১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পূজার গল্পে তারকারা...

ধর্ম যার যার, উৎসব সবার : মৌটুসী বিশ্বাস (অভিনেত্রী)

যদিও বলা হয় পূজা আমাদের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উৎসব। কিন্তু এটি এখন সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। এখন আমরা এটিকে শারদীয় উৎসবও বলে থাকি। কেবল সনাতন ধর্মাবলম্বী লোকেরাই এখন উৎসবে আনন্দ করে না, সকল ধর্মের লোকেরাই আনন্দটি ভাগাভাগি করে নিয়েছে। ঠিক যেমন- ধর্ম যার যার, উৎসব সবার।

আমার শৈশব থেকে শুরু করে বেড়ে ওঠা সবই চট্টগ্রামে। ওখানেই কেটেছে পূজার দিনগুলো। ছেলেবেলায় পূজার দিনগুলো এলেই আমার মধ্যে একধরনের চঞ্চলতা বেড়ে যেত। সকালে ঘুম থেকে উঠেই গোসল করে নতুন জামা-কাপড় পরে রামকৃষ্ণ চলে যেতাম। সেখানে সারাদিন থাকতাম। সেখানে আশপাশে আমাদের অনেক আত্মীয়-স্বজনের বাসা ছিল। সেখানে দুপুরের খাবার খেতাম। সারাদিন ওখানেই হৈ-হুল্লোড় করে কাটাতাম। সবাই একসঙ্গে মিলে প্রসাদ খেতাম। ওখানে আমাদের যে সকল আত্মীয়-স্বজনেরা থাকতেন তাদের ছেলে-মেয়েদের মাঝে আমিই ছিলাম বয়সে বড়। তাই আমি ছিলাম মূলত সবার উৎসবের কেন্দ্রবিন্দুতে। সারাটাদিন নিজের মতো করে কাটাতাম। সন্ধ্যার দিকে আব্বা এসে আমাকে নিয়ে যেতেন।

আমি ঢাকায় আসি ২০০৬ সালে, আইএফআইসি ব্যাংকে চাকরি নিয়ে। তারপর থেকে তো ব্যস্ত দিন গণনা শুরু। এখন আর আগের মতো করে আর পূজা উদ্যাপন করা হয় না। ম-পে ম-পে ঘোরা হয় না। কয়েক বছর ধরে পূজার সময় কেবল জগন্নাথ হলের মন্দিরে যাওয়া হয়। ওখানেই পরিবারের সবাইকে নিয়ে যাই।

দুর্গার নাম লিখে জলে ভাসিয়ে দিতাম : জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় (আবৃত্তিকার, অভিনেতা)

পূজাটা আমার কাছে একটি সামাজিক উৎসব। এটা মূলত কৃষিজীবিদের জন্যই উৎসব। শরতকালে যখন মাজদা পোকা আমন ধান আক্রমণ করত, অথবা বিভিন্ন প্রাকৃতিক সমস্যা যেমন ঝড়, বৃষ্টি হতো। তখন এই ধরনের অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শক্তি যোগানোর জন্য বা উদ্ধার পাওয়ার জন্য কৃষকরা মা দুর্গার আরাধনা করত। এটাই দুর্গা পূজার ঐতিহাসিক পটভূমি। পরে এটি সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়। দুর্গাপূজায় ছোটবেলাটা আমি আসলে খাবারের আকর্ষণের জন্য ভাল লাগতো। ষষ্ঠি থেকে দশমী পর্যন্ত প্রত্যেকদিন বিভিন্ন ধরনের খাবার থাকত। সেগুলো খেতাম। বিসর্জনের দিয়ে এসে কলা পাতার উল্টো দিকে দুর্গার নাম ১০১ বার লিখতে হতো পরিবার প্রধানদের কথায়। তা লিখে জলে ভাসিয়ে দিতাম। এগুলো লিখতে হতো মূলত দুর্গার নাম যেন না ভুলে যাই তার জন্য। রাতে সবাই মিলে সিদ্ধি মানে ভাংয়ের সরবত খেতাম। ছেলে বুড়ো সবাই খেত। পরিবার প্রধানদেরও খেতে হতো। হয়ত তারা অল্প খেত। কলকাতা মামার বাড়িতে ছিলাম ছোটবেলায়। তখন বাড়িতে বাড়িতে ঘুরে আশীর্বাদ নিতে হতো। তারা বিভন্ন ফল খেতে দিত। পাশের গ্রামে যেতাম। শান্তিজল ছেটানো হতো। সব মিলিয়ে অন্য রকম সময় ছিল। সত্যিই অনেক ভাল লাগত। যাত্রাপালায় যাত্রা করতাম। সেই যাত্রা করার জন্য দুই মাস রিহার্সেল দিতাম। ছোটবেলায় এ রকম সময়ই পার হতো। এগুলো খুব মনে পড়ে।

পূজায় নতুন জামা পরে ঘুরে বেড়াতাম : চঞ্চল চৌধুরী (অভিনেতা)

দুর্গাপূজার অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ ঢাকের বাদ্যি। ঢাকের আওয়াজ ছাড়া এ উৎসব কল্পনাই করা যায় না। ছোটবেলায় ঢাকের তালে তালে প্রতিমা বিসর্জন দিতে নৌকায় উঠতাম। এর পাশাপাশি নতুন জামা পরে আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের বাসায় ঘুরে বেড়াতাম। তবে ব্যস্ততার কারণে এখন আর তেমনটা হয়ে ওঠে না। আমার গ্রামের বাড়ি পাবনায়। সেখানে মা-বাবা ও পরিবারের সবাই থাকেন। আমিও আসছি পূজার আনন্দ সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করতে।

আমি মহিষাসুরের মূর্তি দেখে ভয় পেতাম : ঊর্মিলা শ্রাবন্তী কর (অভিনেত্রী)

বিয়ের পর এটিই আমার প্রথম পূজা, তা-ও আবার দেশের বাইরে। তাই আনন্দটাও বেশি। দেশের সবাইকে মিস করছি। এখানেও পূজা করতে বেশ লাগছে। সবাই অনেক আন্তরিক। এবারের পূজা আমার ভিন্নভাবেই কাটছে। পুরোপুরি নতুন পরিবেশের মধ্যে ডুবে আছি। তারপরও পুরো সময় আমি উপভোগ করছি। এর আগে পূজার আগ মুহূর্তে কখনও এত ব্যস্ত থাকিনি। চয়নিকা দিদির ‘তুমি সুন্দর হে’ নাটকের পরপরই গৌতম কৈরীর ‘বিজয়শঙ্খ’ নাটকে অভিনয় করলাম। আরটিভিতে একটি টক শো’র পরপরই ‘রঙ’ থেকে ডাকল বিপ্লব দা। এরই মধ্যে আরও দুটি ফটোশুট! যাই হোক, ছোটবেলা থেকেই আমি কিছুটা দুুরন্ত প্রকৃতির। নিজেকে অনেক সাহসীও ভাবতাম। সমবয়সী ছেলেগুলোকে পাত্তাই দিতাম না। সবসময় উঠাবসা ছিল বড়দের সঙ্গে; কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, পূজা এলে আমার ভেতর একটা বিষয়ে কিছুটা ভয় কাজ করত। এটা স্কুল পর্যন্ত ছিল। আমি মহিষাসুরের মূর্তি দেখে ভয় পেতাম। অথচ, খুব ভাব দেখাতাম- আমি ভয় পাচ্ছি না। কিন্তু বড়দের কোলে চড়েই আমি প্রতিমার সামনে যেতাম। বন্ধুরা এ নিয়ে আমাকে ঠাট্টা করত। যেহেতু সাহসী ভাব দেখাতাম, তাই প্রচ- রাগ হতো। আগে বিসর্জনের দিন খুব মজা করতাম। প্রতিবার একটা প্রতিযোগিতা হতো- কোন বাড়ির দেবী সবচেয়ে সুন্দর হলো। সেজন্য ভোরে সব প্রতিমা এক ঘাট থেকে যাত্রা করত সদরের দিকে। দেখতাম দু’পাড় ভর্তি মানুষ। সাধারণত মেয়েরা নৌকায় না গেলেও আমি বড়দের সঙ্গে উঠে যেতাম। দু’পাড়ের মানুষকে দেখে নিজেকে ভাগ্যবান মনে হতো। ভাবতাম, ওরা তো এ আনন্দ পাচ্ছে না। তারপর সাতঘাট ঘুরিয়ে দেবীকে বিসর্জন দেয়া হতো। আর অদ্ভুতভাবে আমরা প্রতিবছর সবচেয়ে সুন্দর প্রতিমার খেতাব পেতাম। পূজা এলে সবাই আমাদের বাড়ির ঠাকুর দেখতে অপেক্ষা করত। আমরা খুব সাবধানে প্রতিমা নিয়ে আসতাম। কারিগরের নাম কেউ বলতাম না। কারণ, আমরা টের পেতাম যে আমরাই প্রথম হব।

পূজা মানে আমার কাছে পুরো বছরের পরিকল্পনা : বিদ্যা সিনহা মিম (অভিনেত্রী)

সপরিবারে কলকাতায় এখন। এবারই প্রথম ঢাকার বাইরে পূজা পালন করছি। জীবনে প্রথমবারের মতো একটি পূজাম-প ফিতা কেটে উদ্বোধনও করেছি। আমন্ত্রণটা পেয়েছি ‘ব্লাক’ ছবির প্রযোজক রানা সরকারের মায়ের কাছ থেকে। এটা আমার জীবনের নতুন অভিজ্ঞতা। আমি বেশ উচ্ছ্বসিত।

পূজা মানে আমার কাছে পুরো বছরের পরিকল্পনা। এখন পূজা নিয়ে ভাবার সময় খুব কম। ছোটবেলায় নির্দিষ্ট একটা বয়স পর্যন্ত এক পূজা চলে গেলে পরিকল্পনা করতাম আরেক পূজায় কী করব। পূজা আসার আগের দিনগুলোকে অসহ্য লাগত। মনে হতো, কিছুতেই শেষ হচ্ছে না। ঠাকুর ঘরে এলেই আনন্দ শুরু হয়ে যেত। রঙ মাখামাখি, কাদা ছোড়াছুড়ি, দলবেঁধে ম-পে ঘুরতে যাওয়া, রাত জেগে আলতা মাখা, আরও হাজারো স্মৃতি। আমি যখন অষ্টম শ্রেণীতে পড়ি, ওই সময়কার পূজাগুলো একটু অন্যরকম ছিল। তখনও অনেক কিছু নতুন করে শিখেছি। এর আগ পর্যন্ত আমি ভাবতাম, বিসর্জনে সবাই পূজা শেষ হয়ে যাওয়ায় কান্না করে। আমি এতদিন না বুঝে কান্নাকাটি করতাম। ভাবতাম, আবার কবে পূজা হবে। ওই বছরই বুঝতে পারলাম আসলে পূজার জন্য নয়, দেবী চলে যাচ্ছে তাই সবাই কাঁদছে।

প্রতিবার পূজাতেই আমি আমার স্মৃতিময় রাজশাহীর দিনগুলোকে ভীষণ মিস করি। আমাদের বাসার কাছেই একটা মন্দির রয়েছে। সেখানে পূজা উদ্যাপনকে ঘিরে বিশাল মেলার আয়োজন করা হয়। ২-৩ মাইল রাস্তাজুড়ে এ মেলা বসে। শৈশবে সেই মেলায় সারাদিন ঘুরে বেড়াতাম।

যখন ঢাক গুড়গুড় করে বেজে ওঠে, তখন আমার চিরচেনা পদ্মা নদীরপাড়ে ফিরে যেতে ইচ্ছা করে। যেখানে আজও পূজা উপলক্ষে নৌকাবাইচ হয়। সে দিনগুলো কোনভাবেই ভুলতে পারছি না। ওই সময়ের স্মৃতিগুলো মনে পড়ে একের পর এক।

আমার আনন্দটা কিন্তু এখনও এক রকম : জ্যোতিকা জ্যোতি (অভিনেত্রী)

ময়মনসিংহকে অনেকেই পূজার শহর বলে থাকেন। ওই শহরেই আমার জন্ম। দুর্গাপূজার সময়টুকু কখনোই বাড়ির বাইরে থাকিনি। সব সময় পরিবারের সঙ্গে পূজার সময়টুকু উদ্যাপন করার চেষ্টা করেছি। এবারও মা-বাবা, ভাই-বোনদের সঙ্গে পূজা উদ্যাপন করছি। পাশাপাশি বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে বিভিন্ন ম-পে ঘুরতে যাওয়াটা তো থাকছেই।

পূজার স্মৃতি বলে শেষ করার নয়। তবে আমার আনন্দটা কিন্তু এখনও এক রকম। এবারও দল বেঁধে ঘুরতে যাব সবার সঙ্গে।

প্রতি পূজায় আমার একটাই চাওয়া থাকে, তা হলো- লাল পাড় সাদা শাড়ি, হাতভর্তি চুড়ি আর খোঁপাভর্তি বেলি ফুল। এখনও পরিবারের কাছে এক্ষেত্রে আমি ছোট। মানে দিতেই হবে। তবে উপোস নিয়ে এখন আর আগের মতো ছেলেখেলা করি না। আগে বড়দের মতো আমরা উপবাস করতে চাইতাম। কিন্তু খিদে পেলেই লুকিয়ে মিষ্টি খেয়ে নিতাম। পূজায় আমার আরেকটা শখ হলো পূজা-থালা সাজানো। আমি খুব সুন্দর গুছিয়ে থালা সাজাতাম। আর আরতির নাচে আমার চেয়ে দক্ষ বাড়ির আর কেউ নয়। আরতির সময় এলেই ডাক পড়ত আমার। আমার এসব কা- দেখে সবাই বলত, আমি নাকি লক্ষ্মী বউ হব। কোন কিছুর নাকি অভাব হবে না আমার। এসব শুনে ভীষণ লজ্জা পেতাম আমি। তবে মনে মনে বুঝতে পারতাম, আমি ভাগ্যবতী। আর, মা সহায় না হলে এত দূর আমার আসাও হতো না। সত্যি আমি ভীষণ ভাগ্যবতী। দেবী যেন আজন্ম সহায় হন- সে প্রার্থনাই করি। মা’র জয় হোক।