২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বন্যপশুর প্রতি বাড়ছে মানুষের পৈশাচিকতা

বন্যপশুর প্রতি বাড়ছে মানুষের পৈশাচিকতা
  • এক দশকে দেড় শতাধিক হাতির মৃত্যু

কাওসার রহমান ॥ বন্যপশুর প্রতি বাড়ছে মানুষের পৈশাচিকতা। মানুষের হিংস্রতায় বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে দেশের বিরল বন্যপশুরা। গত ১৮ অক্টোবর জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে স্থানীয় গ্রামবাসী এমন পৈশাচিক রূপ দেখিয়েছে। দুটি বন্যহাতিকে বৈদ্যুতিক তারের খুঁটি দিয়ে ফাঁদ পেতে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। আবাসস্থল ধ্বংস, হাতির চলাচলের পথে ঘরবাড়ি নির্মাণে বাড়ছে মানুষ-হাতির সংঘাত। এ সংঘাতে গত এক দশকে দেড় শতাধিক হাতির মৃত্যু হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধির নেতৃত্বে গ্রামবাসী জেনারেটরের সাহায্যে বৈদ্যুতিক তারের ফাঁদে আটকে দুটি হাতি হত্যা করে। পরে হাতির দাঁত, শুঁড় ও কান কেটে নিয়ে যায় তারা। বর্বরতার সব রূপই দেখিয়েছে মানুষ। হাসতে হাসতে অনেকে রক্তমাখা বিশালকায় হাতির ছবিও তুলেছে। তখনও কাটা শুঁড়ের স্থান দিয়ে গলগল করে রক্ত বের হচ্ছিল। এ প্রসঙ্গে ময়মনসিংহের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা গোবিন্দ রায় বলেন, ‘জেনারেটরের বিদ্যুতে ফাঁদ পেতে হাতি দুটিকে মারা হয়েছে। হাতি দুটি মারা যাওয়ার পর কে বা কারা দাঁত, শুঁড় ও কান কেটে নিয়ে গেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ফাঁদ পেতে হাতি হত্যার ঘটনায় স্থানীয় থানায় একটি মামলা করা হয়েছে। গঠিত হয়েছে তদন্ত কমিটিও।’

জানা যায়, বাংলাদেশে হাতির সংখ্যা নিয়ে সর্বশেষ জরিপ হয় ২০০৪ সালে। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) ওই জরিপে বাংলাদেশে হাতির সংখ্যা ছিল ২২৭ থেকে ২৪০ এর মধ্যে। এছাড়া আরও প্রায় এক শ’ অস্থায়ী বা ভ্রমণকারী হাতি যারা ভারতের অসম, মেঘালয়, ত্রিপুরা, মিজোরাম ও মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চল থেকে বাংলাদেশে আসা-যাওয়া করে। অথচ ৫০ বছর আগে এ ভূখ-ে হাতির সংখ্যা ছিল প্রায় ৭শ’। পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্টত বোঝা যায়, বাংলাদেশে হাতি দিন দিন কমে আসছে।

আইইউসিএন জানিয়েছে, মানুষের সংখ্যা বাড়ায় দিন দিন বনের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। আর এটাই হাতির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। কারণ এর ফলে বাসস্থানের পাশাপাশি খাবার সঙ্কটেও পড়ছে হাতি। এছাড়াও জনসংখ্যা বাড়ার কারণে এখন অনেক মানুষ বনের খুব কাছে বসতি স্থাপন করছে। ফলে প্রায়ই দেখা যায় বন্যহাতিরা মানুষের বসতি এলাকায় ঢুকে পড়ছে। হাতির সঙ্গে স্থানীয়দের একটি সংঘাত তৈরি হচ্ছে। ফলে মারা যাচ্ছে মানুষ, কখনও প্রাণ হারাচ্ছে হাতিও। বন বিভাগের হিসাবে- গত ১৩ বছরে বন্যহাতির আক্রমণে কমপক্ষে ৯৩ জনের প্রাণহানি ঘটেছে।

হাতি কমে যাওয়ার নয়টি কারণ গবেষকরা উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো- বনাঞ্চল নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া, খাদ্য সঙ্কট, চলাচলের পথ রুদ্ধ হয়ে যাওয়া, যত্রতত্র জনবসতি গড়ে ওঠা এবং চোরাশিকারীদের হাতে হত্যা। বন বিভাগ বলছে, ২০০১ থেকে ২০১৫ সালের ৩০ জুলাই পর্যন্ত শুধু বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলার ছয়টি উপজেলার সংরক্ষিত বনাঞ্চলে দাঁত ও হাড়গোড়ের জন্য অন্তত ১৫২ হাতি হত্যা করা হয়। এর মধ্যে চলতি ২০১৫ সালে কাপ্তাইয়ে দুর্বৃত্তের গুলিতে একটি, বিদ্যুত সংযোগ তারে বিদ্যুতস্পৃষ্ট হয়ে দুটি এবং লংগদুতে মারা গেছে একটি হাতি। এ ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হচ্ছে চোরাশিকারীদের উপদ্রব। ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত শুধু বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলার ছয়টি উপজেলার সংরক্ষিত বনাঞ্চলে দাঁত ও হাড়গোড়ের জন্য ৩২ হাতি হত্যা করা হয়। হাতি রক্ষায় উদ্যোগ নিতে হবে জরুরীভিত্তিতে।

এ প্রসঙ্গে আইইউসিএনের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ ইশতিয়াক উদ্দীন আহমদ বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় তিন শ’ থেকে সাড়ে তিন শ’ বন্যহাতি রয়েছে। কিন্তু এরা এখন ‘মহাসঙ্কটাপন্ন’ অবস্থায় রয়েছে। দেশের সীমান্তবর্তী উত্তরাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে মানুষ-হাতি বিরোধ একটি নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ফসলের মৌসুমে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়ী এলাকা থেকে পরিযায়ী হাতি দেশের শেরপুর, জামালপুর, নেত্রকোনা ও সিলেটের সীমান্তবর্তী সমতলে নেমে আসে।

আইইউসিএনের গবেষণায় দেখা গেছে, হাতির চলাচলের পথ রুদ্ধ হওয়া এবং হাতির আবাসস্থল কৃষিকাজের জন্য বেদখল হওয়ায় মানুষ-হাতির বিরোধ বাধছে। বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক চারণভূমি ও হাতিবান্ধব বনাঞ্চল না থাকায় হাতি তার খাবারের জন্য ফসলের মাঠে ও মজুত করা খাদ্যশস্যের জন্য ঘরবাড়িতে হানা দিচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, মানুষ-হাতি বিরোধে ২০১৪ সাল পর্যন্ত এ অঞ্চলে ৩৩ মানুষ ও নয়টি হাতি মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

ইশতিয়াক উদ্দীন আহমদ বলেন, প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্রমাগত অবক্ষয়ের কারণে মানুষ ও হাতির মধ্যে চলমান বিরোধ সম্পূর্ণ নিরসন সম্ভব নয়। শুধু উপযুক্ত কৌশলের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে সমস্যাটির ব্যাপকতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব। আর এ লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ও বাংলাদেশ বন বিভাগের সহযোগিতায় বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ, আইইউসিএন এবং হিউম্যান ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির (এইচইডিএস) উদ্যোগে শেরপুর-জামালপুর জেলার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বিভিন্ন প্রকল্প পরিচালনা করা হচ্ছে। আশা করা যায়, প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে সবার আন্তরিক প্রচেষ্টায় মানুষ-হাতি বিরোধ সমস্যাটির ব্যাপকতা অনেকাংশে কমে আসবে।

বাংলাদেশের স্থায়ী বন্যহাতির আবাসস্থল হচ্ছেÑ চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি। এর মধ্যে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ, বাঁশখালী, পটিয়া ও রাঙ্গুনিয়া; কক্সবাজারের কাসিয়াখালি, রামু, উখিয়া ও টেকনাফ; বান্দরবানের লামা ও আলিকদম; রাঙ্গামাটির কাউখালি, কাপ্তাই ও লংগদু এবং খাগড়াছড়িসহ দেশের ১১ বন বিভাগে এদের বিচরণ করতে দেখা যায়। গবেষক ড. রেজা খানের জরিপ অনুযায়ী, ১৯৮০ সালে বাংলাদেশে বন্যহাতির সংখ্যা ছিল ৩৮০। ২০০০ সালে ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড লাইফ ফান্ডের গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে বন্যহাতির সংখ্যা ২৩৯। সর্বশেষ ২০০৪ সালে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) করা জরিপে পাওয়া যায় ২২৭।

আইইউসিএনের দেয়া তথ্যানুযায়ী, বন বিভাগের চট্টগ্রাম দক্ষিণ অঞ্চলে হাতি আছে ৩০ থেকে ৩৫, কক্সবাজার উত্তর ও দক্ষিণ বিভাগ মিলিয়ে আছে ৮২ থেকে ৯৩। বান্দরবানে আছে ১২ থেকে ১৫ এবং লামা বিভাগে আছে ৩৫ থেকে ৪০ হাতি। এছাড়া কক্সবাজার উত্তর বিভাগে আরও ৭ থেকে ৯ এবং দক্ষিণ বিভাগে ৩০ থেকে ৩৫ হাতি রয়েছে। আর অভিবাসী হাতির সংখ্যা ৮৪ থেকে ১০০।

গবেষকরা বলছেন, হাতির কারণে বনাঞ্চল টিকে থাকে এবং ক্রমান্বয়ে সম্প্রসারিত হয়। আর বনাঞ্চল থাকলে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হবে এবং চারপাশে প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ বিদ্যমান থাকবে। তাই বন্যপ্রাণী হাতি সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে হাতি সংরক্ষণ নিয়ে চুক্তি করা যায় কিনাÑ সে বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা করতে হবে। পাশাপাশি হাতির আক্রমণ থেকে সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মানুষের জীবন রক্ষার জন্যও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

হাতি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্থলচর বন্যপ্রাণী। একই সঙ্গে অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক প্রজাতি। হাতির দেহ বিশালকায়। পূর্ণবয়ষ্ক একটি হাতির ওজন ৩ টন পর্যন্ত হয়ে থাকে। দেহের দৈর্ঘ্য ৬৫০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়। এদের কান খুবই চওড়া। দেহের তুলনায় চোখের আকার খুবই ছোট। দেহের চামড়া কুচকানো এবং রং ধূসর। হাতি দেহের বৈচিত্র্যপূর্ণ অংশ হল শুঁড়। এদের নাক বর্ধিত হয়ে শুঁড়ে পরিণত হয়। এ শুঁড় অত্যন্ত শক্তিশালী ইন্দ্রিয় হিসেবে কাজ করে। কোনকিছু তোলা, ধরা, ঘ্রাণ নেয়া, শরীর পরিষ্কার করা, পানি ধরে রাখা ইত্যাদি কাজে এরা শুঁড় ব্যবহার করে থাকে। শুঁড় দিয়ে অনায়াসেই ২৭০ কেজি পর্যন্ত ওজন তুলতে পারে। পোকামাকড় থেকে রক্ষা ও দেহের তাপমাত্রার ভারসাম্য বজায় রাখতে বেশিরভাগ সময় এরা দেহে মাটি মাখিয়ে রাখে। পানি ও মাটি নিয়ে খেলা করতে পছন্দ করে।

হাতি তৃণভোজী প্রাণী। এরা রাত-দিন সব সময়ই খাবারের খোঁজে এক স্থান থেকে অন্যস্থানে ঘুরে বেড়ায়। গাছের পাতা, বাঁশ, কলা গাছ, লম্বা ঘাস, ফুল, নারিকেল গাছের কচিপাতা ইত্যাদি খেয়ে থাকে। প্রায়ই মানুষের প্রতিরোধ এড়িয়ে ফসলের মাঠে ঢুকে ফসল খেয়ে ফেলে। প্রতিদিন একটি পূর্ণবয়স্ক হাতি প্রায় ১৫০ কেজি খাবার খায় এবং ৮০ থেকে ১২০ লিটার পানি পান করে। বেশির ভাগ সময় এরা দল বেঁধে চলাচল করলেও কখনও কখনও পুরুষ হাতিকে দলছুট অবস্থায় দেখা যায়। হাতির প্রজনন কাল মার্চ থেকে জুন। গর্ভধারণকাল প্রায় ২২ মাস। সাধারণত এরা দুই থেকে চার বছর পর পর একটি বাচ্চার জন্ম দেয়। পৃথিবীতে বর্তমানে হাতির দুটি প্রজাতি বেঁচে আছেÑ এশীয় হাতি ও আফ্রিকা মহাদেশে বসবাসকারী আফ্রিকান হাতি।

একটি হাতির দাঁত প্রায় ১.৮ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয় এবং একজোড়া দাঁতের ওজন হয় প্রায় ৭০ কেজির মতো। এই দাঁতের চাহিদার জন্যই আমাদের দেশ তথা পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাচ্ছে হাতি। পৃথিবীজুড়ে হাতির দাাঁতের অবৈধ ব্যবসা নিষিদ্ধ হলেও চোরাশিকারীরা তা মানছে না। এরা অর্থের লোভে প্রতিনিয়ত হাতি শিকার করছে। হাতির দাঁতের বিভিন্ন শিল্পকর্ম খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকেই জনপ্রিয়। হাতির দাঁত দিয়ে সিংহাসনের পা, আসবাবপত্র এবং মন্দির সাজানোর কাজে ব্যবহৃত হতো। এখনও হাতির দাঁতের তৈরি বিভিন্ন ধরনের শৌখিন জিনিসপত্র এবং অলঙ্কার সর্বজন সমাদৃত। মানুষের বিলাসিতায় অকাতরে প্রাণ হারাচ্ছে প্রকৃতির এই অপূর্ব সৃষ্টি।

বাংলাদেশে এক সময় অনেক হাতি থাকলেও এখন এরা বিলুপ্তির পথে। হাতির জন্য প্রয়োজন বিশাল বিচরণ ক্ষেত্র আর দরকার পর্যাপ্ত খাবার, পানি ও বিশ্রামের জায়গা। ক্রমাগত মানুষের আবাসভূমির বিস্তার, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ফসলি জমির বিস্তার, বনজ সম্পদের অতি আহরণ, পাহাড় কাটা, অপরিকল্পিতভাবে বনের মধ্যে রাস্তা নির্মাণ এবং বনসংলগ্ন নদীতে বাঁধ নির্মাণ এদেশে হাতির অস্তিত্ব বিলুপ্তির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। হাতিকে বন্য পরিবেশ থেকে বিলুপ্তি রোধে সরকারী-বেসরকারী বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি জনসচেতনতা আজ বড় বেশি প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।