১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রভাবশালীদের দখলে রাজধানীর ৪৬ শতাংশ খাল

  • সিএজি পারফর্মেন্স অডিট রিপোর্ট

নাজনীন আখতার ॥ ঢাকার খালগুলোর ৪৬ শতাংশই প্রভাবশালীরা দখল করে নিয়েছেন। সরকারী সংস্থার অধীনে দখল নিয়ে প্রভাবশালীরা খালের ওপর ধর্মীয় আস্তানা ও বস্তি তৈরি করেছেন। প্রভাবশালীদের সঙ্গে যোগ দিয়ে ১৮ শতাংশ এলাকাবাসী স্থানীয় খালগুলো দখলে নিয়েছে। পিছিয়ে নেই ছিন্নমূলরা। কখনও প্রভাবশালী কখনও প্রভাবশালী ও এলাকাবাসীর সঙ্গে যোগ দিয়ে তারা খালগুলো দখলে নিয়েছে।

মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) পারফর্মেন্স অডিট রিপোর্টে উঠে এসেছে এ তথ্য। ওয়াসার নিয়ন্ত্রণাধীন কল্যাণপুর খাল, শাহজাদপুর খাল, কাটাসুর খাল, বেগুনবাড়ি খাল এই চারটি খালসংলগ্ন এলাকায় বসবাসকারী বাসিন্দাদের ও বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের সাক্ষাতকার নিয়ে এ জরিপ প্রতিবেদন তৈরি করেছে সিএজি। প্রতিবেদনে খাল অপ্রশস্ত হয়ে যাওয়া, খালের ময়লা পরিষ্কার না করা এবং অবৈধ দখল এই তিনটিকে জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সম্প্রতি সরকারী হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে এ প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়।

কমিটি সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন স্থানীয় সরকার বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন ঢাকা মহানগরীর জলাবদ্ধতা দূরীকরণ প্রকল্পের ২০০১-২০০৬ অর্থবছরের হিসাবের ওপর সিএজি কার্যালয় এ পারফর্ম্যান্স অডিট রিপোর্ট প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে ৮টি মন্তব্য তুলে ধরে বলা হয়, খাল দখল হয়ে যাওয়া, সংস্কার না করা এবং ভরাট হয়ে যাওয়া জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ। ওয়াসার খালগুলো দিন দিন দখল হয়ে যাচ্ছে। মূলত প্রভাবশালী ও সরকারী সংস্থার অধীনে এগুলো দখল হয়ে যাচ্ছে। সরকারী বিধিবিধানের কার্যকারিতার অভাবেই দখল রোধ করা যাচ্ছে না। প্রভাবশালীদের দখলেই খালগুলো থাকে এবং বস্তি বা ধর্মীয় আস্তানা প্রতিষ্ঠা করা হয়। ধীরে ধীরে অপ্রশস্ত হয়ে খালগুলো একসময় বিলীন হয়ে যায়। কর্র্তৃপক্ষের স্থায়ী নজরদারির অভাবে খালগুলো পুনরায় দখল হয়ে যাচ্ছে। খাল উদ্ধারের পর দখলকারীদের কোন প্রকার শাস্তি দেয়া হয় না। সঙ্কীর্ণ দলীয় স্বার্থের কারণে খালগুলোর ওপর বস্তি নির্মাণ করে চাঁদাবাজির মাধ্যমে অর্থ আয়ের উৎস তৈরি করা হয়েছে। খালগুলো বছরে ৩/৪ বার পরিষ্কার ও সংস্কার করা প্রয়োজন হলেও করা হচ্ছে ২ বছর বা তারও বেশি সময়ের ব্যবধানে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাহায্যে বেদখল খালগুলো পুনরুদ্ধার করে এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার মতো সর্বক্ষণিক পাহারার ব্যবস্থা করার প্রয়োজন হলেও তা করা হয়নি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, খাল সংস্কার, পরিষ্কার ও দূষণমুক্ত করার কাজকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়নি। বৃষ্টির পানি স্যুয়ারেজ লাইনে প্রবাহিত হয়ে খালের মাধ্যমে নদীতে গিয়ে পড়ে। খালগুলো দখলমুক্ত ও পরিষ্কার রাখা জলাবদ্ধতা নিরসনের অন্যতম শর্ত। ওয়াসার নিয়ন্ত্রণাধীন কল্যাণপুর খাল, শাহজাদপুর খাল, কাটাসুর খাল, বেগুনবাড়ি খাল এই চারটি খালসংলগ্ন এলাকায় বসবাসকারী বাসিন্দাদের ও বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের সাক্ষাতকার নেয়া হয়েছে। সাক্ষাতকার প্রদানকারী প্রত্যেকের বাড়ি ঘরেই বর্ষা মৌসুমে পানি আসে। এই পানি গড়ে ৩ থেকে ৬ দিন ধরে অবস্থান করে। শতকরা একশ’জনই খাল পরিষ্কার না করাকে জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ বলে জানিয়েছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নিরীক্ষায় যেসব কারণে জলাবদ্ধতা হয় তা বিশ্লেষণে তিনটি কারণকে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে- খাল অপ্রশস্ত হয়ে যাওয়া, খালের ময়লা পরিষ্কার না করা এবং অবৈধ দখল। সাক্ষাতকার দেয়া সকলেই খাল দখলকে অপ্রশস্ত হয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ বলে উল্লেখ করেন। এছাড়া পৃথকভাবে ৪০ শতাংশ বাসিন্দা খাল দখল করাকে দায়ী করেছেন। ২৪ শতাংশ বাসিন্দা নিয়মিত পরিষ্কার না করাকে দায়ী করেন।

প্রতিবেদনে খাল কারা দখল করে নিচ্ছে সে পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানানো হয়, প্রভাবশালীরা খালের ৪৬ শতাংশ দখল করে নিচ্ছেন। এলাকাবাসীরা দখলে নিচ্ছে ৮ শতাংশ। এছাড়া প্রভাবশালী ও এলাকাবাসী মিলে ১৮ শতাংশ, প্রভাবশালী ও ছিন্নমূল মিলে ২০ শতাংশ, প্রভাবশালী, এলাকাবাসী ও ছিন্নমূল মিলে ৮ শতাংশ দখল করে নিয়েছে।

সূত্র জানায়, এই প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে ওয়াসা সংসদীয় কমিটিকে জানিয়েছে, ওয়াসা কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাংকের সাহায্যপুষ্ট ডিডব্লিউএসএসপি ও ঢাকা মহানগরীর জলাবদ্ধতা দূরীকরণ প্রকল্পের মাধ্যমে ঢাকা ওয়াসার আওতাধীন খালগুলো পুনরুদ্ধার করে স্থায়ী অবকাঠামো এবং খনন কাজ শেষ করেছে। বর্তমানে প্রতি বছর পরিষ্কারের কাজ করা হচ্ছে। খালগুলো যাতে অবৈধ দখল হতে না পারে সে লক্ষ্যে নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। বিভাগীয় জবাব বিবেচনা করে আপত্তিটি নিষ্পত্তি করার জন্য অনুরোধ জানায় ওয়াসা। তবে জানা গেছে, ওয়াসার এ জবাবে সন্তোষ প্রকাশ করেনি সংসদীয় কমিটি।

উল্লেখ্য, রাজধানীতে ওয়াসার খাল রয়েছে ২৬টি। কিন্তু অস্তিত্ব আছে মাত্র ১৩ খালের।