২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ফুটেজ দেখে দীপনের খুনী শনাক্তে সন্দেহের তালিকা হচ্ছে

  • পর্যালোচনা চলছে ৮ সিসি ক্যামেরার ৫ দিনের ফুটেজ

গাফফার খান চৌধুরী ॥ দীপন হত্যাকারীদের শনাক্ত করতে সংগৃহীত সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে অনেককেই সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছে। তাদের পৃথক তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। তালিকাভুক্তদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। পাশাপাশি আজিজ সুপার মার্কেটের প্রতিটি ব্যবসায়ী ও বসবাসকারীদের সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। জাগৃতি প্রকাশনীর প্রকাশক ফয়সাল আরেফীন দীপন হত্যা এবং মোহাম্মদপুরে শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর প্রকাশক আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুল ও দুই লেখক এবং ব্লগার হত্যাচেষ্টার ঘটনায় দায়েরকৃত পৃথক ২টি মামলার তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। ব্লগার রাজীব থেকে শুরু করে দীপন হত্যা একসূত্রে গাঁথা। এ জন্য ইতোপূর্বে ব্লগার হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে থাকা আসামিদের নতুন করে এ দুইটি ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে। মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ঘটনার দুইটির সঙ্গে জড়িত কেউ শনাক্ত বা গ্রেফতার হয়নি।

তদন্তকারী সূত্রে আরও জানা গেছে, দীপন হত্যায় জড়িতদের শনাক্ত করতে সংগৃহীত ৮টি সিসি ক্যামেরার ৫ দিনের ভিডিও ফুটেজের পর্যালোচনা চলছে। ইতোমধ্যেই একদিনের ফুটেজ পর্যালোচনা শেষ হয়েছে। দুপুর একটা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত ধারণকৃত ফুটেজকে খুনী শনাক্ত করার ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। ফুটেজে অনেককেই একাধিকবার সন্দেহভাজন যাতায়াত করতে দেখা গেছে। মূলত তাদের সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছে। একাধিকবার সন্দেহভাজন যাতায়াতকারীদের ফুটেজগুলো আলাদা করা হচ্ছে। এভাবে পাঁচ দিনের ফুটেজ পর্যালোচনা করা হবে। ৪ দিনের ফুটেজে সন্দেহভাজনদের সঙ্গে ঘটনার দিন ধারণকৃত ফুটেজ মিলিয়ে দেখা হবে। ৫ দিনের ফুটেজ পর্যালোচনা শেষে সম্ভাব্য সন্দেহভাজন খুনীদের শনাক্ত করা হবে। সে অনুযায়ী তালিকা তৈরি হচ্ছে। তাদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে ইতোমধ্যেই গ্রেফতার অভিযান চলছে। আর মোহাম্মদপুরের লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বর প্রকাশনীতে হামলাকারীদের শনাক্ত করতেও উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার করা হচ্ছে। কারণ হামলাকারীদের সম্পর্কে তথ্য পেতে কোন সিসি ক্যামেরার ফুটেজ পাওয়া যায়নি।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী এসব হত্যাকা- হচ্ছে। বিশেষ একটি গোষ্ঠী এর সঙ্গে জড়িত। বিশেষ সেই গোষ্ঠী স্বাধীনতাবিরোধী ও তাদের সহযোগী। মূলত বিশেষ একটি ইসলামী দলের ছত্রছায়ায় চলছে এমন পরিকল্পিত গুপ্তহত্যা। মাঠ পর্যায়ে হত্যাকা- সংঘটিত করার সঙ্গে নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমসহ অন্যান্য জঙ্গী সংগঠনের সদস্য ও বিশেষ ওই ইসলামী দল এবং তাদের অঙ্গ সংগঠনের প্রশিক্ষিত সদস্যরাও জড়িত। ঢাকায় বেশ কয়েকটি দল উপদলে ভাগ হয়ে হত্যাকা-গুলো ঘটানো হচ্ছে। হত্যাকা-ের ধরন, ব্যবহৃত অস্ত্র এবং ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত আলামত পর্যালোচনায়, হত্যাকারীরা যে একই জায়গা থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া হত্যাকা-ের জড়িতদের শনাক্ত করতে ইতোপূর্বে ব্লগার হত্যার দায়ে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে থাকাদের প্রয়োজনে নতুন করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া বিভাগের উপকমিশনার মুনতাসিরুল ইসলাম বলছেন, দীপন হত্যা ও মোহাম্মদপুরে শুদ্ধস্বর প্রকাশনীতে হামলা করে প্রকাশকসহ ৩ জনকে হত্যাচেষ্টা একসূত্রে গাঁথা। এ দুইটি হামলার সঙ্গে ইতোপূর্বে ব্লগার রাজীবসহ অন্যান্য ব্লগার হত্যার ধরনের মিল রয়েছে। হত্যাকা-ের ধরন ও ব্যবহৃত অস্ত্র একই ধরনের। ধারণা করা হচ্ছে, হত্যাকারীরা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর সদস্য হতে পারে। নানা দিক মাথায় রেখেই তদন্ত এগিয়ে যাচ্ছে।

প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ৩১ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে রাজধানীর শাহবাগ আজিজ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় ১৩১ নম্বর জাগৃতি প্রকাশনীর প্রকাশক ফয়সাল আরেফীন দীপনের (৪০) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘাড় ও গলা কেটে হত্যা করা হয় তাকে। হত্যার পর খুনীরা শাটারে তালা লাগিয়ে যায়। রক্ত পড়ে শাটারের নিচ দিয়ে সামনের ফ্লোর ভিজে গেলে ম্যানেজার ও স্থানীয়দের চোখে পড়ে। এরপরই উদ্ধার করা হয় দীপনের লাশ। উদ্ধারকালে দীপনের মাথাটি কম্পিউটারের কিবোর্ডের ওপর উপুড় করা অবস্থায় পড়ে ছিল।

জাগৃতি প্রকাশনী থেকে চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে হত্যাকা-ের শিকার হওয়া মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা ও বিজ্ঞান মনস্ক লেখক বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক প্রকৌশলী ড. অভিজিত রায়ের লেখা ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ ও ‘অবিশ্বাসের দর্শন’ নামের ২টি বই প্রকাশিত হয়।

আর একই দিন দুপুর আড়াইটার দিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানাধীন লালমাটিয়া সি ব্লকের ৮/১৩ নম্বর ৫তলা বাড়ির চতুর্থ তলায় শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর কার্যালয়ে হামলায় আহত হন প্রকাশক আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুল (৫০), লেখক এবং ব্লগার প্রকৌশলী তারেক রহিম (৪২) ও রণ দীপম বসু (৪০)। এ প্রকাশনী সংস্থাটি থেকে নিহত অভিজিত রায়ের লেখা ‘সমকামিতা : একটি বৈজ্ঞানিক এবং সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান’ ও ‘শূন্য থেকে মহাবিশ্ব’ নামে দুটি বই প্রকাশিত হয়। বই প্রকাশ করার পর থেকেই হতাহতরা নানাভাবে হুমকি পাচ্ছিলেন।

তদন্তকারীরা বলছেন, ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধাপরাধ মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদ-ে দ-িত করেন। কাদের মোল্লাসহ সকল যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের সৃষ্টি হয়। সেই মঞ্চে যোগ দেন মুক্তমনা, প্রগতিশীল লেখক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক থেকে শুরু করে স্বাধীনতার পক্ষের সকল শ্রেণী পেশার মানুষ। যুদ্ধাপরাধীদের বিপক্ষে এত মানুষের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ঘটনা ইতিহাসে বিরল। সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যাপক অভিযান চালাতে থাকে।

এমন অভিযানের মধ্যেই ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সংগঠক প্রকৌশলী ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার শোভন, ওই বছরের ৯ মে বুয়েটের ছাত্রলীগ নেতা ও ব্লগার আরিফ রায়হান দ্বীপ, চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা, বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক প্রকৌশলী লেখক ড. অভিজিত রায়, ৩০ মার্চ রাজধানীর রমনা মডেল থানাধীন হাতিরঝিল বেগুনবাড়ীতে দিনের বেলায় ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবু, ১২ মে সিলেটের সুবিদবাজারে ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশ, ৭ আগস্ট দুপুর দেড়টার দিকে রাজাধানীর খিলগাঁও থানাধীন পূর্ব গোড়ানে নিজ বাসায় ব্লগার নীলাদ্রী চ্যাটার্জী নিলয়, ৫ অক্টোবর ঢাকার বাড্ডায় বাংলাদেশ বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা খিজির খানকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়। রাজীব, বাবু ও দ্বীপ হত্যায় গ্রেফতারকৃতরা এক সময় ছাত্রশিবির, পরে নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন হিযবুত তাহ্রীর ও আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ব্লগার ও লেখক ছাড়াও সম্প্রতি দুই বিদেশী হত্যার পেছনেও বিশেষ ওই গোষ্ঠীর ইন্ধন থাকার বিষয়টি স্পষ্ট বলেও তদন্তকারীদের দাবি।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০১৩ সালের ২১ ডিসেম্বর রাজধানীর ওয়ারী থানাধীন রামকৃষ্ণ (আর কে) মিশন রোডের বাড়িতে জবাই করে ইমাম মাহদীর প্রধান সেনাপতি ও বিশ্বত্রাণ কর্তা দাবিদার লুৎফোর রহমান ফারুক (৫৫) ও তার ছেলে সানোয়ারুল ইসলাম মনিরসহ (৩০) ৬ জনকে ছুরিকাঘাতে ও গলা কেটে এবং ২০১৪ সালের ২৭ আগস্ট রাজধানীর তেজগাঁও থানাধীন পূর্ব রাজাবাজারের নিজ বাড়িতে বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেল আয়ের শান্তির পথে ও কাফেলা নামক ইসলামী অনুষ্ঠানের উপস্থাপক মাওলানা নুুরুল ইসলাম ফারুকীকে জবাই করে হত্যার পেছনেও ওই বিশেষ গোষ্ঠী জড়িত বলে মনে হচ্ছে। কারণ হত্যার ধরন ও ব্যবহৃত অস্ত্র একই। ধর্মীয় মতপাথর্ক্যরে কারণেই আনসারুল্লাহ বাংলা টিম বা জেএমবি (জামা‘তুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ) হত্যাকা- দুটি ঘটিয়ে থাকতে পারে।