১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ছেলেবেলা ও ছাত্রজীবন

  • আবুল মাল আবদুল মুহিত

কৈশোরের আরও স্মৃতি

(২৮ অক্টোবরের পর)

আসামে আইন অমান্য আন্দোলন চলাকালেই লর্ড মাউন্ট ব্যাটেনের ৩ জুনের ঐতিহাসিক ঘোষণা সারাদেশে রেডিওযোগে প্রচারিত হয়। জানা গেল, আগামী দুই মাসের মধ্যেই ব্রিটিশ শাসনের অবসান হবে এবং ভারতবর্ষে দুটি নতুন রাষ্ট্র ‘ভারত’ ও ‘পাকিস্তান’ প্রতিষ্ঠা পাবে। ভারতের অসংখ্য দেশীয় রাজ্যকে এই ঘোষণায় পাকিস্তান অথবা ভারতের যে কোন রাষ্ট্রে যোগ দেবার সুযোগ দেয়া হয়। এই ঘোষণার পর ১২ জুন আইন অমান্য আন্দোলন মুসলিম লীগ প্রত্যাহার করে এবং সিলেটে গণভোটের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে। মুসলিম লীগের বড় নেতারা যেমন- প্রাদেশিক সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী অথবা সাধারণ সম্পাদক মাহমুদ আলী তখনও জেলে ছিলেন। তাদের মুক্তি পেতে বেশ কিছুদিন সময় লাগে। মাহমুদ আলী ২১ জুন এবং মওলানা ভাসানী ২২ জুন মুক্তিপ্রাপ্ত হন। বড় বড় নেতাদের অনুপস্থিতিতেই মূলত হাজী মোহাম্মদ উসমান নামে মুসলিম ব্যবসায়ী সমাজের নেতা এবং সিলেটের মুসলিম লীগের যেসব নেতা জেলে তখনও যাননি তাদের নিয়ে ৮ জুনেই সিদ্ধান্ত হয় অচিরেই অনুষ্ঠিতব্য গণভোটের জন্য একটি গণভোট বোর্ড গঠন করা হোক। এই বোর্ডের সভাপতি নির্বাচিত হন আসাম প্রদেশের মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা এবং এক সময় মুসলিম লীগ মন্ত্রী, কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ কার্যকরী পরিষদের সদস্য এবং মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঘনিষ্ঠ বন্ধু আবদুল মতিন চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন সিলেট জেলা মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা এবং শেয়ানা আইনজীবী আমার আব্বা আবু আহমদ আবদুল হাফিজ।

ঐতিহাসিকভাবে ১৯৪৭ সালের বড় বিষয়টি হলো ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের অবসান এবং সেখানে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি স্বাধীন দেশের আবির্ভাব। স্বাধীনতা প্রস্তুতির যে উদ্যোগ জুন মাসে শুরু হয় বলা যেতে পারে তারই চাপে আমার কৈশোরের অবসান হয়। আমার বয়স তখন তেরো বছর পূর্ণ হয়েছে। এর কিছুদিন পর আমাদের দেশে চাঁদতারা খচিত সাদা-সবুজের নতুন পতাকা এলো ইউনিয়ন জ্যাকের পরিবর্তে। স্বাধীনতা দিবসটি পালন উপলক্ষে আমরা দুদিন আগে থেকেই ঘটা করে প্রস্তুতি শুরু করি। নিজেদের বাড়ির সামনে একটি সুদৃশ্য তোরণ নির্মাণ করি, আমার ভাই মুহসি রঙিন কাগজ ব্যবহার করে অনেক ফানুস চেইন ইত্যাদি বানায়। মানুষ শহরেও নানা স্থানে তোরণ নির্মাণ করে। সবুজ পাতার তোরণে আবার ধবল নাগেশ্বর ফুল লাগানো হয়। তবে ১৪ আগস্টে তেমন বড় উৎসব পালিত হলো না বলে আমাদের মতো উৎসাহী মহলে বেশ হতাশা জাগে। সরকারী আয়োজনে সকালে কুচকাওয়াজ হলো, দুপুরে গরিব খাওয়ানো হলো। আমাদের বাড়িতে উৎসবটি হলো একান্তই আমাদের পারিবারিক ও ঘরোয়া।

সম্ভবত ১৯৪৪ সালে আমাদের পাড়ায় একটি স্থানীয় যুব কিশোর সংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিবেশী রাসবিহারী ভট্টাচার্যের পুত্র শঙ্কর ও তার বড় ভাই রাখাল দা, আরেক প্রতিবেশী রসময় কবিরাজের দু’ছেলে রামতনু, বেণু ও আরেক প্রতিবেশী যতীন্দ্র মোহন চৌধুরীর পুত্র ভানু এবং তনু এই ক্লাব গড়ে তুলল। নাম দেয়া হলো মিলন সংঘ। আমরাও তাতে যোগ দিলাম। সংঘের সদস্য ছিল আমাদের পেছনে সুপানিঘাট এবং অন্যদিকে নাইওরপুল পর্যন্ত এলাকার সমবয়সী তরুণরা। চলবে...