১৫ আগস্ট ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মিসবাহর প্রত্যাশা...

মোঃ নুরুজ্জামান

আশ্চর্য হওয়ার কারণ রয়েছে। অধিনায়ক অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন অথচ পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) পক্ষ থেকে কিছুই নিশ্চিত করা হয়নি! বিশ্বকাপে যখন ওয়ানডে ছাড়েন তখন সরগরম ছিল পিসিবি। ভেতরে-বাইরে ছিল অনেক অনেক মন্তব্য। টেস্ট ছাড়ার ইঙ্গিতটা আগেই দিয়েছিলেন। আরব আমিরাতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজটাই হবে তার শেষ আন্তর্জাতিক সিরিজ। ভক্তরা তবু আশায় ছিলেন। খোদ পিসিবি প্রধাণ অনুরোধ জানিয়েছিলেন, অন্তত বছর দেড়েক খেল যান। কিন্তু সেটি আর হলো না। শারজায় চলমান ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের শেষ টেস্টটিই হবে পাকিস্তান অধিনায়কের ক্যারিয়ারের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। শনিবার ম্যাচ শূরুর আগের দিন সংবাদ ম্যাধম্যকে এটি নিশ্চিত করেছেন ৪১ বছর বয়সী মিসবাহ-উল হক। তিনি বলেন ‘অনেক ভেবেছি, শারজার টেস্টটিই হবে আমার শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ।’

তিনি আরও যোগ করেন,‘বোর্ডের অনুরোধ নিয়ে অনেক চিন্তা করেছি। কিন্তু পাকিস্তানের পরবর্তী সিরিজের মধ্যে এখনও অনেক সময় বাকি। সম্মান ও শ্রদ্ধার সঙ্গে বিদায় নিতে পারাটা বড় ব্যাপার। অনেকের ভাগ্যেই এটা হয় না। পাকিস্তানের হয়ে খেলতে পেরে আমি গর্বিত। মাঠে থাকব না, কিন্তু আমার মন পড়ে থাকবে পাকিস্তানের সঙ্গে।’ সিরিজ শুরুর আগে মিসবাহকে অনুরোধ করে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) প্রধান শাহরিয়ার খান বলেন,‘মিসবাহকে অবসরের সিদ্ধান্তটা দুই-এক বছরের জন্য পেছাতে বলেছি। আমরা মনে করি, অধিনায়ক ও সিনিয়র ক্রিকেটার হিসেবে তার উপস্থিতি আগামী বছর ইংল্যান্ড ও এরপর অস্ট্রেলিয়া সফরে পাকিস্তান দলের জন্য খুবই মূল্যবান হবে।’ বিষয়টা স্বীকার করে মিসবাহ বলেছিলেন,‘এটা কঠিন সিদ্ধান্ত, তাই আমি অনেক বিষয় বিবেচনা করছি। বিশেষত দলের জন্য কতটা অবদান রাখা সম্ভব, আমি নিজেকে বিশ্লেষণ করব, দেখব কতদূর যেতে পারি।’

আপেক্ষা করতে হলো না, সিদ্ধান্তটা নিয়ে নিলেন পাকিস্তান অধিনায়ক। ২০১৬-২০১৭ মৌসুমে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া সফরে পূর্ণাঙ্গ সিরিজ খেলবে পাকিস্তান। ওই সফর এখনও অনেক দূরে হওয়ায় অবসরের জন্য প্রিয় আমিরাতকেই বেছে নিলেন মিসবাহ। মিসবাহর অবসরটা ভক্তদের আরও বেশি করে কষ্ট দেবে। কারণ ৪২ ছোঁয়া বয়সে ব্যাট হাতে-নেতৃত্বে দারুণ সময় পার করছিলেন তিনি। শেষ হওয়া দুই টেস্টের চার ইনিংসে করেছেন ৩, ৫১, ১০২ ও ৮৭ রান! এরপর চলমান টেস্টের প্রথম ইনিংসে ৭১। সম্মানের সঙ্গে বোঝাতে হয়ত ফর্মটাকেই বুঝিয়েছেন। পাকিস্তান ক্রিকেট থেকে সম্মানের সঙ্গে বিদায় নেয়া বিরল ঘটনা। দেশটির অনেক বিখ্যাত ক্রিকেটারকেও সমালোচনা সঙ্গী করে সরে যেতে হয়েছে। অনেককে আবার মাঠের বাইরে থেকে। মিসবাহ পাকিস্তানের সফল টেস্ট অধিনায়ক। তার নেতৃত্বে দেশটি এ পর্যন্ত ১৯টি টেস্ট ম্যাচ জিতেছে। গত বিশ্বকাপ খেলে রঙিন পোশাকের ওয়ানডেকে বিদায় জানিয়ে খেলছেন কেবল টেস্টে। অধিনায়ক হিসেবে ৪১ টেস্টে ৫৬.৭৫ গড়ে রান তুলে দারুণ সফল। সাদা পোশাকে ৬০ ম্যাচে ৪৮.৭৭ গড়ে করেছেন ৪,২৪৩ রান- সেঞ্চুরি ৯, হাফ সেঞ্চুরি ৩১টি।

মিসবাহর একটা ইচ্ছা অপূর্ণই থেকে যাচ্ছে। কিছুদিন আগে তিনি বলেন ‘এটা সত্যি যে আমার মধ্যে আর ক্রিকেট নেই! খুব বেশি হলে আর কয়েকটা টেস্ট খেলতে পারি। এ বছর শেষের দিকে ভারতের সঙ্গে আমাদের টেস্ট খেলার কথা। যদি পাক-ভারত লড়াই হয়, তবে সেটাই হবে আমার শেষ।’ সেটি আর হচ্ছে না। ২০০৮ সালে মুম্বাইয়ের তাজ হোটেলে সন্ত্রাসী হামলা হয়। ভারত ওই হামলার জন্য পাকিস্তানী জঙ্গীগোষ্ঠীকে দায়ী করে। সেই থেকে দুদেশের মধ্যকার পুর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় সিরিজ বন্ধ। যদিও স্বল্পদৈর্ঘের কয়েকটি ম্যাচ খেলতে এ সময়ে পাকিস্তান একবার ভারত সফর করে। বড় টেস্ট খেলুড়ে দেশের বিপক্ষে পাকিস্তান তাদের হোম সিরিজ হিসেবে আরব আমিরাতকে ব্যবহার করে আসছে। এই মুহূর্তে যেমন ইংল্যান্ডের সঙ্গে খেলছেন মিসবাহ-উল হকরা। একইভাবে আগামী ডিসেম্বরে আমিরাতে ভারতের সঙ্গে খেলার কথা ছিল পাকিস্তানেরও। সম্প্রতি শিবসেনা ভারত ও পাকিস্তান বোর্ডের মধ্যকার আলোচনা ভন্ডুল করে দিলে সিরিজ নিয়ে ফের অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়।

ওয়ানডে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নিলেও মিসবাহর অধীনে টেস্টে ভাল খেলছে দল। বাংলাদেশ সফরে ১-০তে জয়ের পর শ্রীলঙ্কায় সাফল্য ২-১এ। ব্যাট হাতে এখনও বিপদে দাঁড়িয়ে যান অধিনায়ক, কিন্তু বয়সের কাছে একদিন সবাইকে হার মানতে হয়। মিসবাহ সেদিকেই ইঙ্গিত করেন। পাকিস্তান বিশ্ব ক্রিকেটে আবার দাপট দেখাবে বলেও মনে করেন তিনি। ‘এই দলে দারুণ সব প্রতিভাবান ক্রিকেটার রয়েছে। বিশেষ করে বল হাতে ইয়াসির শাহর কথা আলাদা করে বলতে হয়। শ্রীলঙ্কায় সিরিজ জয়ে মুল ভূমিকা ওর। আমার বিশ্বাস একদিন বিশ্বসেরা লেগস্পিনার হয়ে উঠবে সে।’ ২০০১ সালে টেস্ট দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখা মিসবাহ দেশের হয়ে ৫৮ টেস্ট ও ১৬২টি ওয়ানডে খেলেছেন। সত্যি বড় অস্থির সময়ে পাকিস্তান দলের হাল ধরেছেন তিনি। ২০১০ সালে পান টেস্ট নেতৃত্ব, যখন সালামন বাটের অধীনে লর্ডস টেস্টে স্পট ফিক্সিংয়ে জড়িয়ে বেসামাল হয়ে পড়েছিল গোটা পাকিস্তান।

২০১১ বিশ্বকাপের পর তৎকালীন কোচ ওয়াকার ইউনুসের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন অধিনায়ক শহীদ আফ্রিদি। তখনও কঠিন পরিস্থিতিতে ওয়ানডে-টি২০র দায়িত্ব পড়ে তার কাঁধে। গ্রেট ইমরান খান ও জাভেদ মিয়াদাঁদকে পেছনে ফেলে পাকিস্তানের সফল টেস্ট অধিনায়ক মিসবাহ। ৩৪ টেস্টে নেতৃত্ব দিয়ে জয় ১৫টিতে, হার ১০। সাফল্য শতকরা ৪৪.১১ ভাগ। ওয়ানডেতেও কম যাননি, ৭৮ ম্যাচে জয় ৪১, হার ৩৪। সাফল্য ৫৪.৫৪ ভাগ। ১৫৩ ওয়ানডেতে ৪৩ গড়ে করেছেন ৪৬৬৯ রান। সেঞ্চুরি নেই, হাফ সেঞ্চুরি ৩৭টি। শুরুতে ব্যাটিং করতেন ৭/৮ নম্বরে, সুতরাং সেঞ্চুরির সুযোগও কম। ৩৯ টি২০তে ৩৮ গড়ে রান ৭৮৮। ২০১২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলেছেন শেষ টি২০ ম্যাচ। ২০০১ সালে টেস্ট দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আসা মিসবাহ পাকিস্তান দলের ভেতরে-বাইরে অত্যন্ত সজ্জন বলে পরিচিত।