২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ॥ বাস্তবায়নে চাই সমন্বিত উদ্যোগ

  • ড. আর এম দেবনাথ

বাংলাদেশের ‘বর্তমান ও ভবিষ্যতের যোগসূত্র’ হিসেবে বর্ণিত সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (২০১৫-১৬ থেকে ২০১৬-২০) মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক গত সপ্তাহে অনুমোদিত হয়েছে। বলা বাহুল্য, এটিই ছিল গেল সপ্তাহের সবচেয়ে বড় খবর। দেখা যাচ্ছে পাঁচ বছরে ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৩২ লাখ কোটি টাকা। ঠিক হয়েছে আরও চারটি পরিকল্পনাকে মাথায় রেখে পরিকল্পনাটির কাজ শেষ করতে হবে। অর্থাৎ সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাটির থাকবে একটা প্রেক্ষিত পরিকল্পনা Ñসুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। ২০২০ সালে অর্থাৎ পঞ্চম বছরে ‘জিডিপি’ প্রবৃদ্ধির হার হবে ৮ শতাংশ। অবশ্য প্রতি বছর গড় বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হবে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। এটা করতে পারলে চাকরি সংস্থান হবে এক কোটি ২৯ লাখ লোকের। যে ৩২ লাখ কোটি টাকার পরিকল্পনা তার প্রায় ২৮ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা আসবে অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে এবং বাকি টাকা আসবে বিদেশী উৎস থেকে। অন্য যেসব লক্ষ্যমাত্রা স্থির হয়েছে তার মধ্যে আছে : ম্যানুফেকচারিং খাতের অবদান ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে হবে ২১ শতাংশ। রফতানি বাড়বে ৩০ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার থেকে ৫৪ বিলিয়ন (হাজার মিলিয়নে এক বিলিয়ন) ডলার। রাজস্ব আয় বর্তমানে আছে জিডিপির ১০ দশমিক ৭ শতাংশ। তা ২০২০ সালে বৃদ্ধি পেয়ে উন্নীত হবে ১৬ দশমিক ১ শতাংশে। সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) এক দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে হবে ৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। বিদ্যুত পাচ্ছে বর্তমানে ৭২ শতাংশ লোক। ২০১৬ সালে তা হবে ৯৬ শতাংশ। ভ্রমণ, পর্যটন জাতীয় সেবা খাত থেকে পাওয়া যাবে ৬ বিলিয়ন ডলার, যা বর্তমানে মাত্র এক দশমিক ৪ ডলার। সর্বশেষ রেমিটেন্স খাতে বিদেশ থেকে আয় উন্নীত হবে ২১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে। বর্তমানে তা মাত্র ১৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া আরও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে যা বাস্তবায়নের জন্য সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাকালে সরকার ব্যস্ত থাকবে। আমি মোটা দাগে লক্ষ্যমাত্রাগুলো খবরের কাগজ থেকে পাঠকদের সামনে তুলে ধরলাম, যাতে পাঠকরা বুঝতে পারেন আমরা অর্থনৈতিকভাবে এই মুহূর্তে কোথায় আছি এবং ২০১৬ সালে কোথায় যাব? সব লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে আলোচনা স্বল্প পরিসরে সম্ভব নয়। একটি মাত্র লক্ষ্য নিয়েই শুরু করা যাক, আর এটাই মুখ্য বিষয় বলে বিবেচিত হয়। জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ২০১১-২০১৫ সময়কালে অর্থাৎ ২০০৯-২০১০ থেকে ২০১৪-১৫ এই সময়ের মধ্যে আমাদের গড় অর্জিত জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৬ দশমিক ৩ শতাংশ, অথচ শেষ বছরে প্রবৃদ্ধির হার হওয়ার কথা ছিল ৭ শতাংশ, এটা করা যায়নি। এছাড়া পূর্ববর্তী পরিকল্পনাকালে কখনও এত বড় প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়নি। ১৯৭৩-৭৮ এর প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার কাজ শেষ না হওয়াতে দুই বছর বাদ দিয়ে দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার কাজ শুরু করতে হয়। এটা বাস্তবতা। ১৯৯০-৯৫ এর চতুর্থ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার কাজ বাস্তবায়নও হয় বিলম্বিত। অতএব, এবারও দুই বছর পর ১৯৯৭ সালে শুরু হয় ৫ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার কাজ। এই পঞ্চম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার (১৯৯৭-২০০২) শেষে দশ বছর চলে পরিকল্পনাহীনভাবে, সেটা ছিল বিএনপি সরকারের আমল। দীর্ঘদিন পর ২০১১-২০১৫ সময়কালে চালু হয় ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা। এই পরিকল্পিত উন্নয়নের ইতিহাস ঘাটলে আশা-আকাক্সক্ষা ও বাস্তবতার মধ্যে আমরা একটা বড় পার্থক্য লক্ষ্য করি। এ প্রেক্ষাপটেই এসেছে সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা। বলাবাহুল্য, বিশাল কর্মযজ্ঞের আয়োজন করা হয়েছে এতে। এ সম্পর্কে অনেক কথা অনেকজন অনেকভাবে বহুদনি যাবত লিখবেন। খবরের কাগজে দেখলাম লেখার সুর ইতোমধ্যেই আমাদের অর্থমন্ত্রী ধরিয়ে দিয়েছেন। একটি প্রতিবেদনে দেখলাম ‘রাজস্ব আহরণ, বিদেশী বিনিয়োগসহ কিছু খাতে যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে এর সমালোচনা করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এসব লক্ষ্য বাস্তবসম্মত নয় বলে তিনি মনে করেন। লক্ষ্য অর্জন নিয়ে সংশয়ও প্রকাশ করেন তিনি।’ অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য সঠিক হলে আর বলার কিছু থাকে না। তিনি নিজেকে বলেন উচ্চাভিলাষী। সবাই তাকে জানেও সেভাবে। উচ্চাভিলাষী একজন অভিজ্ঞ অর্থমন্ত্রী যদি সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাকে বাস্তবসম্মত নয় বলেন তাহলে আমরা ‘গরিবরা’ কী বলব। আগে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় একসঙ্গে ছিল। তাই পরিকল্পনা যার অর্থায়নের বিষয়ও ছিল তার। এখন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় আলাদা। দুটিতেই পূর্ণ মন্ত্রী আছেন। রয়েছেন এক অর্থ প্রতিমন্ত্রী তিনি নিজেও যথেষ্ট অভিজ্ঞ ও গুণী মানুষ। তবে কথা হচ্ছে অর্থের। পরিকল্পনা বলুন, বাজেট বলুন, প্রকল্প বলুন- সবই অর্থের বিষয়, টাকার বিষয়, রাজস্বের বিষয়। এই রাজস্বের জন্য রয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এটা অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন নয়। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়। তাদের অর্থ বা টাকা পয়সা হয় দেবে, না হয় দেবে না অর্থ মন্ত্রণালয়। সেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, মাননীয় অর্থমন্ত্রী বলছেন রাজস্বের লক্ষ্য উচ্চাভিলাষী, বিদেশী বিনিয়োগের লক্ষ্য উচ্চাভিলাষী। তাহলে আর বাকি থাকে কী?

বিদেশী বিনিয়োগ না আসলে কী দেশী বিনিয়োগ আসবে? এসবের উত্তর নেই। তবে গত সপ্তাহেরই একটি খবর কাগজে দেখেছি। খবরটি ‘এফবিসিসিআই’-এর। তাদের এক সভায় উপস্থিত ছিলেন একটি বড় দেশের হাইকমিশনার। ঐ সভায় বড় বড় ব্যবসায়ী বিদেশী বিনিয়োগের কথা বলেননি। তারা চান বিদেশে বিনিয়োগ করতে। ফাটাফাটি ব্যাপার। বলছেন, এত বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার দিয়ে আমরা কী করব? আমাদের বিদেশে বিনিয়োগ করার অনুমতি দেয়া হোক। এর উত্তরে বিদেশী রাষ্ট্রদূত বলেন, দেশে বিনিয়োগ করুন। বাংলাদেশে প্রচুর সম্ভাবনা আছে। তিনি কয়েকটি খাতের উল্লেখ করেন। ব্যবসায়ীদের দাবির মাথায় জল ঢালা আর কী! এ ঘটনা উল্লেখ করলাম এই কারণে যে, দেশীয় ব্যবসায়ীরাই দেশে বিনিয়োগ করতে উৎসাহী নয়? এমতাবস্থায় বিদেশীরা আসবে কোন্্ সাহসে? এই কথা মনে রেখেই কী অর্থমন্ত্রী বিদেশী বিনিয়োগের বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন? আমার তা জানা নেই।

তবে একটা ভরসার স্থল আছে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা শত হোক প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক অনুমোদিত। অনুমোদন প্রাপ্তির পর এই দলিল এখন সরকারের দলিলÑ এই দলিল সরকারী দলিল। এটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব সকল মন্ত্রণালয়ের, সকল বিভাগের। আর পরিকল্পনাই তো শেষ কথা নয়। এর ফাঁকে ফাঁকে রয়েছে বার্ষিক বাজেট। প্রত্যেক বাজেটেরই পর্যালোচনা হয়। অর্থ মন্ত্রণালয় প্রত্যেকবার বাজেট অধিবেশনকালে ‘মধ্য মেয়াদী বাজেট কাঠামো’ নামীয় একটা দলিল সংসদে উপস্থাপনা করে। এতে বাজেটের পর্যালোচনা থাকে, পরিবর্তন-পরিবর্ধন থাকে। এর থেকে বোঝা যায় পরিকল্পনা ‘পরি+কল্পনা’ নয়। এর সঙ্গে বাস্তবতার যোগসাজশ করা হয়। এটা সব সময় করা হয়। শুধু সরকার নয়, বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানেও আজকাল ‘স্ট্র্যাটেজিক পরিকল্পনা’ থাকে, থাকে বার্ষিক বাজেট। কোনটাই শেষ কথা নয়। নিয়মিত এসবের পর্যালোচনা, পরিবর্তন, পরিবর্ধন হয়। পরিকল্পনার একটা গুণ ও সুবিধা এই যে, এটা থাকলে জাতি হিসাবে আমরা বুঝতে পারি আমাদের গন্তব্য কী? গন্তব্যে পৌঁছাতে কী কী দরকার তা ঠিক করা যায়। ব্যর্থতা, অসফলতা চিহ্নিত করা যায়। এর জন্য শুদ্ধি অভিযান চালানো যায়। দায়িত্ব বণ্টন করে দেয়া যায়। জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়। তবে এটাও ঠিক অতিরিক্ত মাত্রায় উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বা বাজেট আবার বাস্তবায়নের মটিভেশন নষ্ট করে। যে বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য নয় তা প্রণয়নকালেই হোঁচট খায়। বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান, এজেন্সি, মন্ত্রণালয় বিভাগ ধরে নেয় ‘ওটা হবে না’ তাই বৃথা পরিশ্রম। অতএব স্বাভাবিক গতিতে কাজ করে যাও। কপালে যা আছে।’ এই কথাটি মনে রেখে এগোনো দরকার। আন্তঃমন্ত্রণালয়ে কোন সমন্বয়হীনতা থাকলে তা গোড়াতেই দূর করা দরকার। এবং এর জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সকল অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের একযোগে কাজ করা উচিত। এখানে সমন্ব^য়হীনতা আত্মঘাতী হবে।

লেখক : ম্যানেজমেন্ট ইকোনমিস্ট ও

সাবেক শিক্ষক, ঢাবি