২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ছেলেবেলা ও ছাত্রজীবন

  • আবুল মাল আবদুল মুহিত

কৈশোরের আরও স্মৃতি

(২১ অক্টোবরের পর)

লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেন ভারতে পৌঁছেই সবজান্তা বনে গেলেন। অত্যন্ত দক্ষ একজন ভারতীয় আইসিএস কর্মকর্তা ভিপি মেনন হন তার ব্যক্তিগত সহকারী। ভিপি মেনন সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেলের সঙ্গে মিলে একটি ভারত বিভাগ পরিকল্পনা রচনা করেন। এই পরিকল্পনাই লর্ড মাউন্টব্যাটেন খুব গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করেন। ইতিমধ্যে অবশ্য ভারত বিভাগ সম্বন্ধে আরও নানা ধরনের প্রস্তাব উঠতে থাকে। তার মধ্যে অন্যতম ছিল শরৎ চন্দ্র বসু এবং এইচ. এস সোহরাওয়ার্দীর যুক্তবাংলা প্রস্তাব। তারা প্রস্তাব করেন যে, আসাম এবং বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিকে নিয়ে একটি স্বশাসিত রাজ্য গঠন করা যায়। সেটি ভারতীয় ফেডারেশনের একটি অংশ হতে পারে। মুসলিম লীগ নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ খুব শক্তভাবে পাঞ্জাব এবং বাংলা বিভাগের ধারণার বিরোধিতা করেন। মনে হয় এসব নেতা তখনও অবিভক্ত ভারতবর্ষকে অধিকতর গ্রহণযোগ্য মনে করেন। লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভারতের জটিল সমস্যার সমাধান যেন স্বপ্নেই পেয়ে গেলেন। তিনি জিন্নাহর সাবধান বাণী শুনলেন না, বসু-সোহরাওয়ার্দীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টাকে বিবেচনাই করলেন না বা মহাত্মা গান্ধীর উপদেশ-আপত্তি কিছুই গ্রাহ্য করলেন না। মহাত্মা গান্ধী পরামর্শ দিয়েছিলেন মুসলিম লীগের জিন্নাহকে প্রধানমন্ত্রী করা হোক। তিনি নিজে যেমন ভারত সম্বন্ধে অজ্ঞ ছিলেন, ঠিক তেমনি সীমানা নির্ধারণের কমিশনের প্রধান নিযুক্ত করলেন র‌্যাডক্লিফকে, যিনি নামকরা আইনজ্ঞ ছিলেন বটে, তবে ভারত সম্বন্ধে তার কোন ধারণাই ছিল না। ভারতের ভূগোল বা ঐতিহ্য ও আচরণ সম্বন্ধে তিনি ছিলেন একেবারেই অজ্ঞ। অথচ শর্ত অনুযায়ী তার কমিশন সদস্যরা তাদের অভিমত ব্যক্ত করতে স্বাধীন ছিলেন; কিন্তু তার সে সব অভিমত বিবেচনার কোন বাধ্যবাধকতা ছিল না। সে কারণেই র‌্যাডক্লিফ রোয়েদাদে যেভাবে বাংলা ও পাঞ্জাবের বিভাগ হয় তার দুষ্ট প্রভাব এখনও দূরীভূত হয়নি। ভারত-বাংলাদেশের সীমান্ত চূড়ান্ত না হওয়ার আসল কারণ র‌্যাডক্লিফের অবাস্তব রোয়েদাদ। এই রোয়েদাদে এক পরিবারের বাড়িটি পড়েছে এক দেশে, তবে গোসলখানা বা রান্নাঘর পড়েছে অন্য দেশে। মাউন্টব্যাটেনের সহজ সমাধান ছিল ভারতকে দুই রাষ্ট্রে বিভক্ত করা ও কেন্দ্রীয় রাজ্যগুলো ইচ্ছামতো যে কোন এক ভাগে যোগ দেয়া অথবা স্বাধীন থাকা। মাউন্টব্যাটেন ক’দিনেই তার স্বপ্নে দেখা সমাধান ঘোষণা করলেন। তিন মাসের মাথায় ৩ জুনে তিনি তার সমাধান ঘোষণা করলেন। উন্মুখ ভারতবাসীর তখন তার ঘোষণা গ্রহণ করা ছাড়া আর কোন কিছু করার ছিল না। আমার বেশ মনে আছে যে, পাড়ায় বিনোদিনী হাসপাতালের ডাক্তারের বাড়ির প্রাঙ্গণে সমবেত জনগণ এই ঘোষণা শুনল এবং একে একে জিন্নাহ, নেহরু, বলদেব সিং এবং সম্ভবত জন মাথাই ঘোষণা মেনে নিলেন। তখনও রেডিও তেমন সহজলভ্য ছিল না। তাই আমাদের রেডিও শুনতে সবাইকে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে সমবেত হতে হয়। স্বাধীনতা দিবস হলো ১৪ ও ১৫ আগস্ট।

১৯৪৫ সালের আগস্ট মাসে আমার ছোট ভাই ড. মোমেন জন্মগ্রহণ করে। তার কিছুদিন পরেই আমার আম্মা বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েন। বেশ কয়েক মাস তিনি অসুস্থ ছিলেন এবং এক সময় আমাদের ভয় হয় যে, আমরা আম্মাকে যে কোন সময় হারাতে পারি। একদিন দুপুর রাতে সম্ভবত ১৯৪৬ সালে আমরা সবাই ঘুম থেকে জেগে উঠলাম। বাড়িতে তখন বেশ হৈ চৈ হচ্ছে। আমাদের পাড়াপড়শির মধ্যে দু’জন প্রসিদ্ধ ডাক্তার ছিলেন। ডাঃ এন্ডো এবং ডাঃ রাহা। তারা দু’জনেই উপস্থিত ছিলেন এবং আমাদের প্রসিদ্ধ কম্পাউন্ডার রাম বাবুও উপস্থিত ছিলেন। আম্মার নিয়মিত ডাক্তার ডাঃ সুল্লাই এবং সিভিল সার্জন ডাঃ আখতারুজ্জামান সবাই বাড়িতে উপস্থিত। আম্মা শয্যাশায়ী ছিলেন। হঠাৎ তিনি উঠে বসেছেন এবং খুবই অস্থির আছেন। আমরা সবাই খুব ভয় পেয়ে গেলাম। সব ঘটনা মনে নেই; কিন্তু এতটুকু মনে আছে যে, অবশেষে আম্মাকে ঘুম পাড়ানো হলো এবং সাময়িকভাবে উত্তেজনা হ্রাস পেল। বিভিন্ন মহল থেকে পরামর্শ আসল যে, আম্মার এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা পরিবর্তন করা দরকার। ইতিমধ্যে আব্বা কিছু হোমিপ্যাথিক চিকিৎসা করিয়েছেন। তাতেও কোন সুফল পাওয়া যায়নি। কোন একজন পরামর্শ দিলেন যে, আম্বরখানায় একজন ইয়েমেন দেশীয় পীর যিনি নজুমী ডাক্তারী করেন, তার চিকিৎসায় অনেকেই খুব সুফল পেয়েছেন। তার পরামর্শ নেয়ার উপদেশটি ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী। আমার আব্বা অবশেষে এই চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি এই ডাক্তার সাহেবের স্থানীয় কম্পাউন্ডারের মাধ্যমে তার কাছে আম্মার অবস্থা বর্ণনা করলেন। আমাকে আব্বা এই মোলাকাতের সময় সঙ্গে নিয়ে যান। ইয়েমেনী ডাক্তার সাহেব নজুমী পদ্ধতিতে চিকিৎসা করতেন। তিনি নানা ধরনের হিসাব করে কোন্্ কোন্্ তারকার প্রভাব রোগীর ওপরে প্রকট সেটা নির্ধারণ করতেন। অতঃপর পাতা, ডাল, শিকড়, রস, কষ ইত্যাদি সংগ্রহ করে তার ওষুধ বানাতেন। তিনি প্রায় প্রত্যেক রোগীকে প্রথমেই তার পেট পরিষ্কারের জন্য আধুনিক এ্যালোপ্যাথিক ওষুধ দিতেন। তারপর শুরু হতো তার চিকিৎসা পদ্ধতি। তিনি বিভিন্ন স্থানীয় মসলা এবং অন্যান্য রন্ধন উপযোগী উদ্ভিদসহ তার ওষুধ প্রস্তুত করতেন। একটি ওষুধের ব্যবহার তিনি প্রায়ই করতেন এবং সেটা ছিল মুরগির জগ স্যুপ। নানা উদ্ভিদসহ এই স্যুপটি তার তত্ত্বাবধানে একজন কম্পাউন্ডার রন্ধন করতেন এবং সেটা তিনি নানা সাইজের বোতলে রোগীদের প্রদান করতেন। এছাড়া তিনি বিভিন্ন ধরনের পেস্ট বানাতেন। যার কতিপয় শ্রেণী খেতে হতো এবং কতিপয় শ্রেণী বিভিন্ন অঙ্গে মাখা হতো। এই ইয়েমেনী সাহেব (তাকে সবাই ইয়েমেনী পীর সাহেব ডাকত) পরবর্তী কয়েকটি বছর আমাদের পরিবারের চিকিৎসক ছিলেন। আমাকে ১৯৪৬ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত প্রায় প্রতি সপ্তাহে তার কাছে নানাজনের ওষুধ আনতে যেতে হতো। তিনি একটি কামরায় বসবাস করতেন এবং সেই কামরাটি সব সময় অন্ধকারে আচ্ছন্ন থাকত। কামরাটির দরজা খুলে তার নিয়মিত কম্পাউন্ডার সাহেব রোগী বা ওষুধপ্রার্থীদের তার সঙ্গে মোলাকাতের ব্যবস্থা করতেন। সম্ভবত তার অনেক শুচিবাই ছিল। তাই দর্শনার্থী তার ঘরে ঢোকার আগে তিনি নানা ধরনের পানি ছিটাতেন। দর্শনার্থীদের গায়েও পানি ছিটাতেন। কাউকে স্পর্শ করলে সঙ্গে সঙ্গেই তিনি তার হাত ওষুধি পানি দিয়ে ধুতেন। তার একটি বদ অভ্যাস ছিল যে, তিনি থুথুদানিতে থুথু ফেলতেন; কিন্তু প্রায়ই তা থুথুদানিতে পড়ত না। আমার আম্মা ইয়েমেনী পীর সাহেবের চিকিৎসায় সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যান। সম্ভবত পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু করে আশির দশক পর্যন্ত মোটামুটি সুস্থই ছিলেন। রক্তচাপে তিনি মাঝে মাঝে ভুগতেন। মাঝে মাঝে পেটে ব্যথা হতো। পেটে ব্যথাটাই পরবর্তীকালে ক্যান্সার বলে শনাক্ত হয়। আমাদের দেশে ঐ সময় অনেকের বিশেষ করে মেয়েরা শূলব্যথায় মারা যেতেন। আমার মনে হয় আসলেই তারা ক্যান্সারের রোগী ছিলেন; কিন্তু সেই রোগ তখন জানা ছিল না। চলবে....