২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ভাস্বর ভাষা সংগ্রামী

  • সৌরভ দাস

আমরা মাঝে মধ্যে উচ্ছ্বল-চঞ্চল একদল ছাত্র-যুবাকে দেখি যারা আন্দোলন করে। অধিকার আদায়ের আন্দোলন। তাদের আন্দোলনে এসে শামিল হয় ঠা ঠা রোদ্দুরে পোড়া কৃষক, হাত-পায়ের পাতায় চিড় ধরা শ্রমিক। সবাই একযোগে সেøাগান দেয় আঙুল তুলে অসম্ভব শক্তিশালীর বিরুদ্ধে। আকাশ-বাতাস সব থমকে যায়। নিন্দুকেরা হয়ে পড়ে স্তম্ভিত। ওই শক্তিশালীও অনুভব করে- যে মগডালে বসে সে এতদিন হুকুম দিচ্ছিল সেই মগডাল ঘুণে ধরেছে। তার উগ্র চোখ দুটো নিমিষেই বেড়ালের মতো হয়ে যায়।

এই যে ছাত্র-যুবা যাদের সঙ্গে কৃষক-শ্রমিক-জনতা দলে দলে সেøাগান দিয়ে ভেঙ্গে দিচ্ছে সুউচ্চ মগডালগুলো বিষয়টা কি অতি সহজ? এর জন্য প্রভাবক হিসেবে কাজ করে যোগ্য সময় ও যোগ্য নেতৃত্ব। এই দুইয়ের সম্মিলনেই ঘটে গণবিস্ফোরণ। সেরকমই এক নেতৃত্ব আব্দুল মতিন। আমাদের সবার ভাষা মতিন। সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার ধুবালীয়া গ্রামে তাঁর জন্ম। শৈশবের পুরো সময়টা কেটেছে দার্জিলিংয়ে। স্কুল জীবনও কেটেছে দার্জিলিংয়ে। এরপর ভর্তি হন রাজশাহী গবর্মেন্ট কলেজে। উচ্চ মাধ্যমিক পাসের পর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখনে পড়াশোনা করেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে। আব্দুল মতিন নামটির সঙ্গে আমরা অনেকেই পরিচিত। সারাটা জীবন যুক্ত ছিলেন বাম রাজনীতির সঙ্গে। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত গেয়ে গেছেন লাল পতাকার জয়গান। ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে তাঁর নামটি জড়িয়ে আছে ওতপ্রোতভাবে। ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন বেশ কিছুদিন। এরপর ১৯৫৪ সালে পাবনা জেলা কমিউনিস্ট পাির্ট, ১৯৫৭ সালে ভাসানীর ন্যাপ, ১৯৫৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল), ১৯৯২ সালে ওয়ার্কার্স পার্টিতে যোগ দেন।

প্রেক্ষাপটটি ছিল তেলের শিশি ভাঙার কয়েক বছর পরের। নতুন রাবণ সবেমাত্র সিংহাসনে আরোহণ করেছে। দেশজুড়ে একদিকে চলছে লুটপাট আর শোষণের সমারোহ। সেই সঙ্গে একটি জাতির হাজার বছর ধরে চলে আসা সংস্কৃতিকে জোর করে পাকিস্তানী সংস্কৃতি বানানোর এক নিষ্পন্দ প্রক্রিয়া।

সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল বিশেষ সমাবর্তন। আয়োজিত হয়েছিল কার্জন হলে। বক্তা হলেন তেলের শিশির অর্ধেক মালিক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। তিনি বেশ ভদ্রলোকের মতোই সাবলীল ভাষায় বক্তব্য দেয়া শুরু করলেনÑ ‘...কেবল একটি রাষ্ট্রভাষা থাকতে পারে। যদি এই রাষ্ট্রের গঠনকারী অংশসমূহ ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে সেই ভাষা আমার মতে কেবল উর্দুই হতে পারে।’

এ যেন কোন অবুঝ শিশুর অবাস্তব আবদার। কিংবা বোকা প্রেমিকের কাছে আদুরে প্রেমিকার পাগলামি চাওয়াÑ ‘তুমি আমাকে আকাশের চাঁদ এনে দাও!’

বাংলা ভাষাভাষী মানুষজনই ছিল তৎকালীন পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ। মোট জনসংখ্যার ৫৬.৪০%। আর উর্দু ছিল মাত্র ৩.২৭% এর ভাষা। মাত্র ৩.২৭% এর স্বার্থের জন্য ৫৬.৪০% মানুষ নিজের ভাষা, ব্যক্তিত্বকে বিসর্জন দেবে? তড়াক করে উঠে দাঁড়ালেন আব্দুল মতিন। জিন্নাহর বক্তব্যের মাঝেই তিনি উঠে দাঁড়িয়ে এর প্রতিবাদ করলেন। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদে মুখরিত হয়ে উঠল পুরো কার্জন হল।

বড় আকারে প্রতিবাদের শুরুটা কিন্তু এখান থেকেই। পাকিস্তানী শাসকরা বিষয়টিকে এবার বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নিল।

সময়টা ছিল উত্তাল। দেশের প্রতিটি মানুষ নিজের জীবনকে তোয়াক্কা না করে নেমে পড়েছে রাজপথে। বিশেষ করে জাতির ভবিষ্যত কর্ণধার ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছেলেগুলো। নিজের মস্তকে বজ্রাঘাতের মতো বিষয়টি ঠেকছে তাদের কাছে।

এই মুহূর্তে সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি দিল এক ভুল সিদ্ধান্ত। রাষ্ট্রের জারি করা ১৪৪ ধারা তারা ভাঙবে না। কমিটির ১৫ সদস্যের মধ্যে ভোটাভুটি হয়। তাদের মধ্যে ১১ জনই ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার বিপক্ষে ভোট দেন আর পক্ষে ভোট দেন মাত্র ৪ জন। এই চার জন হলেনÑ আব্দুল মতিন, অলি আহাদ, শামসুল আলম ও গোলাম মাওলা।

স্পষ্টত আমরা দেখতে পাচ্ছি ১৪৪ ধারা ভাঙ্গা হচ্ছে না। কারণ প্রত্যেক সংগঠনে চেইন অব কমান্ড বলে একটা বিষয় আছে। একটা সিদ্ধান্ত অনেকের কাছে ভুল মনে হলেও সংগঠনের প্রত্যেক নেতাকর্মী সেটা মানতে বাধ্য। তাই এ সিদ্ধান্তও ওই বিপক্ষে ভোট দেয়া চারজনও মানতে বাধ্য। এ সিদ্ধান্তকে ডিঙিয়ে কিছু একটা করা মানে সংগঠনের কালসাপে পরিণত হওয়া এবং সংগঠনকে ডিসমিস করে দেয়া। অথচ ওই সময়ের জন্য এ সিদ্ধান্তটা তৎকালীন শাসকদের ভোঁতা মুখটাকে আরও ধারালো করার জন্যই ব্যবহৃত হতো। ভাষার দাবিকে বিন্দুমাত্র ত্বরান্বিত করত না। তাহলে কিভাবে সম্ভব হলো এই ১৪৪ ধারা ভাঙ্গা? এক প্রকার অসাধ্যকে সাধন করা? হ্যাঁ, সেটা হয়েছিল ভষা মতিনের দ্বারাই। ২১ ফেব্রুয়ারি সকালবেলা শামসুল হক ‘সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি’র সিদ্ধান্ত উত্থাপন করেন। তিনি ছাত্রদের বুঝানোর চেষ্টা করেন, এখনও সময় আসেনি। এখন ১৪৪ ধারা ভাঙ্গা মানে নিজেদের মধ্যকার ঐক্যকে ভাঙ্গা। এক সময় আব্দুল মতিন বক্তব্য দেয়ার জন্য ওঠে দাঁড়ান। তার নজরে পড়েছিল ছাত্রদের জলন্ত বিদ্রোহী চোখ। সেখান থেকে খানিকটা সময় পর পর ফিনকি দিয়ে উপচে উঠছে বিদ্রোহের আগুন। আবদুল মতিন ঝর্ণার জলের মতো স্পষ্টভাবে বুঝতে পেরেছিলেন, সংগঠনের ঝুলোঝুলি সিদ্ধান্ত মানার সময় এটা নয়। এবার দাঁড়াতে হবে শুধু শাসক শ্রেণীর বিরুদ্ধে নয়, নিজের প্রাণপ্রিয় সংগঠনের বিরুদ্ধেও। বক্তব্য শুরু করেন আবদুল মতিন। আবদুল মতিনের বক্তব্যে নিমিষেই উত্তপ্ত হয়ে যায় পুরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। প্রবল বেগে প্রবাহিত হতে থাকে প্রতিটি তরুণের প্রতিবাদের স্পৃহা। হিমশিম খেয়ে গেল সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির নেয়া সিদ্ধান্ত। সবাই বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছেন আব্দুল মতিনকে। এরপর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, ১৪৪ ধারা ভাঙ্গা হবে। তবে মিছিলের মাধ্যমে নয় নয়! ভিন্ন কৌশলে। দশজন করে করে সবাই বের হবে। ফলে ব্যাপক আকারের পুলিশ সংঘাত এড়ানো সম্ভব হবে। যেই সকলে মিলে ১৪৪ ধারা ভাঙ্গা শুরু করল সঙ্গে সঙ্গে পুলিশও শুরু করল গ্রেফতার অভিযান। কিন্তু পরিস্থিতি তখন এমনই এক জটিল পর্যায়ে চলে গিয়েছিল যে জনস্রোতকে থামাতে পুলিশের বেপরোয়া লাঠিচার্জ ও কাঁদুনে গ্যাস পর্যন্ত ছুড়তে হয়। নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক আকারে খ-যুদ্ধ হয় বিভিন্ন স্থানে। নিহত হয় সালাম, রফিক, জব্বারসহ অনেকে। আহত হয় অসংখ্য ছাত্র ও সাধারণ মানুষ। আন্দোলনের এরূপ ভয়াবহতা দেখে চমকে ওঠে পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী। এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায়ই একপর্যায়ে তারা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে বাধ্য হয়।

সুতরাং আমরা দেখছি একজন মানুষের একটা সিদ্ধান্তই পাল্টে দিয়েছে একটা আন্দোলনের গতিপথ। এখানেই মূলত একজন নেতার স্বার্থকতা। পাবলিকের পালস বুঝতে পারা। যেটা পেরেছিলেন আমাদের ভাষা মতিন। সেই আন্দোলনের পরেই আমরা নির্ভয়ে বলে যাচ্ছি আমার মায়ের ভাষা, মাতৃভাষা বাংলা। ভাষা মতিন, লাল সালাম।