১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বায়ান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলি

বায়ান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলি
  • মোরসালিন মিজান

খুব পুরনো অভিযোগটি এই যে, রাজধানী ঢাকার মানুষ আত্মকেন্দ্রিক। নিজেকে নিয়ে ভাবতে ভালবাসেন। সন্তান, পিতা-মাতা, পরিজনের বাইরে কেউ তেমন যেতে চান না। রাস্তার ধারে না খেয়ে পড়ে থাকা মানুষটিকে পা দিয়ে প্রতিদিন ডিঙ্গিয়ে যান তারা। না, এসবের কোনটিই অভিযোগ নয়। বরং বাস্তবতা। আর ব্যতিক্রম? আরিফুর রহমান, জাকিয়া সুলতানা, হাসিবুল হাসান সবুজ ও ফিরোজ আলম খান শুভ। বয়সে তরুণ এই বন্ধুরা অদম্য ফাউন্ডেশনের ব্যানারে কাজ করেন। পথশিশুদের জন্য বায়ান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলির শহর ঢাকায় তারা গড়ে তোলেন ‘মজার ইশকুল’। সুবিধাবঞ্চিত ছেলেমেয়েদের খুুঁজে নেয়া তাদের কাজ। লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করার স্বপ্ন দেখেন। অথচ সেই তাদেরই ছেলেধরা, পাচারকারী ইত্যাদি সাজিয়ে জেলে পোরা হয়েছিল! গত ১২ সেপ্টেম্বরের ঘটনা। ইন্টারনেটের যুগে দুঃসংবাদটি মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ব্যাপক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া শুরু হয় এবং তার পরও গো ধরে থাকে পুলিশ প্রশাসন। এভাবে টানা ৩৭ দিন জেলের ভাত খেতে হয় স্বপ্নবাজ তরুণ-তরুণীদের। এরপর মঙ্গলবার আসে কাক্সিক্ষত দিন। এদিন সকালবেলা থেকেই জেলগেটে সমবেত হতে থাকে পথশিশুর দল। শুভানুধ্যায়ীরা। ফুল-পাপড়ি ছিটিয়ে প্রিয় মুখগুলোকে বরণ করে নেন সবাই। সে কী আবেগঘন বিকেল! হাউমাউ করে কাঁদছিলেন সদ্য ছাড়া পাওয়া তরুণ-তরুণীরা। অসাধারণ উদ্যোগের জন্য, সুচিন্তার জন্য এমন পরিণতি! ভাবা যায়! তাই বরণ করে নিতে আসা বন্ধু-স্বজনরাও কাঁদছিলেন। দীর্ঘ গল্প রচনার পর পুলিশ প্রশাসনও জানিয়ে দিয়েছে, এঁরা নির্দোষ। এরপর স্বাভাবিক প্রশ্নÑ অন্যায় গ্রেফতার ও জেলে পাঠানোর দায় কে নেবে? হা... হা... হা...। কেউ নেবে না। নেয়ার রীতি আজও চালু হয়নি যে! তবে সমাজের যে দায় মজার ইশকুলের উদ্যোক্তারা কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন, সে দায় থেকে তারা সরে আসেননি একচুলও। তাঁরা জানিয়ে দিয়েছেন, বঞ্চিত ছেলেমেয়েদের আগের মতোই তারা ভালবাসবেন। ভালবাসা আসলেই এমন! এমনই!

এবার দুর্গোৎসবের কথা। সোমবার মহাষষ্ঠীর দিন দেবী দুর্গার বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে পাঁচ দিনের শারদীয় দুর্গাপূজার সূচনা হয়েছিল। মঙ্গলবার ছিল মহাসপ্তমী। বুধবার মহাঅষ্টমী। নবমী এবং দশমী ছিল বৃহস্পতিবার। বিশেষ করে অষ্টমীর দিন বুধবার দারুণ উৎসবে মেতেছিল ঢাকা। এদিন কুমারীপূজায় দিন শুরু হয়। রামকৃষ্ণ মিশনে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। ম-পগুলোতে গভীর রাত পর্যন্ত ছিল জনস্রোত। এদিন বনানীর পূজাম-পে গিয়ে বিস্ফোরিত চোখ! রাত তখন ৮টা। অথচ হাজার হাজার মানুষ লাইনে দাঁড়ানো। সবার গন্তব্য অভিজাত পূজাম-প। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পরিবার-পরিজনসহ দাঁড়িয়েছেন। অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের আগ্রহ কোন অংশে কম নয়। তাঁদের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। বিপুল উপস্থিতি দেখে সত্যি মন ভরে যায়! ধর্মের নামে মারা ও মারার এই কালে এমন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আশাবাদী কওে তোলে। ম-পের ভেতরে এমনকি প্রতিমার সামনেও ভরপুর উপস্থিতি মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের। ম-পের আশ্চর্য সুন্দর গঠন। বহিরাঙ্গনে কাঁচা সোনারঙ। আলোকসজ্জার কারণে তা আরও দৃষ্টিনন্দন হয়ে ওঠে। দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে চলছিল ছবি তোলার উৎসব। পাশেই বিশাল মঞ্চ। সেখানে চলছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। খ্যাতিমান শিল্পীরা গাইছিলেন। নাচছিলেন। শ্রোতারাও সুর মেলাচ্ছিলেন শিল্পীদের সঙ্গে। গভীর রাত পর্যন্ত চলে সকলের উৎসব।

বাংলায় যখন শারদীয় উৎসব চলছে, তখন প্রকৃতিজুড়ে হেমন্ত। বেশ কয়েক দিন আগে বিদায় নিয়েছে শরত। নতুন ঋতু ধীরে ধীরে আপন রঙ-রূপে প্রকাশিত হচ্ছে। রাজধানীর আকাশ এখন নির্মল। মিষ্টি রোদমাখা বিকেল। বৃহস্পতিবার হাতিরঝিল দিয়ে যাওয়ার সময় আকাশটা খুব দৃশ্যমান হলো। সাদা মেঘের ভেলা ভেসে বেড়াচ্ছিল। ফাঁকে ফাঁকে শেষ বিকেলের রোদ। হঠাৎ একঝাঁক পায়রা এসে হাজির। ওরা উড়ে বেড়ালো। ঘুরে বেড়ালো। দেখে বোঝা হয়ে গেল, হেমন্তের পরিবর্তন কিংবা শীতের আগমনী বেশ উপভোগ করছে ওরা।