১৯ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সমাজ ভাবনা

  • এবারের বিষয় ॥ ফেসবুক;###;বিচিত্র ভাবের উপস্থাপনা

ডাঃ সেলিনা জাহান

আশ্চর্যরকম কত আবিষ্কারই তো হয়েছে পৃথিবীতে। হয়েছে মানুষের কত রকম চিন্তা-চেতনা অনুভূতির বহির্প্রকাশ। এরকমই একটি কল্পনা বিলাসের বাস্তবরূপ হয়ত ফেসবুক। এর পিছনে ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান, টেকনোলজি, ব্যবসা-বাণিজ্য- কিছুই আমাদের সাধারণ মানুষের জানা নেই। বহু বছর পরে এর সত্যিকারের ভাল-মন্দের দিকটা হয়ত জানা যাবে। আপাতদৃষ্টিতে এতটুকু বোঝা যায় এর উপকারিতা যেমন আছে, তেমনি অপকারিতাও নিশ্চয়ই আছে। এর উপকারিতা না হয় বাদই দিলাম, কারণ উপকারিতা যে আছে তা আর কাউকে বলে বোঝাতে হয় না। কিন্তু এর অপকারিতা যদি একবার চিন্তা করা যায় তাহলে এর ব্যবহার হয়ত একদিন বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয় না। মানুষ কোন জিনিসে একবার আনন্দ পেতে শুরু করলে তার খারাপ দিকটা আর মাথায় থাকে না। এই ফেসবুকের মাধ্যমে যে একটা নির্মল আনন্দ পাওয়া যায় তা হয়ত অনেকেই স্বীকার না করে পারবেন না।

ইদানীং তরুণ-তরুণীদের দেখে মনে হয় এদের ভেতর থেকে কি রোমাঞ্চ নামক জিনিসটা হাওয়া হয়ে গেল? কারও সাথে পরিচয় হলে কিছু দিনের ভিতরেই এরা তুমি ছাড়িয়ে তুই-এর পর্যায়ে চলে যায়। একজন থেকে আরেকজন দূরে সরে গেলে, তা সে যত দূরেই হোক সেলফোনের কল্যাণে আর দূরে থাকে না। সারাক্ষণই কথা বা এসএমএস চলতে থাকে। আর কথা বা এসএমএস মানেই হচ্ছে বেশিরভাগ সময়ই কথা কাটাকাটি বা ঝগড়াঝাটি। কিন্তু আগে এমন ছিল না। আগে একজন থেকে আরেকজন দূরে সরে গেলে চিঠির একটা বিরাট ভূমিকা ছিল। সেই চিঠি লেখাটা ছিল ভীষণ একটা রোমান্টিক ব্যাপার। মনের বিচিত্র ভাব ফুটে উঠত সেই চিঠিতে, মানুষের যে একটা নিজস্ব স্বকীয়তা আছে, নিজস্ব কল্পনার জগত আছে নিজস্ব এবং স্বতন্ত্র চিন্তা-ভাবনা অনুভূতি আছে সব যেন ফুটে উঠত সেই চিঠিতে। যা চিঠি ছাড়া অন্য কিছুতে বা সামনাসামনি অথবা টেলিফোনে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। কিছু লিখে প্রকাশ করার মাধ্যমে যেমন একদিকে জ্ঞানের উৎকর্ষতা বাড়ে, তেমনি লেখার উপাদান পেতে বিভিন্নমুখী সাধনারও দরকার হয়।

তো চিঠির সাথে ফেসবুকের এখানেই একটা সামঞ্জস্য খুুঁজে পাওয়া যায়। এখানে অনেকে নিজের খেয়ালে অনেক ভাবের উপস্থাপনা করে। এভাবেই সৃষ্টি হয় নতুন নতুন চিন্তা-ভাবনা, আবেগ, ভাল লাগা, না লাগা। হয়ত সৃষ্টি হতে পারে অনেক সাহিত্য, অনেক কবিতা।

আসলে আমাদের দেশে এখন এ ধরনেরই কিছু একটা দরকার। কেননা কেমন করে যেন আমাদের দেশটা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে সূক্ষ্ম অনুভূতি, সূক্ষ্ম আবেগ, সূক্ষ্ম ভাল লাগা। এসব জায়গায় আস্তে আস্তে ভর করছে জান্তব সব অনুভূতি। হারিয়ে যাচ্ছে সত্যিকারের শিক্ষা, সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতি। অথচ এই শিক্ষা, সাহিত্য, শিল্প-সংস্কৃতির উপর ভর করেই কিন্তু আমরা স্বাধীন করেছি আস্ত একটা দেশ।

ফেসবুকের আরেকটা ভাল দিক হলো এর মাধ্যমে কিছুটা হলেও মানুষ অপেক্ষা করতে শিখেছে। আজকাল মানুষ বেশ অধৈর্য হয়ে গেছে। অন্যে ছবি তুলে দেবে সেই ধৈর্যটুকুও নেই। নিজেই সেলফি তুলে ফেলে। আগে একটা ছেলে একটা মেয়ের ছবি তুলতে গিয়ে হয়ত টিপটা একটু ঠিক করে দিত অথবা কপালের চুলটা একটু এদিক ওদিক করে দিত, হয়ত এগুলো বাহানা করেই করত, কিন্তু ব্যাপারগুলো ছিল বেশ রোমান্টিক। তো এই ধৈর্যটা হয়ত ফেসবুকে কিছুটা পাওয়া যায়। কেউ কোন একটা ংঃধঃঁং দিয়ে পড়সসবহঃ-এর জন্য কিছুটা হলেও অপেক্ষা করে।

সর্বস্তরে ফেসবুকের ব্যবহার হয়ত আরও বাড়ত, আরও সমৃদ্ধশালী হতো যদি বাংলাভাষার ব্যবহার আরও একটু সহজ হতো। শত হলেও বাঙালী মনের অনুভূতি কি ইংরেজীতে সেভাবে প্রকাশ করা যায়, নাকি তা সম্ভব? আর তাই হয়ত সবাই ইংরেজী অক্ষরে বাংলা কথা লেখে। ব্যাপারটা কেমন যেন জগাখিচুিড় হয়ে যায়। বাংলা কী-বোর্ড যাতে আরও সহজে ব্যবহার করা যায়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেদিকে একটু নজর দিলে ভাল হতো।

কিছুদিন আগে একটা খবর বেরিয়েছিল ফেসবুকে যাতে চেহারা আরও সুন্দর দেখা যায় তার জন্য নাকি ইদানিং প্লাস্টিক সার্জারির হার অনেক বেড়ে গেছে। খবরটা মন্দ নয়। নিজেকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে চাওয়া দোষের কী। আর এই সমস্ত ছেলেমানুষীর ভিতরও কিন্তু একটা আনন্দ আছে। এই নির্মল আনন্দ মানুষকে সুস্থ থাকতেও সাহায্য করে। তবে সামাজিক যোগাযোগের এই মাধ্যমটি শুধুই যেন একটা সৌন্দর্যের প্রদর্শনী বা ধনদৌলতের প্রদর্শনীতে রূপান্তরিত না হয় সেদিকেও একটু খেয়াল রাখা উচিত। কারণ তাতে এটা একটা প্রতিযোগিতার মাধ্যম হয়ে উঠবে এবং আখেরে এই অসুস্থ প্রতিযোগিতার ভিতর থেকে কিছুই পাওয়া যাবে না, পাওয়া সম্ভব নয়।

মহাখালি, ঢাকা থেকে

নির্বাচিত সংবাদ