২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গণপরিবহনে নারী যাত্রী

আশরাফুল আলম

প্রায়শ বাসে যাতায়াতকারী মহিলারা বলেন, তারা বাসে নির্যাতিত হন। তারা বিভিন্ন উপাত্ত ও তথ্য দিয়ে তাদের নির্যাতনের ধরন ব্যাখ্যা করেন। কান পেতে শুনি তাদের সেসব দুঃখের কথা। বাসে নির্যাতিত নারীদের মধ্যে ডাক্তার, নার্স, ছাত্রী, গার্মেন্টস কর্মী, স্কুল শিক্ষক, গৃহিণী কেউ বাদ পড়েন না। আমি অফিসে যাই বাসে। আমার চোখেও অনেক দৃশ্য ধরা পড়েছে। কিন্তু সেদিন স্কুল শিক্ষক এক ম্যাডামের কথায় আমার দুঃখটা আরও বড় হতে থাকে। পুরুষ হিসেবে নিজেকে ভাবতেও লজ্জা পাই।

আসলে সেদিন কী হয়েছিল ঐ স্কুল ম্যাডামের? বোরকা পরা ভদ্রমহিলার বাহু ধরে টেনে বাসে তুলেছে বাসের হেলপার। তিনি কি বাসে উঠতে গিয়ে পড়ে যাচ্ছিলেন? না, তেমন কোন আশঙ্কা বিন্দুমাত্র ছিল না। তবু তার গায়ে হাত দেয়া হয়েছে। এমনটাই হেলাপারদের স্বভাব। তিনি প্রতিবাদ করেননি লজ্জায়। তাহলে তো বাসের পুরুষরা বড় বড় চোখে তার দিকে তাকাবে আর হাসবে মিটিমিটি।

হেলপার, কন্ডাক্টর, ড্রাইভার মেয়েদের সঙ্গে অশালীন আচরণ করে। এমনকি তাদের মায়ের নাম তুলেও গালিগালাজ করে। আমরা বহুবার পত্রিকায় দেখেছি বাস ড্রাইভার, চাকরিজীবী, এমনকি শিক্ষকও ধর্ষণ করেছেন। সেগুলো তো চুপিসারে অজানা অন্ধকারে। আর বাসে নারীদের সঙ্গে যৌন নির্যাতন চলে প্রকাশ্য দিবালোকে শত লোকের মাঝে। তা কি করে সম্ভব? পরিবারের অনেক গৃহকর্তা ব্যক্তিটিও নারী, শিশুদের ধর্ষণ ও নির্যাতন করেন। তাই নারী নির্যাতনের ধরন ও প্রকৃতি আসলে বিভিন্ন ধরনের। আমি শুধু বাসের কথাই বলছি।

অনেক মহিলাকে নানা প্রয়োজনেই বাসে প্রতিদিন যাতায়াত করতে হয়। তাদের অভিযোগ বাসের হেলপার আর কন্ডাক্টররা তাদের বাসে ওঠা নামার সময় তাদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ স্পর্শ করে। জনতার ভিড়েও সুযোগ বুঝে ঠেলাঠেলি, ধাক্কাধাক্কি করে। আমি স্বচক্ষেও দেখছি সেদিন সায়েদাবাদগামী বাসে নামার সময় এক অল্পবয়সী শিক্ষিত মেয়েকে পিঠ ধরে পিছন থেকে হাত বুলিয়ে নামিয়ে দেয়া হয়েছে। মেয়েটি নেমে হেলপারকে বলে, এক চড় দিয়ে দাঁত সব ফেলে দেব। এরকম প্রতিবাদী মেয়ে হাজারে হয়তো একজন-দুজন আছে। ড্রাইভারকে নিয়ে তাদের আপত্তির সীমা নেই। ড্রাইভার তার পাশে মেয়েদের বসাতে পছন্দ করে। সম্ভবত এজন্যই তার পাশে সিট রাখা হয়েছে। তাদের সঙ্গে রসালো কথা বলে আর গাড়ি চালায়। এজন্য অনেক সময় ড্রাইভার গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারায় বা দুর্ঘটনার শিকার হয়। ড্রাইভারের পাশে ইঞ্জিনরুম। ভিতর থেকে ইঞ্জিনের গরম মেয়েদের পোহাতে হয়। কেউ কেউ রঙ্গ করে বলেন, মেয়েরা বেশিরভাগই দোজখে যাবে তাই দোজখের আগুন সহ্য করার ক্ষমতা দুনিয়াতে অভ্যাস করানো হচ্ছে এ্যভাবে। প্রতি বাসে মেয়েদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ৫-৬টি সিট। কাউন্টার বাসের ক্ষেত্রে সামনের ৩টি সারি শিশু, মহিলা ও প্রতিবন্ধীদের জন্য রাখা হয়েছে। ৩টি সারিতে ৯ জন যেতে পারে। আর বাকি ৫০-৬০ আসন সবার জন্য রাখা হয়েছে। যদিও অনেক পুরুষ যাত্রীরই ধারণা ওই আসনগুলোয় মেয়েদের বসার অধিকার নেই। ওখানে শুধু পুরুষরাই বসবে। এখানেও নারীরা বৈষম্যের শিকার। ৫-৬টি আসন পূর্ণ হলে আর তাদের বাসে উঠতে দেয়া হয় না। হেলপাররা ধাক্কা দিয়ে গেট থেকে মেয়েদের নামিয়ে দেয়। সিট নেই বলে চিৎকার করে। যদি জোর করে কোন মেয়ে উঠেই পড়ে, পুরুষদের মাঝে ঝুলে থেকে তার যে শিক্ষা হয় সে আর কোনদিন ভুলেও দাঁড়াবে না পুরুষদের মাঝে। সে না পারে বলতে, না পারে সইতে।

আমাদের ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণের দুই মেয়র যোগ্য লোক। নারীদের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা তারা দেখিয়ে থাকেন। সম্মানিত মেয়রদ্বয়ের কাছে মেয়েরা আবেদন রেখেছেন, অন্তত বাসে নির্যাতনের হাত থেকে তারা রক্ষা পেতে চান। তাদের জন্য বাসে পুরুষের সিটের বিপরীতে পর্যাপ্ত সংখ্যক আসনের ব্যবস্থা রাখলে সমস্যা অনেকাংশে দূর হবে। এ জন্য মেয়রদ্বয়ের পদক্ষেপ কামনা করি। সেদিন এক যাত্রী বাস থেকে নেমে মত দিলেন: ‘পকেটমার যেমন ধরা পড়লে গণপিটুনি খায়, ঠিক তেমনি বাসে কেউ অশালীন আচরণ করলে তাদের যেন তেমনি গণধোলাই করা হয়।’ যাহোক, গণপরিবহনে নারীযাত্রীর নির্বিঘœ যাতায়াতের লক্ষ্যে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

রামপুরা, ঢাকা থেকে

নির্বাচিত সংবাদ
এই মাত্রা পাওয়া