২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ডিসেম্বরেই সর্বস্তরে নতুন কমিটি বিএনপির

  • খালেদা ফিরলেই জেলা কমিটি ঘোষণা

শরীফুল ইসলাম ॥ এ বছর ডিসেম্বরের মধ্যেই জাতীয় নির্বাহী কমিটিসহ দলের সর্বস্তরে নতুন কমিটি দিতে চায় বিএনপি। এ জন্য তেমন কোন কর্মকা- চোখে না পড়লেও ভেতরে ভেতরে প্রস্তুতি জোরদার করছে দলটি। খালেদা জিয়া লন্ডন থেকে দেশে ফিরে প্রথমে সকল সাংগঠনিক জেলা কমিটি ঘোষণা করবেন। এরপর ডিসেম্বরেই তিনি দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটিও ঘোষণা করতে চান।

জানা যায়, এখন পর্যন্ত জাতীয় কাউন্সিল করে দলের নির্বাহী কমিটি গঠনের পরিকল্পনা থাকলেও পরিস্থিতি প্রতিকূল মনে করলে কাউন্সিল ছাড়াই কমিটি দেয়া হতে পারে। দুই ধরনের প্রস্তুতিই নিয়ে রাখা হয়েছে। তবে কি পদ্ধতিতে এবার কমিটি দেয়া হবে তা খালেদা জিয়া লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পর স্পষ্ট হবে বলে বিএনপির নেতাকর্মীরা মনে করছেন। তবে দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান যেভাবে ভাল মনে করবেন সেভাবেই কমিটি হবে।

এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব) মাহবুবুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, শীঘ্রই জাতীয় কাউন্সিল ও দলের নতুন নির্বাহী কমিটিসহ সর্বস্তরে কমিটি পুনর্গঠন করতে চাই আমরা। তবে সবকিছু নির্ভর করছে পরিবেশ পরিস্থিতির ওপর। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া লন্ডন থেকে দেশে ফিরে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেবেন। তিনি যেভাবে চাইবেন সেভাবেই নতুন কমিটি হবে। অবশ্য তৃণমূল পর্যায়ে নতুন কমিটি গঠনের কাজ এগিয়ে চলছে।

এদিকে ৯ আগস্ট থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বিএনপির ৭৫টি সাংগঠনিক জেলা ও জেলাসমূহের আওতাভুক্ত সকল ইউনিট কমিটি গঠন করতে কেন্দ্রের নির্দেশ থাকলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ১টি জেলার কমিটি গঠন করা সম্ভব হয়েছে এবং আরও দু’একটি সাংগঠনিক জেলা কমিটি পুনর্গঠনের কাজে অগ্রগতি রয়েছে বলে বিএনপি কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য মতে একমাত্র বান্দরবান জেলা কমিটি গঠন করা সম্ভব হয়েছে সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহ আলমকে সভাপতি ও দীপেন তালুকদারকে সাধারণ সম্পাদক করে। বাদবাকি ৭৪টি সাংগঠনিক জেলা ও এসব জেলার বিভিন্ন ইউনিট কমিটি গঠনের কাজে তেমন অগ্রগতি হয়নি। খালেদা জিয়া লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পর যেসব জেলা কমিটি গঠনের কাজ শেষ না হবে কেন্দ্র থেকে সেসব জেলা কমিটি চাপিয়ে দেয়া হবে বলে জানা গেছে। এ খবর পেয়ে জেলা পর্যায়ের নেতারা এখন ঢাকায় এসে লবিং-তদবির করছেন। তবে ৯ আগস্ট জেলা নেতাদের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছিল ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে নতুন কমিটি করতে না পারলে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ না করেই কেন্দ্র থেকে কমিটি ঘোষণা করা হবে।

বিএনপির নতুন জাতীয় নির্বাহী কমিটিতে স্থান পেতেও দলের অনেক নেতা নিজ নিজ অবস্থানে থেকে লবিং করছেন। কেউ কেউ লন্ডনে গিয়েও তদবির করে বেড়াচ্ছেন বলে জানা গেছে। তবে বর্তমানে দলে যারা নিষ্ক্রিয় এমন বেশ ক’জনকে বাদ দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে খবর পেয়ে তারাও এখন বিভিন্ন মাধ্যমে দলীয় হাইকমান্ডের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করছেন। আর দলে সক্রিয় তরুণ নেতারা দৌড়-ঝাঁপ বাড়িয়ে দিয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ পদ পেতে। এবার জাতীয় নির্বাহী কমিটিতে শতাধিক তরুণ নেতাকে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেয়ার কথা রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। এর মধ্যে অন্তত ১০০ জন হচ্ছেন সাবেক ছাত্রদল, যুবদল, মহিলা দল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা।

প্রসঙ্গত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুসারে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর ৩ বছরের মধ্যে জাতীয় কাউন্সিল ও দলের নতুন কমিটি গঠন করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও এ নির্দেশ মানছে না বিএনপি। সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিল করার পর প্রায় ৬ বছর অতিক্রান্ত হলেও পরবর্তী কাউন্সিলের প্রস্তুতি চূড়ান্ত করতে পারছে না দলটি। তবে বিএনপি নেতাদের মধ্যে কেউ কেউ বলছেন এ বছর ডিসেম্বরের মধ্যেই জাতীয় কাউন্সিল করার চেষ্টা করা হবে।

বিএনপির সর্বশেষ জাতীয় নির্বাহী কমিটি গঠন করা ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি। আর জাতীয় কাউন্সিল করা হয় ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে। ২০১২ সালের শেষ দিকে আবার জাতীয় কাউন্সিলের প্রস্তুতি নেয় বিএনপি। কাউন্সিল করার জন্য তখন ভেন্যুও ঠিক করা হয়েছিল। কিন্তু কাউন্সিলকে সামনে রেখে কেন্দ্র থেকে শুরু করে সারাদেশের সকল পর্যায়ে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-কোন্দল বেড়ে যাওয়ায় ওই যাত্রায় আর জাতীয় কাউন্সিল করতে পারেনি বিএনপি হাইকমান্ড। এরপর বেশ ক’দফা চেষ্টা চালিয়েও জাতীয় কাউন্সিল করতে পারেনি। এক পর্যায়ে দলটি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কাউন্সিলের পরিবর্তে সরকারবিরোধী আন্দোলন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তাই জাতীয় কাউন্সিল ও দলের নতুন নির্বাহী কমিটি গঠন প্রক্রিয়া থেমে যায়।

দশম জাতীয় নির্বাচনের পর দলকে ঢেলে সাজাতে আবারও জাতীয় কাউন্সিল কারার প্রস্তুতি নেয় বিএনপি। জাতীয় কাউন্সিলের প্রস্তুতির মাধ্যমে সরকারবিরোধী আন্দোলনের একটি আমেজ সৃষ্টি করে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করার কৌশল নেয়া হয়। এ জন্য সাংগঠনিক জেলাগুলো পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়। অন্য নেতাদের প্রতি আস্থা না থাকায় জেলা নেতাদের ঢাকায় ডেকে এনে বৈঠক করে কমিটি পুনর্গঠন শুরু করেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। এ পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট জেলার কেন্দ্রীয় নেতারা পুনর্গঠিত জেলা কমিটির নেতাদের অসহযোগিতা করতে থাকেন। তাই নতুন করে জেলা পর্যায়ে কোন্দল ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে ডজন খানেক জেলা কমিটি গঠনের পর এ প্রক্রিয়ায় কমিটি পুনর্গঠনের কাজ স্থগিত করেন খালেদা জিয়া। তাই সে যাত্রায় জাতীয় কাউন্সিল করার প্রস্তুতিও থেমে যায়। বর্তমানে সর্বস্তরে দলে যে ধরনের বিশৃঙ্খলা চলছে তাতে বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল এ বছর হওয়ার এখন পর্যন্ত কোন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। তবে খালেদা জিয়া দেশে ফেরার পর প্রস্তুতি জোরদার করলে ডিসেম্বরের মধ্যেই জাতীয় কাউন্সিল করা সম্ভব বলে দলের কোন কোন নেতা মনে করছেন।

২০১০ সালের ১ জানুয়ারি খালেদা জিয়াকে চেয়ারপার্সন, তারেক রহমানকে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে মহাসচিব করে বিএনপির ৩৮৬ সদস্যের জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়। ২০১১ সালের ১৬ মার্চ খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ওই বছর ৬ এপ্রিল দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিয়ে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেন খালেদা জিয়া। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাকে ভারমুক্ত করা হয়নি। তবে এবার নতুন জাতীয় নির্বাহী গঠন করা হলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে মহাসচিব করা হতে পারে। দলীয় হাইকমান্ড এ পদে এখন পর্যন্ত মির্জা ফখরুলের চেয়ে যোগ্য কাউকে খুঁজে পায়নি। মহাসচিব ছাড়াও অন্য যাদের গুরুত্বপূর্ণ পদ দেয়া হতে পারে তাদের বিষয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান খোঁজখবর নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। আর এবারের নতুন কমিটিতে পদ প্রত্যাশীরাও কবে নতুন কমিটি হবে সে জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।

বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু জনকণ্ঠকে বলেন, সর্বস্তরে বিএনপির নতুন কমিটি গঠনের কাজ এগিয়ে চলছে। এ বিষয়ে প্রস্তুতি আরও জোরদার করা হচ্ছে। তাই আশা করা যাচ্ছে ডিসেম্বরের মধ্যে সর্বস্তরে কমিটি পুনর্গঠনের কাজ শেষ করা যাবে।

এ ব্যাপারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) আসম হান্নান শাহ বলেন, সর্বস্তরে নতুন কমিটি গঠনের বিষয়টি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেখছেন। তিনিই বলতে পারবেন এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কতটুকু অগ্রগতি হয়েছে।

নির্বাচিত সংবাদ