১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ক্ষুদ্র পরিসরে অনেক কথা, সূক্ষ্ম অনুভূতি...

ক্ষুদ্র পরিসরে অনেক কথা, সূক্ষ্ম অনুভূতি...
  • ভালবাসার বনসাই

মোরসালিন মিজান

দারুণ বলেছেন মুস্তাফা মনোয়ার। বরেণ্য এই শিল্পীর মতে, বনসাই কয়েক পঙ্ক্তির ছোট কবিতা। ছোট কবিতার মতো। উপন্যাসের মতো অনেক কথা বলে না। ক্ষুদ্র পরিসরেই অনেক কথা, অনেক ভাব, অনেক সূক্ষ্ম অনুভূতির জন্ম দেয়। বহু যুগের পুরনো আর ছোট্ট চির সত্যটির নাম বনসাই। যারা বনসাই সম্পর্কে ধারণা রাখেন, শিল্পীর কথার মানে চট করে ধরে ফেলবেন। বাকিরা একবার ধানম-ির ডব্লিউভিএ মিলনায়তন ঘুরে আসতে পারেন। হ্যাঁ, এখানে চলছে ক্ষর্বাকৃতি বৃক্ষের অদ্ভুত সুন্দর একটি প্রদর্শনী। বাংলাদেশ বনসাই সোসাইটির এ আয়োজন সত্যি মুগ্ধ হওয়ার মতো।

এখন বিভিন্ন সংগঠন ও সোসাইটির নামে একত্রিত হয়ে অনেকেই বনসাইয়ের কাজ করছেন। তবে, বাংলাদেশ বনসাই সোসাইটির আলাদা সুনাম আছে। আয়োজকদের এটি ১৭তম বার্ষিক বনসাই প্রদর্শনী। যতদিন যাচ্ছে শিল্পীর সংখ্যা বাড়ছে। কাজের মান উন্নত হচ্ছে। চলমান প্রদর্শনী তার প্রমাণ। বিশাল মিলনায়তনের পুরোটাজুড়ে বনসাই। দেড় দুই শ’ নয়, তিন শ’ নয়, পাঁচশ গাছ! প্রথম দেখায় সবুজটাই চোখে পড়ে শুধু। তাতেই চোখ জুড়িয়ে যায়। কাছে গেলে আলাদা গঠন, বিন্নাস ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে ধরা দেয় এক একটি বনসাই। কত কত জাত! খুব চেনা দেশীয় গাছ যেমন আছে, তেমনি আছে বিদেশী জাত।

বনসাইয়ের বেলায় আগেভাগে চলে আসে বটের কথাটি। প্রদর্শনীতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আছে বট। তাই বলে সব দেখতে এক নয়। কারণ, বটের জাত পাত অনেক। বিভিন্ন জাতের বট থেকে বনসাই করেছেন শিল্পীরা। অনন্য নামের এক তরুণী কাজও করেছেন অনন্য সাধারণ। তাঁর দেশী বটের বনসাই। বড় একটি ট্রের ওপর ততোধিক বড় আর বৃদ্ধ বটগাছ। বলিষ্ট শেকড় মাটি আঁকড়ে আছে। উপরে শামসুর রাহমানের ‘বয়সী বটের ঝিলিমিলি পাতা’! গাছ থেকে চোখ সরাতেই সামনে আসলেন শিল্পী। তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল অবাক করা তথ্য। তিনি জানান, এই বটের বয়স ৩৫ বছর। রাজশাহীর একটি পুরনো বাড়ি থেকে সংগ্রহ করা। গাছের শেকড় ধরে টানলে বাড়ি ধসে পড়ে কিনা, শঙ্কা ছিল! তবুও সেটি সংগ্রহ করেছেন অনন্য। দশ বছর ধরে পরিচর্চা করে আজকের অবয়বটি দিয়েছেন। রাজবট নামটি খুব শোনা হয়নি আগে। এই জাতটি থেকে বনসাই করেছেন বশির আহমেদ। পাতাগুলো আমা পাতার মতো কিছুটা। লালচে আর অল্প কোকড়ানো। কাঁঠাল পাতার মতোও হয় বটের পাতা। নাম তাই কাঁঠাল পাতা বট। এ বনসাইটি করেছেন মনোয়ারা হোসাইন।

শাহ্জাদী সুলতানা দেশী শ্যাওড়া গাছ থেকে বনসাই করেছেন! শিল্পীর নিরীক্ষা প্রিয় মনের চমৎকার প্রকাশÑ রুট অভার রক। এখানে গাছের সরু শেকড় সিমেন্টের একটি গড়ন বেয়ে যথেষ্ট উপরের দিকে ওঠে গেছে। একদিকে কাত হয়ে থাকা গাছের শৈল্পিক বিস্তার। একই শিল্পীর গড়া ফোকেন টি দেখে শুধু তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। তাঁর ব্রোকেন পট স্টাইল বনসাইয়ের সাধারণ সৌন্দর্যকে অতিক্রম করে যায়। বোরহান হোসেন কাকুলের কাজও পরিচ্ছন্ন। খুব নজর কাড়ে। তাঁর বক্সউড কিংবা খুব ছোট্ট গড়নের রাইটিয়া প্রদর্শনী উপভোগ্য করতে ভূমিকা রাখছে, বলতে হবে। তেঁতুল গাছ নিয়ে অনেকেই কাজ করেছেন। রিজওয়ান সামাদ গড়েছেন তেঁতুল বাগান। বেশ সুন্দর একটি ল্যান্ডস্কেপ। প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন তাঁর মাও। প্রেম না নামের একটি গাছ থেকে বনসাই করেছেন তিনি। বিদেশী এই গাছ নামে যেমন ব্যতিক্রম, শিল্পী গড়েছেনও যতœ করে। সুরাইয়া রহমান চায়না টবে বাঁচিয়ে রেখেছেন পডো কার্পাস। নজর কাড়ে ফরিদা সামাদের থাই কদবেল।

আর যে শিল্পীর কথা না বললে প্রদর্শনীর আলোচনা অসম্পূর্ণ থাকতে বাধ্যÑ তিনি আনিসুল হক। বনসাই চর্চার ক্ষেত্রে যত ধরনের জ্ঞান, বোধ ও শিল্প চেতনার দরকার হয়, তাঁর নিজের মাঝে যথেষ্টই আছে। শিল্পীর কাজ দেখেই এমনটি মনে হয়েছে। বরাবরই মনে হয়। সারা বছর করা প্রচুর কাজ থেকে কয়েকটি নিয়ে প্রদর্শনীতে যোগ দিয়েছেন তিনি। তাঁর কামিনী শিল্পীর আঁকা ছবির মতো সুন্দর। বড় মোটা ও শক্ত একটি কা- ঘিরে আছে শাখা প্রশাখা। প্রতিটি শাখা প্রশাখা, এমনি ছোট্ট সবুজ পাতা নিজের জোরালো উপস্থিতির কথা জানান দিচ্ছে। ফাইকাসের একটি জাত নিয়েও সুন্দর বনসাই করেছেন আনিস। ডাল ও পাতার রং, বিন্নাস সৌন্দর্যপ্রেমীদের যেন হাতছানী দিয়ে ডাকে।

প্রদর্শনীতে আরও আছে হিজল, তমাল, র্ঘুনি, বকুল, বৈচি, নিশিন্দাসহ চেনা অচেনা গাছের বনসাই। ডুমুর কিংবা নারিকেলের মতো দুর্লভ বনসাইও গড়েছেন কেউ কেউ। সব মিলিয়ে বেশ সমৃদ্ধ আয়োজন। চলবে রবিবার পর্যন্ত।