১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

স্ত্রীর শ্লীলতাহানি ও ভিডিও করার দায়ে স্বামীসহ পাঁচজনের ৭ বছর জেল

স্ত্রীর শ্লীলতাহানি ও ভিডিও করার দায়ে স্বামীসহ পাঁচজনের ৭ বছর জেল

নিজস্ব সংবাদদাতা, শেরপুর, ৩ নবেম্বর ॥ লম্পট স্বামীর নীরবতা ও ইজারাদারের সহায়তায় শেরপুরে মধুটিলা ইকোপার্কে মাদ্রাসা ছাত্রী নববধূর ওপর যৌন নিপীড়নের চাঞ্চল্যকর মামলায় ওই নববধূর স্বামী নজরুল ইসলাম বুলবুল ও ইজারাদার মোস্তফা কামালসহ অন্য ৩ বখাটেকে ৭ বছরের সশ্রম কারাদ- প্রদান করা হয়েছে। একইসঙ্গে প্রত্যেককে ৩০ হাজার টাকা করে অর্থদ-, অনাদায়ে আরও ১ বছর করে কারাদ-ের আদেশ দেয়া হয়েছে। ৩ নম্বের মঙ্গলবার বিকেলে জনাকীর্ণ আদালতে শেরপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোঃ সায়েদুর রহমান খান ওই রায় ঘোষণা করেন। দ-প্রাপ্তরা হচ্ছে পশ্চিম সমশ্চুড়া গ্রামের আব্দুর রহিমের বখাটে ছেলে শফিকুল ইসলাম (২৭) জসিম উদ্দিনের ছেলে আব্দুস ছালাম (২৫), মতিউর রহমানের ছেলে মনু মিয়া (২৬), ইকোকোপার্কের প্রধান ফটকের ইজারাদার প্রতিনিধি মৃত হাসমত আলীর ছেলে মোস্তফা কামাল (৩০) ও নববধূর স্বামী নকলা উপজেলার নজরুল ইসলাম বুলবুল (২৭)। ওইসময় আদালত কক্ষে উপস্থিত নির্যাতিতা নারী, সরকারী কৌঁসুলি ও আসামি পক্ষের আইনজীবীরা উপস্থিত ছিলেন। রায় শোনার পরপরই আদালতকক্ষে আবেগে কেঁদে উঠেন চরম নির্যাতনের শিকার গৃহবধূ। তিনি বলতে থাকেন, ‘জানোয়ারের দল আমার জীবনটাকে শেষ কইরা দিছে। কিন্তু আজ বিচার পেয়ে খুব ভাল লাগছে। এ রায় শোনার পর ভবিষ্যতে কোন বখাটে মেয়েদের ওপর নির্যাতন করার সাহস পাবে না।’ মামলার বিবরণে প্রকাশ, ২০১৪ সালের ১৭ জুলাই রমজান মাসে উপজেলার মরিচপুরান ইউনিয়নের ফকিরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ও তারাগঞ্জ ফাজিল মাদ্রাসার ডিগ্রি ক্লাসের ছাত্রী নববধূকে স্বামী নজরুল ইসলাম বুলবুল কেনাকাটা করার কথা বলে নালিতাবাড়ী শহরে নিয়ে যায়। পরে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে মোটরসাইকেলে দুপুর বেলা মধুটিলা ইকোপার্কে বেড়াতে নিয়ে যায়। ইকোপার্কের প্রধান ফটকে মোটরসাইকেল রেখে বুলবুল স্ত্রীকে নিয়ে ওয়াচ টাওয়ারের মাঝামাঝি স্থানে বসে গল্প করার ছলনা করে। শফিকুল ইসলাম, আব্দুস ছালাম ও মনু মিয়া ওইস্থানে গিয়ে স্বামী বুলবুলের কাছ থেকে নববধূকে নিয়ে পাশের টিলাবেষ্টিত জঙ্গলে নিয়ে যায়। ওই সময় ফিল্মি কায়দায় ৩ বখাটে ছুরি দেখিয়ে স্বামীর সামনেই নববধূকে বিবস্ত্র করে মোবাইলে ছবি তোলার পাশাপাশি যৌন নির্যাতন চালাতে থাকে। স্ত্রী নিজেকে বাঁচানোর জন্য স্বামীর সহায়তা চাইলে নীরবই রয়ে যায় স্বামী। এক পর্যায়ে সম্ভ্রম বাঁচাতে মেয়েটি টিলা থেকে বিবস্ত্র অবস্থায় নিচে ঝাঁপ দিয়ে চিৎকার করলে এক মুরব্বি গিয়ে তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় রেঞ্জ অফিসে পৌঁছে দেয়। ঘটনা জানাজানি হলে ৩ বখাটে চলে যায়। পরে বুলবুল ওই ঘটনাটি কাউকে না জানানোর নির্দেশ দিয়ে স্ত্রীকে নালিতাবাড়ী শহরে ফেলে তার বাড়ি নকলায় চলে যায়। পরদিন বখাটে শফিকুল তার সহযোগী মোস্তফা কামাল নগ্ন ভিডিও নিয়ে ওই নববধূর বাড়িতে যায় এবং তার বোন মাকছুদা বেগমের কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করে। টাকা না পেয়ে নগ্ন ভিডিওটি বিভিন্নস্থানে ছড়িয়ে দেয়। এক পর্যায়ে মেয়েটি লজ্জায় আত্মহত্যার চেষ্টা চালালে আত্মীয়-স্বজন তাকে রক্ষা করে। ওই অবস্থায় স্বামী বুলবুল নববধূর কোন খোঁজ-খবর না নিয়ে যোগাযোগ বন্ধ করে দিলে ঘটনার ২৭ দিন পর ১৩ আগস্ট থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করে ভিকটিম। মামলা দায়েরের দু’দিন পর সরকারী সফরে থাকা স্থানীয় এমপি কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী দেশে ফিরে ঘটনাটি জেনে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বখাটেদের গ্রেফতারের নির্দেশ দিলে ঝিনাইগাতী উপজেলা থেকে শফিকুলকে গ্রেফতার করা হয়। আদালতে ১৬৪ ধারায় শফিকুল ঘটনার সঙ্গে মোস্তফা, মনু, সালাম, বুলবুল ও লিটন জড়িত রয়েছে বলে জবানবন্দী দেয়। পরে তার দেয়া তথ্যে আলামত উদ্ধারসহ মোস্তফা, মনু ও নববধূর স্বামী বুলবুলকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ইকোপার্কের ইজারাদার প্রতিনিধি মোস্তফাকে গ্রেফতার ও পরবর্তীতে তাকে অন্তর্ভুক্ত করে অভিযোগপত্র দাখিল হওয়ায় স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি অংশ এলাকায় আন্দোলন-সংগ্রাম শুরু করে। মোস্তফা স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক হওয়ায় ওই আন্দোলন শুরু হয়। কিন্তু স্থানীয় সংসদ সদস্য কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরীর অনড় অবস্থানের কারণে ওই ঘটনায় পুলিশ তদন্ত শেষে মোস্তফা কামালসহ ৫ জনকে আসামি শ্রেুণীভুক্ত করে ২০১৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ও পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে আদালতে দু’টি পৃথক অভিযোগপত্র দাখিল করে। যৌন পীড়নের ঘটনায় ২০০৩ সনের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধিত) আইনের ১০/৩০ ধারার মামলায় বাদী-ভিকটিম, জবানবন্দী গ্রহণকারী ম্যাজিস্ট্রেটসহ ৬ অক্টোবর মোট ১৭ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য ও জবানবন্দী গৃহীত হয় এবং ১৯ অক্টোবর যুক্তিতর্ক শেষ হয়। পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলাটি এখনও বিচারাধীন রয়েছে। যৌনপীড়নের মামলাটি রাষ্ট্রপক্ষে পিপি এ্যাডভোকেট গোলাম কিবরিয়া বুলু এবং আসামিপক্ষে এ্যাডভোকেট হরিদাস কর্মকার স্বপন পরিচালনা করেন।

বিচারক রায়ে উল্লেখ করেন, ১৭ সাক্ষীর জবানবন্দী, জেরা ও আলামত পর্যালোচনা করে সকল সন্দেহের উর্ধে উঠে ওই রায় প্রদান করা হলো। এছাড়া স্বামী বুলবুলের সামনেই গৃহবধূর শ্লীলতাহানির সময় স্বামীর নীরবতা ও ইজারাদার মোস্তফা কামালের সহায়তার বিষয়টিও বিচারকের পর্যবেক্ষণে সুস্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।