২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রবীন্দ্র গোপের নির্বাচিত ২০০ কবিতা

  • রেজা ফারুক

কবি ও রবীন্দ্র গোপের কাব্য পরিচিতি যতটা খ্যাতির উচ্চতা ছুঁয়েছে-তার নিরিখে নির্দ্বিধায় বলে নেয়া যায়- একজন কবি হিসেবে তার দীর্ঘ প্রায় পঞ্চাশ বছরে কবিতা রচনার সমুদ্রোপকূলে দাঁড়িয়ে তিনি নির্নিমেষে আজ হয়ে উঠেছেন বাংলা কবিতার এক প্রথিতযশা ভোরের ক্যাপ্টেন। সম্প্রতি জোনাকী প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে তার নির্বাচিত ২০০ কবিতা গ্রন্থ। যেটি ইতোমধ্যে পাঠক মহলে বেশ সমাদৃত হয়েছে। কবি রবীন্দ্র গোপ আপাদমস্তক একজন কবি। তার ওই ঝরন্ত কাব্য কিরণের গুঁড়ো জমতে জমতেই তিনি আজ বাংলা কাব্যসহিত্যে একটা নিজস্ব জায়গা করে নিয়েছেনÑ হয়েছেন পাঠক নন্দিত। পেয়েছেন সুখ্যাতি। ‘নির্বাচিত ২০০ কবিতা’ তাকে এক লাল সুরকিজ্বলা বাড়ির নেমপ্লেটে করে দিয়েছে উৎকীর্ণ। কবিতার মোরাম ডোবা পথে যেতে যেতে ফেলে আসা পঞ্চাশটির মতো বছর মানে- একজন কবির কাব্যারণ্যে শব্দের রেঞ্জার, পঙ্ক্তির সহযাত্রী হয়ে উড়ে যাওয়া পাখির পালকে লেগে থাকা নৈঃশব্দের গহন ছায়ার রিদমে এক কবিতা ভুবনের অবিশ্রাম সবুজ অনুরণন। কবি রবীন্দ্র গোপের কবিতা গ্রন্থের সংখ্যা ইতোমধ্যে ৩০টি ছাড়িয়েছে। সেই সিলভারকণ্ঠ কবিতার বনভূমি থেকে রাঙা মার্বেলের মতো অনেক যতেœ কুড়িয়ে নেয়া ২০০ কবিতাই আলোচ্য ‘নির্বাচিত ২০০ কবিতা’ গ্রন্থে শিশির কুচির মতো থরে থরে সাজিয়েছেন তিনি। কবি জানেন যে- তার রচিত প্রতিটা কবিতাই তার কাছে কতটা আপন। গল্প বোনার উপাখ্যানও রচিত হয়। সেই অজস্র স্বপ্নের মণিমুক্তা খচিত ২০০ কবিতার রোয়াকে বসে থাকা খয়েরি শালিকের রোয়াগুলোকে কবি রবীন্দ্র গোপ পাতায় পাতায় ছড়িয়ে দিয়েছেন নিবিড় আবেগে। নির্বাচিত ২০০ কবিতা কাব্যগ্রন্থের একটা নিজস্ব আত্মপরিচিতও অবধারিত হয়ে গেছে। কবি রবীন্দ্র গোপ একাধারে প্রেম ও প্রকৃতি এবং বিপ্লবের কবি। তার কবিতায় যেমন ভালবাসা এবং রোমন্টিকতার পিয়ানোর ঝঙ্কার ওঠে বেজে। কান্নার করুণ আর্তিজাগা পঙ্ক্তিও তার প্রেমের কবিতার কুয়াশার কার্ডিগানে থাকে জমে খুব সঙ্গোপনে। তেমনি তার সংগ্রাম আর বিপ্লবের কবিতায়ও উঠে আসে রাগী কলস্বর। তবে তার সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ আর স্বাধীনতার স্তবক ফোঁটা কবিতাগুলোতেও রয়েছে শৈল্পিক আবেশ। স্লোগানের হাল্কা মেজাজে তার কবিতাকে চিত্রিত করা যাবে না কখনই। উপরন্তু কাব্যিক ব্যঞ্জনায় ঋদ্ধ ভিন্ন মাত্রার এ কবিতাও হয়ে উঠেছে আঙ্গিক, প্রকরণ, প্যাটার্নে শতভাগ কাব্যময়। কাব্যরীতির সবটুকু দাবি পূরণ করেই তিনি আজ পাঠক সমাদৃত কবি।

তার কবিতায় যেমন রয়েছে ভিন্ন স্বরের গীতিময় উপমা, তেমনি রয়েছে প্রাঞ্জল চিত্রকল্পের অনুচ্চ গল্পগাথাও। শব্দচয়ন, বাক্যবিন্যাসের দিকেও কবি রবীন্দ্র গোপ নিরন্তর মনোনিবেশী। কবিতায় তার মনোসংযোগের ছবিটা এতোটাই উজ্জ্বল যে- ঘন ঘোর মেঘলা দুপুরও ওই ঔজ্বল্যকে আড়াল করতে পারে না।

পক্ষান্তরে তার প্রেমের কবিতাগুলো যেন একেকটি মেঘ করে আসা বিকেল। অপরাহ্ণের মৃদু আলোয় তার প্রেমের কবিতার মেলোডিয়াস কণ্ঠের কারুকাজ বৃষ্টির রূপালী দিগন্তের ঝাপসা হয়ে আসা চিবুকে ঠিক লাল এক পশলা জরুলের মতো থাকে ফুটে। পরাবাস্তবতা যেমন কবি রবীন্দ্র গোপের কবিতায় থেকে থেকে বাজিয়ে যায় দূরের আবছায়া পাখিদের ডানার ঝাপটানি। একইরকমভাবে নিঃসঙ্গ রাত্রির মাঠে-মাঠে ঝরে পড়া দেবদারু পাতার ঝরন্ত গুঞ্জরনেও কবি রবীন্দ্র গোপের কবিতা হয়ে যায় যেন বিবাগী বিষণœ নীল ব্যথিত গিটার।

ভেলভেটের মিহিন হাওয়ার মতোই তার কবিতা যেন লাল কলোনি বাড়ির লনে ফুটে থাকা সুরভিত কার্নেসন। ভোরের পোর্টিকোতে নীলাঞ্জন মেঘের কুহকডোবা ছায়াচ্ছন্ন প্রহর আর দূরে পাহাড়ের বাঁকে হারানো টয় ট্রেনের আকণ্ঠ নির্জনতা জাগা জানালায় কোন কিশোরীর উড়ন্ত স্কার্ফে লেগে থাকা জর্জেট রোদের মতোই কবি রবীন্দ্র গোপের কবিতা পাঠকের হৃদয়ে থাকে লেগে। আধুনিক কন্সেপ্ট যেমন তার কবিতার মোহনায় এসে ভিড়ে থাকে ধুমবৃষ্টিঝরা দিনের মতো। তেমনি উত্তর আধুনিকতা, যাদুবাস্তবতার মায়াবী মর্নিংরোজের সুগন্ধিও কবি রবীন্দ্র গোপের কবিতার ফুলকায় থাকে জ্বলে। শরতের রেশমি দুপুর যেন কী এক অদ্ভুত তরঙ্গ তোলে তার কবিতার স্বর্ণোপকূলে। ওঠে দুলে বিমূর্ত জ্যোৎ¯œার বজ্রার নির্জন গলুই। বনে বনে মেহগনি আর শিরীষের পাতার ফাঁকে ওঠে জেগে তার কবিতার কারচুপি মন। কবি রবীন্দ্র গোপের ‘নির্বাচিত ২০০ কবিতা’ গ্রন্থের লাল টালির বাড়ির উষ্ণীশে উড়িয়ে দ্যায় সমকালীন ভাবনা, বোধ আর সুরেলা অবগাহন। ‘নির্বাচিত ২০০ কবিতা’ গ্রন্থের প্রতিটি কবিতাই আলাদা মেজাজ, আলাদা উপলব্ধি, আলাদা-আলাদা উপাখ্যানের একেকটি ক্যানভাস, যে ক্যানভাসে কবি রবীন্দ্র গোপ কবিতাকে কখনো ড্রয়িং, কখনো স্কেচ, কখনো এক্রোলিক, কখনো লাইভ ফর্মে এমন এক সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম আদলে এঁকেছেন। যা পাঠকের মর্মরে জাগিয়ে তুলবে ভাললাগার গহীন স্ফুরণ। গ্লাডিওলাস ফুলের মতো তার কবিতা লাজুক কোন কিশোরীর জ্বলন্ত চিবুকে ওঠে জাগে। স্লিভলেস সন্ধ্যায় এক জ্যোৎ¯œাঙ্কিত পরীর গলার ভাঁজের মতো যায় ঝরিয়ে তার কবিতা কাঠচাপা সহস্র কোটি হীরের শবনম। আর মন যায় ছুঁয়ে-পাতা বাহারের নিঝুম পাতায় পাতায় বাটিক প্রিন্টের অফুরন্ত তারাপুঞ্জ। নৈসর্গিক কবিতা যেমন কবি রবীন্দ্র গোপের ইজেলে কালার ফুল সেন্সেশনে উন্মীলিত হয়। একইভাবে নাগরিক কবিতার করৌঞ্জও ফুটে ওঠে তার চন্দ্রাঙ্কিত কাব্যাকাশের নীল কঞ্চুলিকায়।

“আমি শুধু আলোজ্বেলে জ্বেলে/তোমার অন্ধকার ঠোঁটের গভীরতা থেকে, স্তনের উষ্ণ গ্রহণ লাগা চাঁদের শরীর থেকে/ কারো নষ্ট চুম্বনের ক্ষত চিহ্ন থেকে/তোমাকে আবিষ্কার করার চেষ্টা করি/তোমার তিনভাগ জলের শরীরে হলো না আমার/সাঁতার কাটা আর ডুবে ডুবে জাদুঘরের কড়া নাড়া’ (জাদুঘর) উদ্ভুত কবিতায় যে গ্ল্যামার কবি জড়িয়ে দিয়েছেন-তার এ্যাপিল্টা নিঃশব্দে ছুঁয়ে দ্যায় কোন মানবীর মায়াবী রেলিঙ।

কফি হাউস বসে আছে রমনা পার্কের কার্নিশে/তন্নি সুন্দরী বিরহী রমনী শরতের চাঁদ কপালে এঁকে/যেন কোন সুঠাম যুবক বন্ধুর প্রতীক্ষায়/সাদা মেঘের কুমার এখনই আসবে নেমে ওকে তুলে নিতে। কফি হাউস এক বিরহী রমনী)’ প্রেম ও নাগরিক বোধে শারদীয় নীলাম্বর মেঘমালার চিত্রময়তার নিপুণভাবে উঠে এসেছে কফি হাউসের এ’কবিতাটিতে। যা কবি রবীন্দ্র গোপের প্রেমিক সত্তাটাকে উদ্ভাসিত করে দ্যায় এবং একই ভাবে বৈশাখের চুল’ কবিতায় তিনি দেখিয়েছেন নগর জীবনের অনতিদূরে এক আবহমান প্রহরকে গভীর ব্যঞ্জনায়। বৈশাখের প্রথম দিনটা এবারই ঢাকার বাইরে/সোনার গাঁয়ের কাঠের ঘোড়াটা রশির বন্ধন ছিঁড়ে/আমর কাছেই ছুটে আসে আর রুইগুলো/দীঘির রূপালী বিছানায় ঢেউয়ে হেলান দিয়ে/বেহালা বাজিয়ে বৈশাখী গান গঢ় নির্মোহ এক উপলব্ধির অন্তর্গত ম্যাসেজ কবি দিয়েছেন এ’কবিতায়। কবি রবীন্দ্র গোপের কবি মনের করিডোরে আঁকা আল্পনার রঙের মসৃণ মায়াময়তায় পাঠক নির্বিশেষে পেয়ে যায় একজন স্বভাবজাত কবিতার নদী। যে নদী নারীর সিল্কি পিঠের মর্মরিত উপত্যকার প্রান্ত বেয়ে যায় হারিয়ে নিরুদ্দিষ্ট বাঁকে।

আর তারাডোবা সন্ধ্যার আকণ্ঠ ভাঁজে- ভাঁজে ছড়িয়ে যায় ডিওডোরান্টের ফুরফুরে জর্জেট বিকেল। কিন্তু কবি রবীন্দ্র গোপ ওই নদীকেই হৃদয়ের ড্রয়িংরুমে, চোখের পাতার নিভন্ত ব্যালকনিতে। এ্যাব্স্ট্রাক্ট এ্যাচিঙে আঁকেন গভীর স্বন্বিষ্টতায়, অমোঘ আবেগে। কবি রবীন্দ্র গোপের ‘নির্বাচিত ২০০ কবিতা’ গ্রন্থে তার লিরিকেল প্রেমের কবিতাকে যেমন ছড়িয়ে দিয়েছেন মার্বেলের মতো। তেমনি ঠাঁই পেয়েছে তার শিল্পম-িত বিপ্লবের কবিতাও। আর এ’ভাবেই আলোচ্য কাব্যগ্রন্থটি পেয়ে গ্যাছে সেই সেগুন সড়ক। যে সড়কের এ্যাশ্ফল্টে রোজ ইল্শেগুঁড়ি বৃষ্টি নামে। আর মেহগনি ছায়ারা হারায় অনিঃশেষ মেঘলা দিনের উসারায়।