১১ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

হিমহিম স্মৃতির ভিড়ে ॥ মুক্ত গদ্য

  • শিউলী আহমেদ

মাঝে মাঝে মনে হয় মানুষের জীবনটা একটা স্মৃতির পাহাড়। এক জীবনে কত রকম স্মৃতিতে যে ভরপুর থাকে। আর সবচেয়ে বেশি মধুময় মনে হয় শৈশব স্মৃতি। শীতের হিমহিম বাতাস বইতে শুরু করলেই স্মৃতিরা যেন ঝাপি খুলে বসতে চায়, শীতের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সময়টা আমাকে সব সময়ই আলোড়িত করে। টুপটাপ করে স্মৃতিগুলো সামনে ঝরে পড়তে থাকে। ছোটবেলাটা অনেক গুছানো আর রঙিন ছিল। আমার শহরে জন্ম, শহরেই বেড়ে ওঠা, তাই শীতের গ্রাম দেখা হয়নি, তবে খুব ছোটবেলায় এই ইট-পাথরের শহরেই গ্রামের খুব সামান্য কিছু পরশ আমি পেয়েছিলাম। শীতের সবজিভরা ফসলের ক্ষেত, ঘন কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল আর শিউলিঝরা ভোর, ব্যস এটুকুই। সেই ছোট্টবেলার ঝাপসা স্মৃতি আজো আমায় হাতছানি দেয়, হিমেল বাতাস বইতে শুরু করলেই ইচ্ছে হয় হেঁটে যাই গাঁয়ের মেঠোপথ ধরে, যে পথের দু’পাশে থাকবে শীতের সবজিভরা ফসলের ক্ষেত ঘন সবুজ পাতার ফাঁকে সাদা দাঁত বের করা ফুলকপির ক্ষেত, কখনো গোলাপের পাপড়ির মতো পাতামেলা সবুজ বাঁধাকপি, কখনো ছোট্ট সবুজ পাতার আড়াল থেকে উঁকি দেয়া লাল টুকটুকে টমেটো। আবার কখনো সবুজ ধানক্ষেত বা পাকা সোনালি ধানক্ষেত, কৃষকেরা ব্যস্ত ধান কাটায়। কেউবা মাথায় করে নিয়ে যাচ্ছে পাকা ধান। ধান ক্ষেতের এসব দৃশ্য আমার কখনো সামনে থেকে দেখা হয়নি। খুব ইচ্ছে করে শীতের এই জৌলুসে গা ভাসিয়ে দিই। আর আছে শীতের শিউলি ফুল। শিউলি যদিও শরতের ফুল কিন্তু শীতের সঙ্গে শিউলির আছে এক গভীর মিতালী। এই শিউলির যে কত নাম। বাংলায় শিউলি শেফালী, ছোটবেলার কাউকে কাউকে বলতে শুনেছি সিঙ্গারা ফুল। হিন্দিতে বলে হরসিঙ্গার। সংস্কৃত ভাষার পরিজাত ও শেফালিকা। উদ্ভিদ বিজ্ঞানীর নাম নাইকসানথেসো আব্রাথ্রেসবটিসা। পরিবার ওলিয়েসিয়াই। ইংরেজীতে বলে নাইট জেসমিন, ট্রি অব সরো, কুইন অব দ্য নাইট এবং কোরাল জেসমিন।

শিউলি ফুলের সঙ্গে আমার মাখামাখি সেই ছোট্টবেলা থেকে। বাবা খুব ভোরে উঠে মসজিদে যেতেন নামাজ পড়তেন, মসজিদের দেয়াল ঘেঁষা ছিল একটি শিউলি ফুলের গাছ। তাই এই অন্ধকার ভোরে ঘুম থেকে উঠে আমাকে কোলে করে নিয়ে যেতে হতো। বাবা নামাজ পড়তেন আর আমি কোচড় ভর্তি করে ফুল কুড়াতাম। যখন আমি প্রাইমারিতে পড়ি। পাশের বাসার এক ভাই তার ছোট বোনকে নিয়ে সকালে বের হতো, আমিও সেই দলে ভিড়লাম। ৩ জনে মিলে হেঁটে হেঁটে দূরে চলে যেতাম। আর এত্ত ফুল নিয়ে বাসায় ফিরতাম। দু’জনে মিলে প্রতিযোগিতা লেগে ফুল কুড়াতাম, মাঝে মাঝে ওই ভাইয়ার বন্ধুরাও সঙ্গে যেত। তারা কোন অফিস বা বাসার দেয়াল টপকে গোলাপ, গন্ধরাজ গাঁদা ফুল চুরি করে এনে দিত। এসব ফুল ছিল বাড়তি পাওয়া। আমিতো কোচড় ভর্তি শিউলি ফুল পেলেই খুশি।

বাসায় ফিরেই সুঁই-সুতা নিয়ে বসে যেতাম। বিভিন্ন রকম মালা বানাতাম। কখনো আস্ত বোঁটাসহ মালা, কখনো অর্ধেক বোঁটাসহ মালা আবার কখনো পুরো বোঁটা ফেলে শুধু পাপড়ির সঙ্গে সামান্য রেখে মালা বানাতাম। এই মালাটা খুব ঘন হতো। একদিন ফুল আনতে যেতে না পারলে অথবা কখনো যেতে দেরি হলে এবং ফুল না পেলে মন খুব খারাপ হতো। আমার এই পাগলামি দেখে আমার আপু টবে একটি শিউলি ফুলের চারা লাগিয়ে দিল। দোতলার বারান্দার বাইরে বাঁশ বেঁধে সুন্দর বাগান করেছিল আপু। বছর ঘুরতেই গাছটিতে ফুল ফুটতে শুরু করল। প্রথমদিকে ফুলগুলো আকারে ছোট হতো। কিন্তু সমস্যা হলো সব ফুল বাইরে পড়ে যায়। আপু একটি বুদ্ধি করল। প্রতিদিন সন্ধ্যায় গ্রিলের বাইরে ছাতা মেলে দড়ি দিয়ে বেঁধে দিত। আর সকালে উঠে দেখতাম সব ফুল ছাতায়। বড় একটা সুতা নিয়েছিলাম। প্রতিদিনের সব ফুল তাতে গেঁথে রাখতাম, বাসা বদলানোর পর গাছটি ধীরে ধীরে মরে যায়। দুই বোন মিলে অনেক চেষ্টা করেছিলাম বাঁচাতে পরিনি। বেশ কিছুদিন পর বাসার কাছেই একটি গাছ আবিষ্কার করলাম। হঠাৎ একদিন দেখি গাছটি নেই। এ্যাপার্টমেন্ট করবে বলে কেটে ফেলেছে। এরপর ইডেন কলেজে পাই অনেকগুলো গাছ। আমার ডিপার্টমেন্টের সামনেই ছিল ২টি বড় গাছ। ইডেন শেষ করে যখন চাকরিতে যোগ দেই তখন অফিসের পাশেই পেলাম একটি গাছ। ভয়ে ভয়ে বাড়ির গেট খুললাম। কত্ত ফুল পড়ে আছে। ঢুকব কি ঢুকব না, ভাবতে ভাবতে ঢুকেই গেলাম। খুব ভয় লাগছিল যদি কোন কুকুর তেড়ে আসে। প্রথমদিন অল্প ফুল নিয়েই চলে এলাম। পরে সাহস হয়ে গেল। প্রায় প্রতিদিনই যেতাম মনটা খুশিতে ভরে থাকত। অফিসের এক পিয়ন খেয়াল করল আমার এই ফুল কুড়ানো। যখন আমি যেতে পারতাম না তখন সে শিউলি ফুল দিয়ে আমার টেবিল ভরে দিয়ে যেত।

একদিন ওই বাড়ির মালিকও গাছটি কেটে ফেলল।