২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিদায় বললেন জহির খান

  • মোঃ নুরুজ্জামান

ক্রিকেট ভাগ্য বিধাতার খেলা বোঝা দায়। মাঠ থেকে অবসরের সুযোগ হলো না আধুনিক ভারতের অন্যতমসেরা পেসার জহির খানের। বুঝলেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরার কোন সম্ভাবনাই নেই। তাই তো মাঠের বাইরে থেকেই ইতি টানলেন। জহিরের বক্তব্যেই তো সেটি পরিষ্কার, ‘বৃহস্পতিবার সব ফরমেটের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দেন জহির। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি আসন্ন মৌসুম সামনে রেখে অনুশীলন করছিলাম। বুঝতে পারছিলাম আমার কাঁধটা আসলে দৈনিক ১৮ ওভার বোলিং করার মতো যথেষ্ট সমর্থন দিতে সক্ষম নয়। আর এটা বোঝার পরই আমি উপলব্ধি করলাম সময় হয়ে গেছে অবসর নেয়ার। এরই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় আমি আমার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানাচ্ছি। আমি ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লীগের (আইপিএল) নবম আসর খেলেই ঘরোয়া ক্রিকেট থেকেও সরে দাঁড়াতে চাই।’ বৃহস্পতিবার অবসরের সিদ্ধান্ত জানিয়ে বলেন তিনি।

২০০ ওয়ানডে, ৯২ টেস্ট আর ১৭ টি২০ খেলা জহির দীর্ঘদিন ফর্মহীনতায় দলে আর ফিরতে পারেননি। শেষদিকে ইনজুরিও দানা বেঁধেছিল তাঁর শরীরে। তবে চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছিলেন। তরুণ উদীয়মানদের উঠে আসায় লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত জিততে পারলেন না। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায়ই বলে দিলেন মহারাষ্ট্রের এ বাঁহাতি পেসার। ৩৭ বছর বয়সী জহিরের ক্যারিয়ারে ইতি টানার পর তাঁর সাবেক সতীর্থ লিটল মাস্টার শচীন টেন্ডুলকর ও বর্তমানে স্বল্প পরিসরের দলনেতা মহেন্দ্র সিং ধোনী স্তুতিবাক্য উচ্চারণ করেছেন। ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের (বিসিসিআই) কর্মকর্তারাও এ পেসারের বিদায়ের পর সম্মান জানিয়ে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন তাঁকে। যখন ভারতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক হলেন সৌরভ গাঙ্গুলী, ভরসার নাম হয়ে উঠলেন জহির।

সৌরভের পর ভারতের কা-ারী ধোনীর ব্রহ্মাস্ত্রে পরিণত হলেন এ বাঁহাতি। জহিরের দুর্দান্ত নৈপুণ্যেই ২৮ বছর পর ২০১১ সালে আবার ওয়ানডে ক্রিকেটের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয় ভারত। সেবার সর্বাধিক উইকেট (২১ উইকেট) শিকারি ছিলেন তিনি। ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসে সর্বকালের সেরা বোলারদের কাতারে নিজেকে অধিষ্ঠিত করতেও সময় লাগেনি তাঁর। ভারতের হয়ে টেস্ট ক্রিকেটে পেসারদের মধ্যে উইকেট শিকারে দ্বিতীয় এবং সার্বিকভাবে চতুর্থ অবস্থানে তিনি। ৯২ টেস্টে শিকার করেছেন ৩২.৯৪ গড়ে ৩১১ উইকেট। পেসারদের মধ্যে তাঁর ওপরে শুধু কপিল ৪৩৪ উইকেট নিয়ে। ওয়ানডে ক্রিকেটে ভারতের ইতিহাসে পেস বোলারদের মধ্যে শ্রীনাথ ও অজিত আগারকারের পরই তাঁর স্থান এবং সার্বিকভাবে এ ফরমেটেও চার নম্বরে। ২০০ ওয়ানডেতে ২৯.৪৩ গড়ে ৮২ উইকেট। এর মধ্যে ২০১১ বিশ্বকাপের দুর্দান্ত নৈপুণ্যটার কথা যুগ যুগ ভুলতে পারবে না গোটা ভারতের মানুষ।

স্পিননির্ভর ভারতীয় দলও যে পেস আক্রমণ দিয়ে প্রতিপক্ষকে ভয়ের মধ্যে রাখতে পারে সেটার প্রমাণ হয়ে বিশ্ব ক্রিকেটে গতির আতঙ্ক নিয়ে এসেছিলেন জহির। ২০০০ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে (ওয়ানডে ও টেস্ট) অভিষেকের পর এক যুগেরও বেশি সময় ধরে দলের অন্যতম নির্ভরতার প্রতীক ছিলেন গাঙ্গুলী ও সৌরভের অজস্র সাফল্য পাওয়ার মূল পথিকৃৎ। জহিরের নাম ভুলে যেতে সময় লাগেনি। ২০১২ সালে শ্রীলঙ্কা সফরে ক্যারিয়ারের সর্বশেষ ওয়ানডে খেলেছিলেন। আর গত বছর ওয়েলিংটনে স্বাগতিক নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেলেছিলেন টেস্ট। ওই টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে ৫ উইকেট শিকারের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছিলেন ফুরিয়ে যাননি। তবে জহিরকে থামিয়ে দিল ইনজুরি। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে নিজেকে আর প্রমাণ করতে পারেননি, বয়সটাও বেড়ে গিয়েছিল। এরপরই বুঝে গেছেন আসলে লড়াইটা চালিয়ে যাওয়ার সময় এখন আর নেই। সময় হয়ে গেছে বিদায়ের! এ বিষয়ে জহিরের কোচ বলেন,‘ নিজের সেরাটা দেয়ার জন্য সেটা যথেষ্ট নয় বলেই সে সরে দাঁড়াল।’

অর্থাৎ আগামী বছর শুধু আইপিএল টি২০ খেলবেন জহির। তারপর সবধরনের ক্রিকেট থেকেই বিদায় নেবেন। ১৭ আন্তর্জাতিক টি২০ খেলে ১৭ উইকেট শিকার করেছিলেন তিনি। জহিরের অবসর ঘোষণার পর কিংবদন্তি শচীন বলেন, ‘বিশ্বের অন্যতম সেরা ঠা-া মস্তিষ্কের পেসার হিসেবে মনে করি তাঁকে। আমি আশা করি তিনি তাঁর পরবর্তী জীবনটাও অনেক ভাল কাটাবেন।’ ধোনী বলেন, ‘টিম ইন্ডিয়ার অধিকাংশ সেরা সাফল্যগুলো পাওয়া কঠিন হয়ে যেতে জহিরের অবদান ছাড়া।’ বিসিসিআইয়ের বর্তমান সভাপতি শশাঙ্ক মনোহর বলেন, ‘ভারতীয় ক্রিকেটে জহিরের দুর্দান্ত অবদানের জন্য বিসিসিআই তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে। তিনি দারুণ আত্মপ্রত্যয়ী ও নিবেদিত প্রাণ একজন ক্রিকেটার হিসেবে ভারতের ক্রিকেটকে প্রচুর অর্জন এনে দিয়েছেন। উপমহাদেশে একজন ফার্স্ট বোলার হওয়া খুব চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু তিনি এর ব্যতিক্রম। ভবিষ্যতে তাঁর জন্য শুভ কামনা।’

ভারত কি সহসা আরেকজন জহির খান পাবে, স্থানীয় ক্রিকেটে এখন এই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। জহির নিজে বলছেন উমেষ যাদবের কথা, ‘দীর্ঘ ক্যারিয়ারে আমি অনেক বোলারের সঙ্গে খেলেছি। শেষ দিকে এসে যাদবকে চমৎকার মনে হয়েছে। যে কোন কন্ডিশনে সফল হওয়ার ক্ষমতা ওর রয়েছে। ২৫ বছর বয়সী একটা ছেলে ১৫ টেস্টে ৪৮ এবং ৫২ ওয়ানডেতে ৭২ উইকেট নেয়া বড় কিছুর ইঙ্গিত দেয়। পেসারদের প্রধান শত্রু ইনজুরি। ফিট থাকলে এক সময় ও নাম্বার ওয়ান হবে।’ পেস, দক্ষতা না ফিটনেস, একজন পেসারের জন্য কোনটা আগে? জহির বলেন ‘সব কিছুর সমন্বয় হতে হবে। সবটাই গুরুত্বপূর্ণ। আমি মনে করি আপনি বয়সে যখন তরুণ থাকবেন তখন উচিত যত দ্রুত গতিতে বল করা যায়। গতির জন্য ওটাই সঠিক সময়। যত বেশি খেলবেন তত বেশি দক্ষতা অর্জন করবেন। সুতরাং তিনটি জিনিসই প্রয়োজন। তবে সময়ের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে সেটা করতে হবে।’

ভবিষ্যতে কোচ হবেন কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও যোগ করেন, ‘এখনই সেটা বলার সময় আসেনি। তবে যে কোনভাবেই হোক আমি ক্রিকেটের সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে চেষ্টা করব। খেলাটির সঙ্গে থাকলে আপনি অনেক কিছুই করতে পারেন। যখন খেলেছি দেশকে ভাল বেসেছি, তবে অবসরে কেন নয়? এখনি না হলেও বিষয়টি আমার ভাবনায় থাকছে।’