১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

উৎসবমুখর পরিবেশে অতিবাহিত হলো অষ্টমী পূজা

উৎসবমুখর পরিবেশে অতিবাহিত হলো অষ্টমী পূজা
  • রামকৃষ্ণ মিশনে আকর্ষণ ছিল কুমারী পূজা

স্টাফ রিপোর্টার ॥ সকাল থেকে গাঁদাফুল আর বেলপাতায় সজ্জিত আসনটি মনোযোগ কেড়েছিল ভক্তদের। সারাক্ষণই চলছে ঈশ্বর বন্দনা, ঢাক-ঢোল আর কাঁসরের সুরের মৌতাত সঙ্গে সুরেলা উলুধ্বনি। উৎসবমুখরতার আবেশে হাজারো ভক্তের পদচারণা যোগ করেছিল বাড়তি মাত্রা। বেলা বাড়তে রাজধানীর রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠের পূজাম-প থেকে শুরু করে সেই ভিড় ছড়িয়ে পড়লো আশপাশের অলিগলিতে। ঘড়ির কাঁটায় যখন ঠিক বেলা ১১টা ভক্তদের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে এলেন এবারের ‘কুমারী মাতা’ প্রণীতা। সঙ্গে সঙ্গেই মায়ের বন্দনায় চারিধার যেন আনন্দে ফেটে পড়লো ‘জয় কুমারী মায় কি জয়, জয় মহামায় কি জয়, জয় শ্রী শ্রী দুর্গা মায় কি জয়।’ ভক্তি আর উৎসবমুখরতার আবেশে বুধবার এভাবেই অনুষ্ঠিত হয় শারদীয় দুর্গাপূজার অন্যতম আর্কষণীয় পর্ব কুমারীপূজা।

লাল টুকটুকে বেনারসী পরে আসা ‘কুমারী মা’র চোখেমুখে ছিল কিছুটা ভীতি আর আনন্দ। তার মুখশ্রীর এমন আবহ বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিল পিছনে অধিষ্ঠিত দেবী দুর্গার সুকোমল মুখখানা। যেন দেবী দুর্গা এসে ভর করছিলেন ছোট্ট ঐ মিষ্টি মেয়েটির মধ্যে।

চারদিনের শারদীয় দুর্গাপূজার তৃতীয় দিন বুধবার; চলছে মহাঅষ্টমী। এদিন রাজধানীসহ দেশের সকল রামকৃষ্ণ মিশনে অনুষ্ঠিত হয়েছে কুমারীপূজা। ১৮৯৬ সালে ঢাকার রামকৃষ্ণ মঠ প্রতিষ্ঠার পর থেকে নিয়মিত ‘কুমারীপূজা’র আয়োজন করা হয়। অন্য ম-পে যথারীতি সন্ধিপূজার মাধ্যমে মহাঅষ্টমীর আচার শুরু হয়। সন্ধ্যায় আরতি প্রতিযোগিতা আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল ম-পে ম-পে।

দেবী পূরাণে কুমারীপূজার সস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। দুর্গা মাতৃভাবের প্রতীক আর কুমারী নারীর প্রতীক। কুমারীর মধ্যে মাতৃভাব প্রতিষ্ঠাই এ পূজার মূল লক্ষ্য। শাস্ত্রানুসারে সাধারণত এক বছর থেকে ১৬ বছরের সুলক্ষ্মণা কুমারীকে পূজা করা হয়। বয়সভেদে কুমারীর নাম হয় ভিন্ন।

ব্রাহ্মণ অবিবাহিত কন্যা অথবা অন্য গোত্রের অবিবাহিত কন্যাকেও পূজার বিধান শাস্ত্রে রয়েছে। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস দেব বলেছেন, শুদ্ধা কুমারীতে ভগবতীর বেশি প্রকাশ। কুমারীপূজার মাধ্যমে নারী জাতি হয়ে উঠবে পূত-পবিত্র ও মাতৃভাবাপন্ন। প্রত্যেকে শ্রদ্ধাশীল হবে নারী জাতির প্রতি।

১৯০১ সালে ভারতীয় দার্শনিক ও ধর্মপ্রচারক স্বামী বিবেকানন্দ সর্বপ্রথম কলকাতার বেলুড় মঠে নয়জন কুমারীপূজার মাধ্যমে এর পুনঃপ্রচলন করেন। তখন থেকে প্রতিবছর দুর্গাপূজার অষ্টমী তিথিতে এ পূজা চলে আসছে। পূজার আগ পর্যন্ত কুমারীর পরিচয় গোপন রাখা হয়। এছাড়াও নির্বাচিত কুমারী পরবর্তী সময়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন আচার-অনুষ্ঠান করতে পারে।

এবারের রাজধানীতে ‘কুমারী মাতার’ আসনে বসানো হয়েছিল প্রণিতা উষ্ণ বন্দোপাধ্যায়ক। শাস্ত্রমতে, তার নামকরণ করা হয়েছে ‘মালিনী’।

বুধবার সকাল থেকেই হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা জড়ো হতে শুরু করেন রামকৃষ্ণ মিশন প্রাঙ্গণে। সকাল ১১টায় শুরু হয় কুমারীপূজা। এর আগেই পূজাম-পে স্থাপিত হয় কুমারী মায়ের আসন। লক্ষ্মীবাজারের সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার্স কিন্ডারগার্টেনের লোয়ার কেজির ছাত্রী এবারের কুমারী মা প্রণিতা। তার বাবা প্রিয়শংকর বন্দোপাধ্যায় ও মা গায়িত্রী ভট্টাচার্য। ২০০৯ সালের ১০ জুন জন্ম নেয়া প্রণিতা ভক্তদের পূজা গ্রহণ শেষে বিশ্রামঘরে বসে বলেন, ‘সবাই আমাকে পুজো দিয়েছে, খুবই ভাল লাগছে। আমি সবাইকে আশীর্বাদ করেছি, যেন তারা ভাল থাকে।’

সকাল ১১টায় ব্রাহ্মণ পিতার কোলে চড়ে ম-পে অধিষ্ঠিত হন ‘কুমারী মাতা’। ‘কুমারী মা’ আসনে আসার পরপরই শুরু হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা। শুরুতেই গঙ্গাজল ছিটিয়ে ‘কুমারী মা’কে পরিপূর্ণ শুদ্ধ করে তোলা হয়। এরপর ‘কুমারী মা’র চরণযুগল ধুয়ে তাকে বিশেষ অর্ঘ্য প্রদান করা হয়। অর্ঘ্যরে শঙ্খপাত্রকে সাজানো হয়েছিল গঙ্গাজল, বেলপাতা, আতপ চাল, চন্দন, পুষ্প ও দূর্বা দিয়ে। ১৬টি উপকরণ দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিকতার সূত্রপাত হয়। এরপর অগ্নি, জল, বস্ত্র, পুষ্প ও বাতাস এই পাঁচ উপকরণে দেয়া হয় ‘কুমারী’ মায়ের পূজা। অর্ঘ্য প্রদানের পর দেবীর গলায় পরানো হয় পুষ্পমাল্য। পূজাশেষে প্রধান পূজারী দেবীর আরতি দেন এবং তাকে প্রণাম করেন। সবশেষে পূজার মন্ত্রপাঠ করে ভক্তদের মাঝে চরণামৃত বিতরণের মধ্য দিয়ে সকাল সাড়ে ১১টায় শেষ হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা।

প্রণিতার মা গায়িত্রী ভট্টাচার্য বলেন, ‘আমার বড় মেয়ে দেবীরূপে আবির্ভূত হয়েছে। বড় হয়ে আমার মেয়ে দেবীর মতোই অসুর বিনাশী কাজ করে পৃথিবীর মঙ্গল কামনা করবে।’

এদিকে, কুমারীপূজা দেখতে সকাল থেকেই উপচে পড়া ভিড় ছিল রামকৃষ্ণ মিশনসহ এর আশপাশের এলাকায়। রামকৃষ্ণ মিশনের বড় চত্বর পেরিয়ে রাস্তায় নেমে আসে ভক্তদের ভিড়। পুরো এলাকা তখন জনারণ্যে পরিণত হয়। সকাল থেকেই নিরাপত্তা রক্ষায় সেখানে বিপুলসংখ্যক র‌্যাব, পুলিশ, আনসার নিয়োগ করা হয়। দর্শনার্থী ও পূজারীদের ভিড়ে টিকাটুলী, ইত্তেফাক মোড়সহ ওই এলাকা মুখরিত হয়ে ওঠে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড় বাড়তে থাকে এবং একপর্যায়ে ভিড় উপচে পড়ে আশপাশের এলাকাতে।

রামকৃষ্ণ মিশনে কুমারীপূজার পাশাপাশি অন্যান্য পূজামণ্ডপে মহাঅষ্টমীর বিহিতপূজা ও সন্ধিপূজা সম্পন্ন হয়েছে। সকাল ৮টা ৪০ মিনিট ৪০ সেকেন্ডে মহাঅষ্টমীর বিহিতপূজা সম্পন্ন। একই লগ্নে শুরু হয় সন্ধিপূজার। যার সমাপন ঘটে সকাল ৯টা ২৮ মিনিট ৪০ সেকেন্ডে।

‘নবমী নিশি যেন আর না পোহায়, তোকে পাবার ইচ্ছা মাগো কভু না ফুরায়, রাত পোহালেই জানি আবার হবে দশমীর ভোর, আবার তোকে পাবো মোরা একটি বছর পর’- এমনই মনোকামনায় আজ বৃহস্পতিবার মহানবমী পালন করবে হিন্দু সম্প্রদায়। তিথি অনুযায়ী, এবারও নবমী ও দশমীর লগ্ন একসঙ্গে পড়েছে। ফলে কালই মর্ত্য ছেড়ে কৈলাশে স্বামীগৃহে ফিরে যাবেন দুর্গতিনাশিনী দেবীদূর্গা। আর পেছনে ফেলে যাবেন ভক্তদের দিনগুলোর আনন্দ-উল্লাস আর বিজয়ার দিনের অশ্রু।

বৃহস্পতিবার চন্দ্রের নবমী ও দশমী তিথি একই সঙ্গে পড়েছে। প্রথমে পূর্বাহ্ন ৭টা ৩৩ মিনিটের মধ্যে দেবীর মহানবমী কল্পারম্ভ ও বিহিত পূজা আরম্ভ হবে। শাস্ত্র অনুযায়ী; শাপলা, শালুক ও বলিদানের মাধ্যমে দেবীর পূজা হবে। নানা আচারের মধ্যে দিয়ে মহানবমীর পূজা শেষে যথারীতি থাকবে অঞ্জলি নিবেদন ও প্রসাদ বিতরণ।