১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিশ্বকে পরিবর্তন করে দেয়া ১০ নারী আন্দোলন

বিশ্ব নেতৃত্বে নারীর সংখ্যা উৎসাহব্যঞ্জকই বলা যায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, স্পীকারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীরা সমাসীন। পার্লামেন্টেও নারীর সংখ্যা কাক্সিক্ষত পর্যায়ে ক্রমবর্ধমান। রাজনীতিতে নারী-পুরুষের ব্যবধান ক্রমশ কমে যাচ্ছে। অথচ আজ থেকে শত বছর আগে এ কল্পনাও করা সম্ভব ছিল না। থাকবেই বা কীভাবে। তখন নারীদের কোন ভোটাধিকারই ছিল না, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা তো বহুদূরের কথা, নারীরা তাদের অধিকার আদায়ের জন্য দীর্ঘ সংগ্রাম করেছিল। অনেক নির্যাতন, নিপীড়ন সহ্য করেও চালিয়ে গিয়েছিল ভোটাধিকারের আন্দোলন। একটা সময় তাদের তীব্র এবং গতিময় আন্দোলনের চাপে দেশে দেশে তাদের ভোটাধিকার স্বীকৃত হতে থাকে। ভোটাধিকার ছাড়াও নারীরা সমাজে বিভিন্নভাবে লাঞ্ছিত, বঞ্চিত হয়ে আসছিল। তাই ভোটাধিকার অর্জনের পর নারীরা সমাজে নিজেদের অন্য অধিকার আদায়ের লড়াই চালিয়ে যায়। যার ফল আমরা দেখি, সমাজে আজ নারী এগিয়ে গেছে বহুদূর। এসব সাফল্যর শেকড় ওই ভোটাধিকার আন্দোলন। ব্রিটেনে নারীদের ভোটাধিকার আন্দোলনকে ‘সাফরাজেট’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয়েছে ‘সাফরাজেট’ নামের একটি সিনেমা। সম্প্রতি এই সিনেমার প্রিমিয়ারেও নারীরা তাদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন চালিয়ে গেছে।

ব্ল্যাক ফ্রাইডে, ১৮ নবেম্বর, ১৯১০

ব্রিটেনের পার্লামেন্টে নারীর ভোটাধিকার বিল ‘কনসিলিয়েশন বিল’টি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হার্বাট হেনরী এ্যাসকুয়িথ ফিরিয়ে দেয়ার প্রতিবাদে প্রায় তিন শতাধিক নারী হাউস অব কমন্স ঘেরাও করে। তখন পুলিশ এই নারীদের ওপর কেবল লাঠিচার্জ করেই ক্ষান্ত হয়নি, যৌন নিপীড়নসহ অনেক বর্বরোচিত হামলা চালায়। অনেক আন্দোলনকারীকে গ্রেফতারও করা হয়েছিল। এটাই ছিল ভোটাধিকার আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশ ফোর্সের প্রথম ব্যবহার। নিরস্ত্র নারীদের ওপর পুলিশের এই হামলার পরপরই এ্যাসকুয়িথের গাড়ি ভাংচুর করা হয়। এবং এই ঘটনায় সেই সময়কার হোম সেক্রেটারি উইনস্টন চার্চিল হতবুদ্ধ হয়ে পড়েন। নিরস্ত্র নারীদের ওপর পুলিশের এই হামলায় সর্বত্র ছিছি রব উঠে যায়। ওই আন্দোলনে দুজন নারী প্রাণ হারিয়েছিল। দিনটিকে ব্ল্যাক ফ্রাইডে হিসেবে অভিহিত করা হয়। ব্রিটিশ সরকার এই ঘটনায় বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। এ্যাসকুয়িথ অনেকটা বাধ্য হয়েই ‘সাফরাজেট বিল’ অন্তর্ভুক্তির ঘোষণা দেন। এই আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে ১৯১৮ সালে সীমিত আকারে এবং তার এক দশক পর নারীরা সম্পূর্ণ ভোটাধিকার পায়।

মিস আমেরিকা, ৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৬৮

বেশ জাঁকজমকপূর্ণভাবে মিস আমেরিকার অনুষ্ঠান আয়োজনের কথা ছিল আটলান্টিক শহরে। কিন্তু ওই সুন্দরী প্রতিযোগিতাকেই নারী অধিকার আদায়ের চার শতাধিক কর্মী তাদের আন্দোলনের মোক্ষম সময় হিসেবে বেছে নিয়েছিল। আন্দোলনটা অনেকটা হাস্যকরধর্মী হলেও তা ছিল নারী আন্দোলনের দ্বিতীয় অধ্যায়ের সূচনা। এই আন্দোলনে নারীরা তাদের ব্যবহৃত সামগ্রী যেমন হাই হিল, আইলেশসহ নানাধরনের কসমেটিকস, রান্নার জিনিসপত্র ছুড়ে ফেলেছিল। এসব জিনিস নারী মুক্তির অন্তরায় এমন বিবেচনায় তারা সেগুলো ছুড়ে প্রতিবাদ জানিয়েছিল। নারীরা কেবল সৌন্দর্য প্রকাশের কোন পণ্য নয়, তারাও পুরুষের মতো মানুষ। তাদেরও সমাজে রয়েছে সমান অধিকার। এ বিষয়টিকে বিশ্ব বিবেকের কাছে জাগ্রত করে তোলাই ছিল এই আন্দোলনের লক্ষ্য। এই আন্দোলনের বিশেষ দিক ছিল আন্দোলনকারী নারীরা তাদের বক্ষবন্ধনীগুলো পুড়িয়ে ফেলেছিল।

আইসল্যান্ড, ২৪ অক্টোবর ১৯৭৫

এ দিনে আইসল্যান্ডের নব্বই শতাংশ নারী-পুরুষের নির্যাতন, পুরুষকর্তৃক শ্রমের অবমূল্যায়নসহ নারীর প্রতি বিভিন্ন বৈষম্যর প্রতিবাদে ধর্মঘট পালন করে। একদিনের জন্য তারা কোন ধরনের কাজে যায়নি। চাকরি, রান্না-বান্না, ধোয়া মোছা থেকে শুরু করে শিশু পালন পর্যন্ত সকল ধরনের কাজে তারা সেদিন ইস্তফা দিয়েছিল। সকল শ্রেণীর সকল বয়সী প্রায় পঁচিশ সহস্রাধিক নারী ঘর থেকে বেরিয়ে লিকজারটোরগ স্কয়ারে জমায়েত হয়ে স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত করে তুলেছিল পুরো স্কয়ার। পুরুষের সমান মজুরিসহ সমাজে নারীর প্রতি সকল বৈষম্য দূরীকরণে সেদিনকার সেই আন্দোলন ব্যাপক ফলপ্রসূ হয়েছিল। এরফলে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে নারীকে সমান মূল্য দেয়া শুরু হয়ে যায়। ওই আন্দোলনের প্রেক্ষিতে আজ চল্লিশ বছর ধরে আইসল্যান্ডে নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত হয়ে আসছে। লৈঙ্গিক সমতার দিক থেকে আইসল্যান্ড বিশ্বে শীর্ষে অবস্থান করছে যা এই আন্দোলনেরই ফসল।

উইলসডন, নর্থ লন্ডন, ১৯৭৬-৭৮

উইলসডনের গ্রুনউইক ফিল্ম প্রসেসিং ল্যাবরেটোরিতে এশিয়ান এবং পশ্চিম আফ্রিকান নারীদের প্রতি যে জাতিগত এবং নারী বিদ্বেষের প্রদর্শন করা হতো তার বিরুদ্ধে ছিল এই আন্দোলন। অভিবাসী নারীদের বিশেষ করে এশিয়া ও পশ্চিম আফ্রিকার কালো নারীদের কম মজুরি দেয়াসহ বিভিন্নভাবে যৌন নিপীড়ন ও অধিকার খর্বের প্রতিবাদে এই আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল। এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন জায়াবেন দেশাই। আন্দোলনকারীদের প্রতি পুলিশি হামলা হয়েছিল। লৌহমানবী থ্যাচারের সরকার এ কারণে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়। এ আন্দোলনকে নিয়ে ক্রিস থমাস ‘ দ্য গ্রেট গ্রুনউইক স্ট্রাইক- এ হিস্ট্রি’ নামের সিনেমাও তৈরি করেছেন। এই আন্দোলনের কারণে দীর্ঘমেয়াদে এশিয়া, পশ্চিম আফ্রিকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের অভিবাসী নারীদের কর্মক্ষেত্রে অধিকার নিশ্চিত হয়।

আফগানিস্তান, মে ২০০৭

মালালাই জোয়া এই দিনটিতে আফগানিস্তানের পার্লামেন্ট লয়াজিরগায় যুদ্ধপ্রভু এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিপক্ষে সাহসী বক্তব্য রেখেছিলেন। তিনি পার্লামেন্টে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইয়ের নেতৃত্বেরই কেবল সমালোচনা করেননি, তিনি তাকে সমর্থনকারী পশ্চিমা প্রভুদেরও কড়া সমালোচনা করেন। নারী পার্লামেন্ট সদস্য জোয়া বলেছিলেন, আমি তাদের শ্রদ্ধা করি যারা দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়েছেন, আর তাদের ঘৃণা করি যারা ষাট হাজারের মতো নিরীহ মানুষ হত্যার জন্য দায়ী। তাঁর বক্তব্যে ক্ষিপ্ত হয়ে পার্লামেন্টের পুরুষ সদস্যরা কেবল গালাগালি, পানির বোতল তার দিকে ছুড়েই ক্ষান্ত হয়নি, তারা তাকে শারীরিকভাবেও লাঞ্ছিত করে। এবং জোয়াকে পার্লামেন্ট থেকে তিন বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়। এই ঘটনায় পুরো আফগানজুড়ে তুমুল প্রতিবাদের জোয়ার সৃষ্টি হয়। তালেবান আমলে গৃহবন্দী নারীরা কারজাই শাসনামলে অল্পবিস্তর অধিকার লাভ করা শুরু করলেও তা যথেষ্ট ছিল না।

ব্যাঙ্গালোর, ইন্ডিয়া, ফেব্রুয়ারি, ২০০৯

কট্টরপন্থী শ্রী রাম সেনার চল্লিশজনের মতো সদস্যে ম্যাঙালোরের ‘এ্যামনেশিয়া’ নামের একটি বারে ঢুকে সেখানে অবস্থানরত নারীদের মারদোর করে। দিনটি ছিল ২৪ জানুয়ারি, ২০০৯। নারীরা সিগারেট-মদ খেয়ে নাচ-গানের মাধ্যমে বেহায়াপনা করে ভারতের ঐতিহ্যকে ভূলণ্ঠিত করছে, এমন অভিযোগ এনে তারা নারীদের ওপর বর্বোরোচিত হামলা চালায়। এতে দুজন নারী গুরুতর আহত হয়। এই আক্রমণের দৃশ্য ইউটিউবে ছড়িয়ে পড়লে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। রাম সেনার বিরুদ্ধে পিঙ্গ চাড্ডি তথা গোলাপী জাঙ্গিয়া নামের অভিনব এক আন্দোলন গড়ে ওঠে। ভালবাসা দিবসে প্রমোদ মুত্তালিকের রাম সেনাদের গোলাপী জাঙ্গিয়া তথা পিংক চাড্ডি উপহার দেয়ার জন্য আন্দোলনকারীরা সবাইকে আহ্বান করে।

কাম্পালা, উগান্ডা, ফেব্রুয়ারি ২০১৪

উগান্ডা সরকার নারীদের মিনিস্কার্ট পরা নিষিদ্ধ করলে এর প্রতিবাদে পুরো নারীরা আন্দোলনে নামে। মিনিস্কার্ট নিষিদ্ধ করার পর দেশটিতে নারীদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা শুরু হয়। অথচ দেশটিতে মিনিস্কার্ট পরা ঐতিহ্যরই অংশ। কিন্তু স্বৈরাচারী লোকোডোর সরকার এ্যান্টি পর্নোগ্রাফি এ্যাক্টের অধীনে এই আইন জারি করে। যেসব নারী মিনিস্কার্ট পরে রাস্তায় বের হয়েছিল, তাদের সরকারের লোকজন জনসমক্ষে নগ্ন করে শাস্তি দেয়া শুরু করে। পুরুষ কর্তৃক নারীদের হয়রানি এবং মিনিস্কার্ট নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদে দু’শতাধিক নারী ন্যাশনাল থিয়েটারের সামনে জড়ো হয়ে আন্দোলন চালায়।

লিমা, পেরু ৭ মার্চ, ২০১৪

বিশ্ব নারী দিবসের ঠিক আগের দিন দক্ষিণ আমেরিকার পেরুর রাজধানী লিমাতে নারী অধিকার আদায়ের কয়েক হাজার কর্মী লাল পোশাক পরে নারীবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সামনে জড়ো হয়ে আন্দোলন শুরু করে। তারা নারীর প্রতি পুরুষের শারীরিক নির্যাতন, নির্যাতনকারীদের কোন বিচার না হওয়াসহ নারীর প্রতি বিভিন্ন বৈষম্যমূলক আচরণের প্রতিবাদে এই আন্দোলন করে। তাছাড়া সরকার কর্তৃক নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের প্রতিবাদও এই আন্দোলনের মাধ্যেমে করা হয়েছিল। এই আন্দোলনে তারা লাল পোশাক পরে আধিবাসী নৃত্য করে।

বেজিং, চীন, মার্চ ২০১৫

এ বছরের মার্চে বিশ্ব নারী দিবস যেন বেইজিংয়ে পালিত হতে না পারে, এজন্য চীনের পাঁচটি সন্ত্রাসবাদী গেরিলাগোষ্ঠী হুমকি দিয়েছিল। এরা পোগ্রাম বাতিল করার জন্য উদ্যোগও নিয়েছিল। কিন্তু নারী দিবসের আগেই তাদের গ্রেফতার করা হয়েছিল। এই গ্রেফতার করার কাজটিকে ত্বরান্বিত করেছিল দেশটির নারী অধিকার কর্মীদের আন্দোলন। তারা শুধু সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধেই আন্দোলন করেনি, দেশের সরকারের পুরুষ কর্তৃক নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে বিরূপ দৃষ্টিভঙ্গি, যৌন হয়রানির বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ করেছিল। বিশেষ করে কর্মস্থলে যৌন হয়রানির বিষয়টি তাদের আন্দোলনে গুরুত্ব পায়। সাদা বিয়ের পোশাকে তারা রাস্তায় মিছিল করে।

লন্ডন, ৭ অক্টোবর, ২০১৫

লন্ডনের লেইসিস্টার স্কয়ারের ওডিওন সিনেমাহলে ‘সাফরাজেট’ নামের সিনেমার প্রিমিয়ারে সিস্টারস আনকাট নামের সংগঠনের শতাধিক কর্মী ব্যারিয়ার তথা প্রতিবন্ধককে উপেক্ষা করে লাল কার্পেটে ঝাঁপিয়ে পড়ে ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স তথা গৃহ নির্যাতনের প্রতিবাদ জানায়। আন্দোলনকারীদের ঠেলে, ধাক্কিয়ে এমনকি শারীরিক হয়রানির মধ্যদিয়ে বের করে দেয়া হয়। সিনেমাহলের বাইরে বোম্বিংও হয়। আন্দোলনকারীরা বলতে চেয়েছিল, কেবল ভোটাধিকার অর্জনের মধ্য দিয়েই নারীর সকল অধিকার অর্জিত হয়েছে, এমনটি নয়। যুদ্ধ শেষ হওয়ার অনেক বাকি। আন্দোলনকারীরা বুঝিয়ে দিয়েছেন এ সমাজে এখন চরমভাবে নারী বৈষম্য বিদ্যমান। নারী-পুরুষ সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।

গার্ডিয়ান অবলম্বনে