২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আমার সন্তান যেন বেড়ে ওঠে মননে ও চর্চায় -স্বদেশ রায়

শিক্ষকদের মর্যাদার বিষয় এখন দেশে একটি বিতর্কের বিষয়। বিষয়টি এতই স্পর্শকাতর যে বন্ধুবান্ধব, ছোট ভাইবোন যারা শিক্ষক তাদের সঙ্গে আলাপ করতে গেলেও কুণ্ঠিত হই। কোথায় যেন কুঁকড়ে যায় মনটি। যারা ক্ষমতাসীন তাদের সঙ্গে পারতপক্ষে এ বিষয়ে কথা বলি না। কারণ, ক্ষমতা অনেক বড় আগ্নেয়গিরি, কখন কার মুখ দিয়ে আগুন বেরিয়ে যাবে তাতে আমাদের মতো রাস্তার সাধারণের নীরবে পোড়া ছাড়া কোন উপায় থাকবে না। গত কয়েক সপ্তাহে এ বিষয় নিয়ে অনেক লেখালেখিও হয়েছে। ড. মুনতাসীর মামুন, ড. জাফর ইকবাল, ড. আনোয়ার হোসেন প্রমুখ লিখেছেন। সব লেখাই জনকণ্ঠে ছাপা হয়েছে। লেখাগুলো পড়ে যেমন কাতর হয়েছি, তেমনি কখনও নিজের ভেতর একটি পাষাণভার বোধ করেছি। লজ্জায় নীরবে চোখের জল মুছেছি। ভেবেছি, কোথায় চলেছি আমরা, শেষ অবধি শিক্ষকদেরকে লিখতে হবে, তাদের মর্যাদার কথা!

মনের তাড়নায় কখনও মনে হয়েছে, বিষয়টি নিয়ে কিছু লিখি। কিন্তু প্রথম বাধা পাহাড়ের মতো এসে দাঁড়ায়, অযোগ্যতা। কারণ, আমার মতো অর্ধ শিক্ষিত লোক শিক্ষকদের মর্যাদা নিয়ে কী লিখতে পারি! যেমন ছোটবেলায় খুব বিব্রত হতাম যখন বাংলা ক্লাসে ‘মাতৃভক্তি’ রচনা লিখতে দিত। মাকে কীভাবে ভক্তি করি তা কি ভাষায় প্রকাশ করা যায়। ভাষা কি এতই শক্তিশালী যে পৃথিবীর সব অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যাবে! শিক্ষকদের কথা ভাবলেও তো ঠিক তেমনই মনে পড়ে। ছোটবেলায় বাল্যশিক্ষা যার হাতে হয়েছিল তাকে জানতাম গুরু হিসেবে। খড়ম পায়ে কখনও বা খালি পায়ে চলতেন তিনি। তাঁর সহধর্মিণীকে জানতাম গুরুমাতা হিসেবে। যার কাছে বাংলা ব্যাকরণ শিখেছিলাম সেই স্যার এখন নব্বইয়ের কোঠায়, ইন্টারনেটের কল্যাণে বিদেশে ডাক্তার মেয়ের কাছে বসে কেন যেন তার অগা ছাত্রটির লেখা পড়েন। মাঝে মাঝে ফোন করেন। হঠাৎ একদিন ফোন করে বললেন, তুই লেখায় এত বেশি অব্যয় ব্যবহার করিস কেন? অব্যয় ছাড়াও বাক্যের ভাব দিয়ে বাক্যকে জুড়ে ফেলতে পারিসতো। স্যারের সঙ্গে কথা শেষ হওয়ার পরে নিজের রুমে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াই। নিজের মুখভর্তি শাদা দাড়ি, মাথার কাঁচা-পাকা চুল এ সব দেখে- সারা শরীর রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে। মনে হলো স্যার সেই কত হাজার মাইল দূর থেকে এখনও তার সন্তানটিকে ব্যাকরণ শেখাচ্ছেন। কয়েক দশক হলো, পিতার স্বর কানে আসেনি। মনে হলো অনেকদিন পরে আবার যেন পিতৃতুল্য কারও আদেশ শুনলাম।

গত কয়েক সপ্তাহ যাবত যখন শিক্ষকদের মর্যাদার বিষয়টি সামনে আসছে, আমার বার বার মনে পড়ছে ব্যাকরণ স্যারের কথা। এক তর্জনীর ওপর আরেকটি তর্জনী রেখে তিনি যেভাবে শেখাতেন সেই ভঙ্গিটি। আমি জানি না টেলিফোনে যখন তিনি আমাকে বললেন তখন তার তর্জনী নড়াচড়া করেছিল কি-না? ড. মুনতাসীর মামুন, ড. জাফর ইকবাল, ড. আনোয়ার হোসেন প্রমুখের লেখাগুলো পড়েও মনে হয়েছে, কোথায় যেন একটা পিতার বুক আর ছাত্ররাই তাদের বুকজুড়ে। তাই তাদের অবস্থান কোথায় হবে, আর তা নিয়ে যদি কমিটি করে আলোচনা করা হয়, তাহলে বিষয়টি বালককে ‘মাতৃভক্তি’ রচনা লিখতে দেয়ার মতোই হবে। কারণ, পৃথিবীতে সভ্যতার ভেতর দিয়ে, অনুভূতির ভেতর দিয়ে, কিছু অবস্থান নির্ধারিত আছে। আধুনিক রাষ্ট্র কাঠামো হয়েছে, এ কাঠামোর জন্য অনেক কিছুই করতে হয়, তারপরেও সমাজ ও সভ্যতায় হৃদয় দিয়ে যে অবস্থানগুলো তৈরি হয়ে গেছে হাজার হাজার বছর ধরে সভ্যতার স্বার্থে সেগুলো ভেঙ্গে ফেলতে নেই। তার ফল কখনও ভাল হয় না। কেন এই অবস্থানগুলো তৈরি হয়েছে, এগুলো সমাজের, মননের কত বড় স্থান দখল করে আছে তা আসলে শুধু উপলব্ধির। শিক্ষক আসলে কী করেন, তার যদি ফিরিস্তি চাওয়া হয়- মনে হয় না কেউ তা লিখে সম্পন্ন করতে পারবেন।

সমাজে যে যেখানে আছেন, তিনি যত বড় পদে থাকুন না কেন, তিনি মন্ত্রী হোন, অনেক শক্তিশালী সচিব হোন না কেন, তিনি নিজের মনকে একটু গভীরে ঠেলে দিলে দেখতে পাবেন তাঁর সঙ্গে সব সময়ই কিন্তু তার পিতা-মাতার মতো শিক্ষকরাও আছেন। নিজের খুব ভাল কাজটির, বড় সাফল্যটির গভীরে নিজেই ডুবে গেলে দেখতে পাবেন- এই কাজটি ভালভাবে করার পেছনে, তার আজকের এই সাফল্যর পেছনে কোন না কোন শিক্ষকের অবদান আছে। আজ সমাজের চারপাশে অনেক নষ্ট, পচা এ সময়ে অনেক মন্ত্রী বা সচিব সততার সঙ্গে, দৃঢ়তার সঙ্গে কাজ করছেন। তার এই সততা ও দৃঢ়তা এই মনন গঠনের দীর্ঘ পথে পথে কত শিক্ষকের হাতের ছোঁয়া আছে যা হয়ত হিসাব করে বের করা যায় না। এগুলো অনেকটা বাতাসের উপাদানের মতো। চারপাশে ডুবে থাকা বাতাস কত অক্সিজেন দিল, কত কার্বন গ্রহণ করল তার হিসাব কী আর জীবনভর করা যায়?

তবে কেন যেন শুরু থেকে বিশ্বাস, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই অবস্থা চলতে দেবেন না। তিনি নিজেই এই দুঃখজনক বিতর্ক শেষ করে দেবেন এবং সম্মানিত করবেন শিক্ষকদেরকে। কারণ, তাঁর শিক্ষক আছেন, তাঁর জীবনজুড়ে শিক্ষক আছেন। বঙ্গবন্ধুরও শিক্ষক ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, আমাদের এই উপমহাদেশে বঙ্গবন্ধু ও জওয়াহেরলাল নেহরু ছাড়া শিক্ষকদের মর্যাদা, সমাজে শিক্ষকরা কে- এই সত্যটি আর কেউ এতটা উপলব্ধি করেননি। শেখ হাসিনাও যে শিক্ষকদের কতটা সম্মান করেন তার একটি ঘটনা চোখের সামনে ভাসে। স্বাধীনতার ২৫ বছর পূর্তিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অনুষ্ঠানে ম্যান্ডেলা, আরাফাত ও ডেমিরেল এসেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই তিন বিপ্লবী রাষ্ট্র নায়ককে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন- হঠাৎ পেছন থেকে শওকত ওসমান স্যার জোরে ডেকে বললেন, এই হাসিনা তোমার অতিথিদের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দাও। শিক্ষকের কথায় থেমে গেলেন শেখ হাসিনা। পরিচিত হলেন, আবেগে আপ্লুত হলেন শওকত ওসমান স্যার। তারপর ওই ভিড়ের ভেতর থেকে স্যারকে হাত ধরে যখন নিয়ে আসি তখন তাঁর আনন্দে ভরা মুখ দেখেছি। এ আনন্দ তাঁকে শেখ হাসিনাই দিয়েছিলেন। তাই সেই রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা দ্বারা সমাজ ব্যথিত হবে এমন আশা করা যায় না। শিক্ষকদের অমর্যাদা শিক্ষকদের ব্যথা শুধু নয়, এ সমগ্র সমাজেরই ব্যথা।

গত কয়েক দিনের আলোচনায়, সরকারী অনেক লোকজনের কথাবার্তায় শিক্ষকদের কোয়ালিটি নিয়ে কথা উঠছে। বাস্তবে কোন সমাজের কোন একটি অংশের কোয়ালিটি আলাদা করে বাড়ানো যায় না। সমাজের সকল স্তরের, সকল শ্রেণীর কোয়ালিটি বাড়ানোর কাজটি এক সঙ্গে করতে হয়। তা একদিনে সম্ভবও নয়। কারণ, এ সমাজের শরীরে, রাষ্ট্রের শরীরে দীর্ঘ সামরিক শাসন ও তাদের উত্তরসূরি জঙ্গী মৌলবাদীদের শাসনের ক্ষত, যা শুধু শিক্ষায় পড়েনি, রাষ্ট্রের ও সমাজের প্রতিটি কাঠামোতে পড়েছে। এর পরে রাজনৈতিক শাসনের বদলে এক ধরনের দলীয় শাসনের বাইরে দেশ আসতে পারছে না। রাজনৈতিক শাসন ও দলীয় শাসন এক নয়। রাজনৈতিক শাসনে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় যায় কিন্তু দেশ শাসিত হয় রাজনীতি দ্বারা, কোন গোষ্ঠী দ্বারা নয়। এখন রাজনীতির বদলে এক ধরনের দলীয় গোষ্ঠী শক্তি তৈরি হচ্ছে। রাজনীতি পরিচালিত হয় মনন দ্বারা, গোষ্ঠী শক্তি পরিচালিত হয় আনুগত্য ও পেশী দ্বারা। রাজনীতিতে মননের প্রাধান্য থাকে বলে সেখানে সুবিধাবাদীরা ঢুকতে পারে না, তাদের কোন অবস্থান থাকে না। কারণ, সুবিধাবাদী কখনই মননশীল হয় না। অন্যদিকে গোষ্ঠীতে আনুগত্য ও পেশী যখন বড় হয়ে যায় তখন গোষ্ঠীকে সুবিদাবাদীরা দখল করে ফেলে। মননহীন সুবিধাবাদী সব সময়ই অদক্ষ ও অযোগ্য হয়। কোন রাষ্ট্র ও সমাজের বড় বড় স্থান শুধু নয়, অধিকাংশ স্থান যখন সুবিধাবাদীদের দখলে চলে যায় তখন রাষ্ট্র ও সমাজ ধীরে ধীরে অযোগ্যদের দখলে যায়। মনন নির্বাসিত হতে থাকে। এই মননহীন সুবিধাবাদীদের দ্বারা কোন মূর্তি তৈরি করলে যে কোন মুহূর্তে ভেঙ্গে পড়ে মূর্তিটি। ইতিহাস বার বার সে কথা বলে।

ইতিহাসের সত্যকে মনে রেখেই, সুবিধাবাদী গোষ্ঠী থেকে বের করে সমাজকে রাজনৈতিক শাসনে নিয়ে যাওয়া এখন সব থেকে বড় কাজ। যেখানে মনন ও চর্চার হাতে থাকবে ক্ষমতার দণ্ড। আর সেজন্য অনেক কাজের একটি কাজ শিক্ষক সমাজের অসন্তোষ, অমর্যাদা দূর করা আবার পাশাপাশি সেই শিক্ষক শ্রেণী গড়ে তোলা যারা সমাজকে মনন ও চর্চা দেবেন। ভারতচন্দ্রের সময়ে এ ভূখ- মাতার আকুতি ছিল, আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে। এখন সময়, আমার সন্তান যেন বেড়ে ওঠে মননে ও চর্চায়।

swadeshroy@gmail.com