২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ছেলেবেলা ও ছাত্রজীবন

  • আবুল মাল আবদুল মুহিত

কৈশোরের আরও স্মৃতি

(২৩ অক্টোবরের পর)

আমাদের স্কুল জীবন শেষ হওয়ার আগেই ব্রিটিশ শাসনের অবসান হয় এবং সেই সময় অর্থাৎ ১৯৪৭ সালে বেশ কিছু হিন্দু পরিবার আমাদের সিলেট থেকে ভারতের বিভিন্ন জায়গায় যথা- করিমগঞ্জ, শিলচর, শিলং, গুয়াহাটি বা কলকাতায় চলে যায়। ১৯৪৬ সালে কলকাতায় বেশ বড় আকারের হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা হয়। কিন্তু আমাদের সিলেটে সেরকম দাঙ্গা হয়নি। সামান্য একটি দাঙ্গার উপলক্ষ তৈরি হয় যখন মুসলমান ছেলেরা নোয়াসড়ক এলাকায় কংগ্রেস ছাত্র ফেডারেশনের দফতরের সামনে দিয়ে শোভাযাত্রা করছিল। সেখানে দু’দলের বয়স্ক নেতৃবৃন্দ দাঙ্গা বাধাবার সুযোগ সযতনে পরিহার করেন। তবে শহরে বেশ খানিকটা সাময়িক উত্তেজনা থাকে। যার জন্য সন্ধ্যার আগেই সব শোভাযাত্রা এবং সভা শেষ করে দেয়া হয়। ১৯৪৭ সালে কিছু হিন্দু পরিবার সিলেট ছেড়ে দেয় এবং একই সঙ্গে কিছু মুসলমান পরিবার শিলং, শিলচর এবং করিমগঞ্জ থেকে সিলেটে আসে। কিন্তু সেইটি খুবই যৎসামান্য ছিল। যার ফলে আমাদের স্কুলে যেমন প্রায় ৫০০ ছাত্রের মধ্যে হয়ত ৫০ জন চলে যায় এবং প্রায় ৫০-এর অনেক কম নতুন ছাত্র আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়। মোটামুটিভাবে সেসব পরিবারই দেশত্যাগ করে যাদের অন্যত্র যাবার সুযোগ বা সংযোগ ছিল। যেমন- পূর্ব-বাংলায় যাদের চা বাগান ছিল তাদের অনেকেরই চা বাগান ভারতে ছিল এবং ভারতে যাদের চা বাগান ছিল তাদের অনেকেরই চা বাগান পূর্ব-বাংলায়ও ছিল। এসব পরিবারের লোকজন দেশত্যাগ করে। আমাদের ঘনিষ্ঠ সুনীল কাকার পরিবারের চা বাগান পূর্ব-বাংলায়ও ছিল, আবার আসাম এবং পশ্চিম বাংলায়ও ছিল। তারা দেশ বিভাগের পর বেশ কিছুদিন সিলেটে থাকেন এবং পরে কলকাতায় স্থানান্তরিত হন। তাই দেশ বিভাগের পর বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে বিচ্ছেদের যন্ত্রণা আমরা সবিশেষ অনুভব করিনি।

এই বিচ্ছেদের যন্ত্রণা অবশেষে আমাদের পেতে হয় ১৯৫০ সালে। ১৯৫০ সালে কলকাতায় এবং ঢাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা অনুষ্ঠিত হয়। এই দাঙ্গার উস্কানি দেন ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেল এবং পূর্ব বাংলায় মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিন। তাদের বক্তব্য, সভা-সমিতি এবং নানা ধরনের উদ্যোগে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার উপযুক্ত একটা অবস্থা সৃষ্টিতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। বল্লভ ভাই প্যাটেল তো দাবি করে বসেন যে, পূর্ব-বাংলার কিছু এলাকা দখল করে সেখানে হিন্দুদের বসবাসের ব্যবস্থা করতে হবে। ১৯৫০ সালের দাঙ্গা ঢাকা থেকে অন্যান্য মফস্বল শহরেও বিস্তৃত হয়। এমনকি বর্ধিষ্ণু গ্রামেও চলে যায়। সিলেটে আমরা কিন্তু এই দাঙ্গা বাধতে দেইনি। আমার যতদূর মনে পড়ে সিলেটে এ সময় মাত্র একজন হিন্দু নিহত হয় এবং মুসলমান শান্তিবাহিনীর উদ্যোগে কোন ধরনের দাঙ্গা হতে দেয়া হয়নি। মুসলমান ছাত্ররা শান্তিবাহিনী গঠন করে বিশেষ করে রাতে বিভিন্ন এলাকায় প্রহরা দিতে থাকে এবং বয়ঃজ্যেষ্ঠরা ঘুরে ঘুরে এসব শান্তিবাহিনীর তৎপরতা তদারক করেন। আমরা দু’ভাই প্রতিরাতেই কোন না কোন এলাকায় টহল দিতাম। আমাদের আব্বা মাঝে মাঝে এসে আমাদের তদারকি করে যেতেন। এই ধরনের অভিজ্ঞতা শুধু আমাদেরই ছিল না, অন্য অনেক পরিবারে সেরকম অভিজ্ঞতা ছিল। যদিও সিলেটে আমরা মোটামুটিভাবে শান্তিরক্ষায় সমর্থ হই; কিন্তু হিন্দু পরিবারের দেশত্যাগ আমরা কোনমতে বন্ধ করতে সক্ষম হলাম না। ১৯৫০-এ আমাদের বন্ধু বিচ্ছেদের দুঃখ ছিল সুগভীর এবং সুবিস্তৃত। সেই তুলনায় কিন্তু ভারত থেকে আগত মুসলমান পরিবার অপেক্ষাকৃত কম ছিল।

সিলেটের সরকারী উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয়ে ১৯৪১ সালে আমার যোগদানের কথা অনেক আগেই বলেছি। আমাদের ক্লাসে ছাত্রসংখ্যা দুটি বিভাগ মিলে প্রায় ৭০/৮০ জন ছিল। এদের মধ্যে প্রায় ৫০ জন ১৯৪৯ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষা দেই। কিছু ছাত্র মাঝখানে অন্য স্কুলে চলে যায়। সরকারী চাকুরেদের ছেলেমেয়েরা অবশ্য খুব বেশি হলে তিন বছর আমাদের সহপাঠী থাকত। তবে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণীতে অনেক নতুন ছাত্র আমাদের সহপাঠী হয়। তারা মফস্বলের মধ্য ইংরেজী বিদ্যালয় থেকে বা অন্য ইংরেজী বিদ্যালয় থেকে বৃত্তি পেয়ে সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হতো। আমাদের স্কুল থেকে মোট ৮৮ জন ছাত্র ১৯৪৯ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষা দেয় এবং তার মধ্যে পাস করে ৬৪ জন অর্থাৎ ৭২%। কিন্তু সেবার সারাদেশে পাসের হার ছিল মাত্র ৩৫%। আমাদের সময় সারা প্রদেশে একটিই শিক্ষা বোর্ড ছিল। সারাদেশে সম্ভবত পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৫০ হাজারের মতো। আমরা যখন নবম শ্রেণীতে পড়ি তখন উপমহাদেশ স্বাধীন হয়। আগেই বলেছি যে, ভারত বিভাগের সময় তত বেশি ছাত্রকে আমরা হারাইনি। মোটামুটিভাবে হিন্দু সরকারী কর্মকর্তাদের ছেলেরা অন্য দেশে চলে যায় এবং কিছু মুসলমান ছাত্র এসে আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়। আমরা যে ৮৮ জন ছাত্র প্রবেশিকা পরীক্ষা দেই তাদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক ছিল হিন্দু। সে সময় সিলেট মহকুমার (বর্তমান জেলা) সব পরীক্ষাই সিলেট শহরের বিভিন্ন স্কুলে অনুষ্ঠিত হতো। আমাদের কেন্দ্রে মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৭৫৯ জন। একটি নিয়ম ছিল যে, শহরের ছাত্রদের কাউকেই তাদের নিজেদের স্কুলে পরীক্ষা দেয়ার জন্য আসন নির্ধারিত হতো না। আমরা দু’ভাই তাই রাজা স্কুল কেন্দ্র থেকে পরীক্ষা দেই। তখন প্রতিদিন দুটি পরীক্ষা হতো এবং পরীক্ষার মাঝখানে বিরতি তেমন ছিল না। তাই সাত/আট দিনের মধ্যেই আমাদের সব পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল। সম্ভবত এপ্রিল মাসে আমাদের পরীক্ষা হয় এবং জুলাই মাসে ফলাফল প্রকাশিত হয়। জুলাই-আগস্ট মাসেই আমরা কলেজের ছাত্র হয়ে গেলাম। সে বছর আমাদের কেন্দ্র থেকে অর্থাৎ সিলেট মহকুমা থেকে কেউই প্রথম দশজনের মধ্যে স্থান পেল না। আমাদের বিদ্যালয় থেকে ৭ জন প্রথম বিভাগে পাস করল, ৪১ জন দ্বিতীয় বিভাগে, ১৬ জন তৃতীয় বিভাগে। এসব তথ্য আমি ১৯৯৯ সালে ঢাকাস্থ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড থেকে সংগ্রহ করি। সেখানে আরও তথ্য পাই যে, আমিই আমার কেন্দ্রে সর্বোচ্চ নম্বর পাই এবং আমার কলেজে আমিই একমাত্র প্রথম গ্রেডে বৃত্তি পাই। পরবর্তীকালে খবর নিয়ে জানতে পারি যে, প্রথম গ্রেডে সারা প্রদেশে মোট বিশ/পঁচিশটি বৃত্তি ছিল।

আমাদের ক্লাসে শুধু নয়, সারা স্কুলেই ছিল একটি অত্যাশ্চর্য বিষয়। তখন সচরাচর সারা বাংলায় ও আসামে মুসলমান শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল হিন্দুদের তুলনায় খুব কম। কিন্তু আমাদের স্কুলে তেমনটি ছিল না। আমরা মুসলমানরা মোট ছাত্রদের প্রায় ৪০ শতাংশ ছিলাম। আমরা যখন অষ্টম/নবম শ্রেণীতে তখন স্কুলে একদিন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়। অবশ্য সামান্য মারামারির পরেই শিক্ষক ও কতিপয় শান্তিকামী ছাত্রদের উদ্যোগে তা বন্ধ হয়। মারামারি সবই হয় হাতে হাতে। সেদিন আবার নৌকাবাইচ ছিল। নৌকাবাইচে বেশি সদস্য ছিল মুসলমান। তারা যখন বাইচ শেষে স্থলে আসল তখন দাঙ্গা চলছে। তারা বৈঠা নিয়ে এই দাঙ্গায় যোগ দিলে সবাই মিলে দাঙ্গা বন্ধ করেন। একজন হিন্দু শিক্ষককে এই ঘটনার উদ্যোক্তা বিবেচনা করে তাকে এই নাইয়েরা আক্রমণ করতে যায়। সেই উদ্যোগটি অত্যন্ত জনপ্রিয় অথচ কড়া শিক্ষক ইয়াকুব আলী নিয়ন্ত্রণে আনেন। তিনি ধমক দিয়ে সব মুসলমান পান্ডাকে বিদায় দেন। কিন্তু ঘটনা সেখানেই শেষ হলো না। ওরা স্কুল ছুটির পর বেছে বেছে কিছু শিক্ষক ও ছাত্রদের শাস্তি দিতে ঠিক করে। ইয়াকুব আলী সাহেব তাদের নেতাদের ডেকে ধমক দিলেন; কিন্তু তার মনে হলো যে, তাতেও চলবে না। তিনি মুসলিম লীগ নেতা আমার আব্বার কাছে আসলেন। তিনি তাকে বললেন, মুসলিম লীগের নেতাদের সাহায্য না নিলে বিষয়টির সমাধান হবে না। যারা মারামারিতে অগ্রগামী ছিল তাদের সিংহভাগই ছিল দক্ষিণ সুরমার অধিবাসী। দক্ষিণ সুরমায় আবার মুসলিম লীগ ছিল খুবই শক্তিশালী। আব্বা দক্ষিণ সুরমার নেতাদের সহায়তায় দাঙ্গাবাজ ছাত্রদের পড়ন্ত বেলায় আমাদের বাড়িতে হাজির করলেন। এই ছাত্রদলে আমার পরিচিত বন্ধু ও নেতৃস্থানীয় দু’একজনও ছিলেন। আমার দু’বছরের জ্যেষ্ঠ বাহাউদ্দিন ও সহপাঠী মালিকের কাছে আমিও শান্তিরক্ষার জন্য তদ্বির করলাম। ইয়াকুব আলী সাহেবও আসলেন। তারপর সম্মিলিত সিদ্ধান্ত হলো যে, মারামারি চলবে না, তবে ছাত্রদের দাবি হলো তারা একজন নির্দিষ্ট শিক্ষককে কোন না কোন শিক্ষা দেবেই। তাদের বোঝাতে সন্ধ্যা হয়ে গেল এবং ঠিক হলো যে, ইয়াকুব আলী সাহেব এই শিক্ষককে সাবধান করে দেবেন। ছাত্রদের দাবি ছিল বড় কঠিন- ঐ শিক্ষককে মাফ চাইতে হবে। সেকালে এটি ছিল অচিন্তনীয়, তাই ইয়াকুব আলী সাহেবের ঐ শিক্ষককে সাবধান করার দায়িত্ব পড়ল। ঐ শিক্ষক ছিলেন খুব কড়া; কিন্তু খুব ভাল শিক্ষক এবং তার ছেলে ছিল আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বিষয়টির নিষ্পত্তি হতে আরও প্রায় ছয় মাস গেল। ঐ শিক্ষক কলকাতায় একটি কলেজে চাকরি নিয়ে ১৯৪৬ সালেই চলে গেলেন।

আগেই বলেছি, ১৯৪৪ সাল থেকেই দেশের ভবিষ্যত কি হতে যাচ্ছে সে নিয়ে ব্যাপক আলোড়ন পড়ে যায়। এই আলোড়নটি আমার জীবনেও বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে। আমরা তখন রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশ নিতে শুরু করেছি। স্কুলে অবশ্য রাজনীতি নিষিদ্ধ। সুতরাং সেসব কর্মকা- পাড়ায় পাড়ায় অথবা বিভিন্ন ক্লাবে অনুষ্ঠিত হতো। আমরা নানা ধরনের শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করতাম। পোস্টার হাতে নিয়ে শোভাযাত্রায় সভা-সমিতিতে যোগ দিতাম, অর্থাৎ সেøাগান এবং হাততালি দিতাম। আগেই বলেছি যে, আমার আব্বা ও আম্মা দু’জনই রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করতেন। তার প্রভাব এবং সুযোগ আমিও পাই। ১৯৪৫ সালে আমাদের স্কুলে সহকারী প্রধান শিক্ষক সৈয়দ হাফিজুর রহমানের উদ্যোগে আমরা একটি ‘মুসলিম ছাত্র কল্যাণ সমিতি’ গঠন করি। সেই সমিতির আহ্বায়ক হিসেবে আমাকে নিযুক্ত করা হয়। নিয়মমতো এটা ছিল নির্বাচিত পদ। কিন্তু মোটামুটিভাবে পরামর্শক শিক্ষক- সহকারী প্রধান শিক্ষকই স্থির করে দেন কে আহ্বায়ক হবে। স্কুলের বাইরে সংগঠনের সুবিধার জন্য আমি ‘মুকুলমেলা’ গঠন করি। আজাদ পত্রিকা ‘মুকুলমেলা’ গঠনের সুযোগ করে দেয়। তারা ১৯৪১ সালে ‘মুকুলমেলা’র জন্য কাগজের একটি পাতা নির্দিষ্ট করে দেয়। পত্রিকাটি ‘মুকুলমেলা’র সদস্য হওয়ারও ব্যবস্থা করে এবং আমাদের ভাইবোনকে আমার মামা (যিনি আমাদের সঙ্গে থাকতেন) সৈয়দ শাহাদাত হোসেন ৪২ বা ৪৩ সালে ‘মুকুলমেলা’র সদস্য করে দেন। মনে আছে, ‘মুকুলমেলা’র সদস্যসংখ্যা ছিল ১১৫৫। ১৯৪৬ সালের শেষ দিকে ‘মুকুলমেলা’র প্রথম দলটি আমি করলাম রায়নগরে, আমার দাদাবাড়ি এলাকায় এবং সেখানে আমাদের মিলনস্থল হলো বখতিয়ার বিবি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেখানে আমরা নিয়মিতভাবে সম্ভবত ১৫ দিনে কি এক মাসে সভা করতাম। সেখানে গান-বাজনা, আবৃত্তি, প্রবন্ধ পাঠ ইত্যাদি হতো। চলবে...