২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সাগরে বিদেশীদের লুণ্ঠন আর জলদস্যুর তাণ্ডব

  • মৎস্য আহরণ মৌসুমের শুরুতেই আতঙ্ক

মোয়াজ্জেমুল হক, চট্টগ্রাম অফিস ॥ একদিকে বিদেশীদের মৎস্য লুণ্ঠন, অপরদিকে দেশীয় জলদস্যুদের উপদ্রব। বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশী বিশাল জলসীমায় মৎস্য আহরণ মৌসুমের শুরুতেই বড় ধরনের ক্ষতি ও ভীতির মুখে পড়েছে সামুদ্রিক এ মূল্যবান সম্পদ। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমানা নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলায় জয়লাভের পর বাংলাদেশের জলসীমা বহুগুণে বেড়ে যাওয়ার পর এখনও তা অরক্ষিত অবস্থায় রয়ে গেছে পর্যাপ্ত পরিমাণ পাহারা ও তদারকির অভাবে। এ সুযোগে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, মিয়ানমার এবং শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ডের মৎস্য শিকারীরা ঝাঁকে ঝাঁকে হানা দিয়ে দ্রুততম সময়ে মাছ লুট করে নিচ্ছে। গত দশ মাসে প্রায় অর্ধশত বিদেশী ট্রলার ও ইঞ্জিনচালিত ফিশিং বোট আটক হয়েছে। সঙ্গে ধরা পড়েছে প্রায় সাড়ে ৭শ’ মাঝিমাল্লাও। এসব ঘটনা নিয়ে মামলায় অনেকে জামিন নিয়ে সমুদ্র পথেই নিজ নিজ দেশে ফিরে গেছে। আবার অনেকে জামিনের অপেক্ষায় রয়েছে।

এ ঘটনার পাশাপাশি সাগরে বাড়তি উপদ্রব শুরু করেছে সশস্ত্র জলদস্যুরা। কক্সবাজারের সেন্টমার্টিন থেকে খুলনা উপকূল অঞ্চল পর্যন্ত প্রায় ২শ’ নটিক্যাল মাইল বিস্তৃত চারটি মৎস্য গ্রাউন্ডে প্রতিনিয়ত জলদস্যুরা আহরিত মৎস্য লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবাদ জানালে নানা ধরনের নির্যাতন, অপহরণ এমনকি গোলাগুলির ঘটনাও ঘটাচ্ছে এসব দুর্ধর্ষ জলদস্যুরা। ফলে সেন্টমার্টিন, কক্সবাজার, মহেশখালী, সোনাদিয়া, কুতুবদিয়া, চট্টগ্রাম, সন্দ্বীপ ও খুলনা, পটুয়াখালী এলাকার মৎস্য শিকারীরা ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। ইতোমধ্যেই আহরিত মৎস্য নিয়ে বহু ফিশিং বোট ও ইঞ্জিনচালিত নৌকা জলদস্যুদের কবলে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়েছে। গভীর সমুদ্রে জলদস্যুরা একাধিক গ্রুপে বিভক্ত হয়ে সাগরজুড়ে দাবড়ে বেড়াচ্ছে।

এদিকে কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর পক্ষে সাগরে নিরাপত্তা ইতোমধ্যে জোরদার করা হয়েছে। তবে পর্যাপ্ত পরিমাণ টহল নৌযানের অভাবে জলদস্যুরা সে সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে। শুধু তাই নয়, মৎস্য লুটে নেয়ার পাশাপাশি মাঝিমাল্লাদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করে ছাড়ার ঘটনাও ঘটছে। বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশী জলসীমায় লাখ লাখ মৎস্যজীবী রয়েছেন, যারা এ খাত থেকে তাদের জীবিকা নির্বাহে নিয়োজিত। কিন্তু জলদস্যুরা বর্তমানে এমন ভীতিকর প্রভাব সৃষ্টি করেছে যা মৌসুমের শুরুতেই বিপর্যয় নেমে এসেছে।

অপরদিকে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ডের ট্রলারগুলো বাংলাদেশী জলসীমার কাছাকাছি অবস্থানে ঢুকে খুব দ্রুতগতিসম্পন্ন ট্রলার দিয়ে মূল্যবান মৎস্য সম্পদ লুণ্ঠন করে নিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে থাইল্যান্ডের সমুদ্রসীমানায় মৎস্য সম্পদের ভা-ার নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তারা বহু আগে থেকেই বাংলাদেশের অভ্যন্তর ভাগকে টার্গেট করে এ অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। অক্টোবর থেকে সাগরে মৎস্য শিকার শুরু হলেই এদের তৎপরতা বেড়ে যায়। অন্যান্য সময়েও এরা এ লুণ্ঠন তৎপরতায় লিপ্ত থাকে। তবে তা মৌসুমের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম থাকে।

কোস্টগার্ডের পূর্বাঞ্চল সূত্রে স্বীকার করা হয়েছে, ভারত-মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্র বিজয়ের ঘটনার পর যে পরিমাণ সাগর অঞ্চল বৃদ্ধি পেয়েছে, তা দেশের স্থল ভূখ-ের চেয়েও বেশি। এত বিশাল এলাকা নিয়মিতভাবে তদারকি ও পাহারা দেয়া নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের পক্ষে এখনও স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন হয়নি। ফলে নানা ফাঁকফোকরে এসব বিদেশী মৎস্য লুটেরারা দেশের জলসীমার অভ্যন্তরে হানা দিয়ে মূল্যবান বিভিন্ন প্রজাতির মাছ লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। এ ঘটনা অবহিত হয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে ইতোমধ্যে বাংলাদেশী জলসীমা অভ্যন্তরে তদারকি ও পাহারা জোরদার করা হয়েছে। কিন্তু এরপরও বিদেশীদের লুণ্ঠন তৎপরতা থামানো যাচ্ছে না। বিদেশীদের মধ্যে ভারতীয় ট্রলার এবং বিভিন্ন জাতের ছোট বড় ইঞ্জিনচালিত ফিশিং বোটের তৎপরতা সবচেয়ে বেশি।

বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশী জলসীমায় চারটি ফিশিং গ্রাউন্ড রয়েছে। এগুলো হচ্ছে সোয়াস অব নো গ্রাউন্ড, সাউথ এ্যান্ড সাউথ প্যাসেজ, সাউথ প্যাসেজ এবং মিডল গ্রাউন্ড। এ চারটি জোনজুড়ে আমাদের মৎস্য ভা-ার। ভারতের সঙ্গে সমুদ্র বিজয়ের পর যে নতুন সীমারেখা নির্ণীত হয়েছে ওই স্থানে রয়েছে দুর্লভ প্রজাতির মৎস্যসহ এবং এর তলদেশে মূল্যবান সমুদ্র সম্পদ। ভারতের জলসীমা সংলগ্ন এ বিশাল নতুন সমুদ্র অঞ্চল বাংলাদেশীদের পক্ষে পরিপূর্ণভাবে নিরাপত্তা বিধানের ব্যবস্থা গ্রহণ এখনও সম্ভব হয়নি। ফলে সে দেশের মৎস্য লুটেরারা আগের মতোই হানা দিয়ে বিভিন্ন ধরনের সম্পদ লুট করে নিয়ে যাচ্ছে।

এদিকে সেন্টমার্টিন থেকে খুলনা পর্যন্ত উপকূলীয় অঞ্চলে ছোট ছোট ফিশিং বোটযোগে যারা মৎস্য শিকারে নিয়োজিত এদের ওপর ভর করেছে জলদস্যুরা। সশস্ত্র এসব দস্যুরাও মৎস্য আহরণের মৌসুম এলে তৎপর হয় আর দেদার দাবড়ে বেড়ায় সাগরজুড়ে। অনেকে নগদ চাঁদাবাজি আবার অনেকে আহরিত মৎস্য লুটে নেয়। এমনিতর পরিস্থিতিতে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন একটি সমন্বয় সভা আহ্বানের মাধ্যমে সাগরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের লক্ষ্যে একটি ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস প্রদান করেছে। কিন্তু মৎস্য আহরণের মৌসুম শুরু হয়ে যাওয়ায় এ ব্যবস্থা অতি দ্রুত কার্যকর করা না গেলে দেশীয় মৎস্য শিকারীদের প্রতিনিয়ত ভীতি ও হুমকির মুখে থাকতে হচ্ছে। কক্সবাজার জেলা প্রশাসন সূত্রে জানানো হয়েছে, জেলার সেন্টমার্টিন থেকে কুতুবদিয়া পর্যন্ত উপকূল অঞ্চলের মৎস্য শিকারীদের কাছ থেকে তারা উপদ্রবের অভিযোগ পেয়ে বিষয়টির সত্যতা উপলব্ধি করে অতি দ্রুততম সময়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।