুরে বিভিন্ন জনের সঙ্গে কথা বলে এবং গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে। ঢাকার ক্যাম্পগুলোতে অন্তত ৫০টি মাজার রয়েছে। এর মধ্যে মোহাম্মদপুরের বিহারী ক্যাম্পগুলোর মাজারে সাজ সাজ রব পড়ে গেছে।

জহুরী মহল্লা, জয়েন্ট স্টাফ কোয়ার্টার ক্যাম্প, মার্কেট ক্যাম্পসহ ৬টি বিহারী ক্যাম্প ঘুরে দেখা গেছে তাজিয়া মিছিলের পোশাক-পরিচ্ছদ পরিষ্কার করে শুকানো হচ্ছে। মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের নানাভাবে ঝালিয়ে নিচ্ছেন। উঠতি যুবকসহ নানা বয়সীদের মধ্যে তাজিয়া মিছিল নিয়ে বাড়তি উত্তেজনা বিরাজ করছে। আশপাশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো তাজিয়া মিছিলের জন্য টাকা পয়সা দিচ্ছে। অনেক যুবক টাকা পয়সা তুলছে।

মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটসংলগ্ন ক্যাম্পের কয়েক যুবকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, আগামী শুক্রবারই শুরু হচ্ছে তাজিয়া মিছিল। এজন্য প্রায় সব আয়োজন শেষ। শুক্রবার দুপুরের পর থেকেই তাজিয়া মিছিল শুরুর কথা জানাল যুবকরা। অনেক রাত পর্যন্ত তাজিয়া মিছিল চলবে। শনিবার সকাল থেকেই আবার শুরু হবে। দীর্ঘ সময় টানা তাজিয়া মিছিল হবে। তাজিয়া মিছিলে শিয়া ও সুন্নি সবাই যোগদান করে থাকেন। এমন চিত্র মিরপুরের বিহারী ক্যাম্পগুলোতেও।

গত রবিবার মোহাম্মদপুরের সূচনা কমিউনিটি সেন্টারে স্থানীয় সরকারের সাবেক প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের নেতৃত্বে, ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার, তাজিয়া মিছিল বাস্তবায়ন কমিটি, বিহারী নেতৃবৃন্দ, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে বৈঠক হয়। বৈঠকে তাজিয়া মিছিল থেকে তৃতীয় কোন গোষ্ঠী সরকার ও আটকেপড়া পাকিস্তানীদের বেকায়দায় ফেলতে নাশকতা চালাতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। নাশকতা এড়াতে শুক্রবার রাত ১২টার পর তাজিয়া মিছিল বের করার প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।

এ ব্যাপারে তেজগাঁও জোনের উপকমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার জনকণ্ঠকে বলেন, নাশকতার বিষয়ে তারা আটকেপড়া পাকিস্তানীদের বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে সজাগ থাকার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি তাজিয়া মিছিল বাস্তবায়ন কমিটির নেতৃবৃন্দকে বিশেষভাবে সতর্ক করা হয়েছে। শুক্রবার রাত ১২টার পর তাজিয়া মিছিল বের করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। তাজিয়া মিছিলের আড়ালে বা ভেতরে ঢুকে তৃতীয় কোন গোষ্ঠী নাশকতা চালিয়ে যাতে সরকার ও আটকেপড়া পাকিস্তানীদের বেকায়দায় ফেলতে না পারে এজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যাপকভাবে তৎপরতা চালাচ্ছে। ক্যাম্পগুলোকে ঘিরে বিশেষ গোয়েন্দা নজরদারি চলছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত রবিবার সূচনা কমিউনিটি সেন্টারে বৈঠকের পর গত সোমবার মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যানে আশুরার কর্মসূচী নিয়ে প্রস্তুতি সভা হয়। অনেকটা গোপনেই রাত ৮টায় সেই সভা শুরু হয়। আশুরার দিন কি কি কর্মকা- হবে সে বিষয়ে বিস্তারিত বয়ান হয় সভায়। প্রথম দফার বয়ান চলে এশার নামাজের আগ পর্যন্ত। এশার নামাজের পর আবার বয়ান শুরু হয়। চূড়ান্ত সেই বয়ান চলে রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত। সেই সভায় বিভিন্ন ইসলামী দল ও সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ছাড়াও ঢাকার বিভিন্ন মাদ্রাসার বিভিন্নস্তরের আলেম ওলামারা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন আটকেপড়া পাকিস্তানীদের মধ্যে তাজিয়া মিছিল বাস্তবায়নকারী কমিটি ও আটকেপড়া পাকিস্তানীদের বিভিন্ন সংগঠনের কতিপয় নেতৃবৃন্দও। তাজিয়া মিছিলের বিষয়ে মিরপুরের ২৫টি বিহারী ক্যাম্পগুলোতেও চলছে জোরালো প্রস্তুতি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোঃ কাইয়ুমুজ্জামান খান জনকণ্ঠকে বলেন, সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এবার তাজিয়া মিছিল বিহারী ক্যাম্পগুলোর আশপাশেই সীমাবদ্ধ রাখতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নাশকতার আশঙ্কার বিষয়টি মাথায় রেখেই ইতোমধ্যেই কয়েক দফায় বিহারী নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠক করেছেন। তাজিয়া মিছিলে ঢুকে যাতে কোন গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে নাশকতা চালাতে না পারে এজন্য গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়েছেন। পাশাপাশি নিরাপত্তা জোরদার রয়েছে। বিহারী ক্যাম্পগুলো ঘিরে তৈরি করা হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা বলয়। চলছে কড়া গোয়েন্দা নজরদারি।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, এবার আটকেপড়া পাকিস্তানীদের আড়ালে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। যা একেবারেই পরিকল্পিত। বিশেষ একটি গোষ্ঠী বিহারীদের আড়ালে এমন অপতৎপরতা চালাচ্ছে। তারই অংশ হিসেবে চক্রটি গত শনিবার মোহাম্মদপুরের একটি বিহারী ক্যাম্পে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। যা পরিকল্পিত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাদা পোশাকের একটি দল বিহারী ক্যাম্পে অভিযানে যায়। পেছনে পোশাকধারী একটি দল সাদা পোশাকধারী দলকে অনুসরণ করতে থাকে। সাদা পোশাকধারীরা ক্যাম্পের ভেতরে ঢুকামাত্র তাদের ওপর সংঘবদ্ধ হয়ে হামলা চালায়। সাদা পোশাকধারীরা নিজেদের পরিচয় দেয়ার পরও তাদের ধাওয়া করা হয়। এক পর্যায়ে হামলাকারীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাদা পোশাকধারী সদস্যদের এবং পোশাকধারী সদস্যদের গাড়িতে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে ভাংচুর চালায়। শেষ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।

একাধিক গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, এবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্দেশ অমান্য করে তাজিয়া মিছিল নির্ধারিত জায়গার ভেতরে না থাকার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। পরিকল্পিতভাবে নাশকতার উদ্দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্দেশ অমান্য করা হতে পারে। মিছিল নির্ধারিত সীমানার মধ্যে থাকা না থাকা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে মিছিলকারীদের ভেতরে থেকে পরিকল্পিতভাবে ঝামেলা সৃষ্টির চেষ্টা হতে পারে। মিছিলে যোগ দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন ক্যাম্পের আশপাশে থাকা উগ্র মৌলবাদী ও জঙ্গী সংগঠনের সদস্যরাও। তারাই তাজিয়া মিছিলকে পুঁজি করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে নাশকতা চালাতে পারে। বিশেষ করে দুই বিদেশী হত্যার পর নতুন করে আবার বাংলাদেশকে বেকায়দায় ফেলতে এমন অপতৎপরতা চালানো হতে পারে। তাজিয়া মিছিল থেকে সরকার বিরোধী সেøাগান তুলে দেয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে। এজন্য সরকারবিরোধী চক্র কাজ করছে। গত বছর ১৩ জুন পবিত্র শব-ই-বরাতের রাতে মিরপুরের কালশী বিহারী ক্যাম্পে আগুন দিয়ে ১০ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। দীর্ঘদিনের পানি ও বিদ্যুত নিয়ে সৃষ্ট সমস্যার সুযোগ নিয়ে সরকার বিরোধীরা বিহারীদের একটি অংশকে সঙ্গে নিয়ে পরিকল্পিতভাবে ১০ জনকে হত্যার ঘটনা ঘটিয়েছিল বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে।

এ ব্যাপারে র‌্যাবের লিগ্যাল এ্যান্ড মিডিয়া বিভাগের কর্মকর্তা কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান জনকণ্ঠকে বলেন, সারাদেশে থাকা বিহারী ক্যাম্পগুলোর ওপর তারা গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়েছেন। পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ক্যাম্পের আশপাশে বাড়তি ফোর্স মোতায়েন করা হয়েছে।